প্রিয় নবী (দ.)’র উপর দরুদ-সালাম পাঠের ফজিলত

শুক্রবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
36

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র জাহানের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী ও রাসূলগণের শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি, তাঁর পরিবার পরিজন ও পূতপবিত্র সাহাবায়ে কেরামের প্রতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়, নভোমন্ডলে ভূমন্ডলে সমগ্র সৃষ্টিকুলে তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের সরদার প্রিয়নবী আমাদের অভিভাবক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। তাঁর উপর অসংখ্য দরুদ সালাম বর্ষিত হোক, তার পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ সকলের প্রতি করুণাধারা বর্ষিত হোক। যাঁকে মহান আল্লাহ সত্য সহকারে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁরই প্রতি আহবানকারী ও উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা
জেনে রাখুন! নিশ্চয়ই আল্লাহতা’য়ালা তাঁর প্রিয় নবীজির উপর দরুদ প্রেরণের জন্য আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন। তিনি স্বয়ং নবীজির উপর দরুদ পাঠের সূচনা করেছেন তিনি এরশাদ করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিস্তাগণ নবীজির উপর দরুদ-সালাম প্রেরণ করেন। হে মুমীনগণ! তোমরাও তাঁর উপর যথাযথ ভাবে দরুদ ও সালাম পাঠ করো। (আল কুরআন সূরা-আহযাব: ৩৩ আয়াত ৫৬)
সহীহ বোখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফতহুলবারীর ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী স্বীয় গ্রন্থের ৯ম খন্ডের ১৫৬ পৃষ্ঠায় বলেন, আল্লাহতা’য়ালা সৃষ্টিকুলের উপর তাঁর নবীর প্রতি দরুদ সালাম পাঠ করা ফরজ করে দিয়েছেন। দরুদ-পাঠের জন্য তিনি কোন সময় সুনির্দিষ্ট করেননি। সুতরাং বান্দার উপর ওয়াজিব হলো তাঁর উপর অধিকহারে দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং এর প্রতি অবহেলা না করা। বর্ণিত আয়াত নবীজির সুমহান সম্মান ও মর্যাদার দিক নির্দেশক। এ বিষয়ে উম্মতের বিজ্ঞ ওলামাদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত। নবীজির প্রতি দরুদ সালাম হচ্ছে ঈমানের অন্যতম নিদর্শন। দরুদ শরীফ জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের উপায়। উপরন্তু নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম। প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ-সালামের ফজিলত সংক্রান্ত অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে।
নিশ্চয় নবীজির প্রতি দরুদ-সালাম প্রেরণ করা আল্লাহকে স্মরণ করার নামান্তর। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণগান ও শানমান বর্ণনা, নবীজির আনুগত্য ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, তাঁর আদেশ নিষেধ পালন করা ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত। ইমাম কুস্তলানী স্বীয় মাওয়াহেব এ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ শরীফ পাঠ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা ও নবীজির প্রতি আমাদের হক আদায় করা। কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকলে যে কোনো সময় এবং প্রত্যেক ভাল কাজের পূর্বে দরুদ-সালাম পাঠ করা উত্তম ও মুস্তাহাব। হানফী মযহাবের মুজতাহিদ ইমাম আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (র.)’র বর্ণনা মতে সাতটি স্থান ও সময়ে দরুদ-সালাম পাঠ করা নিষিদ্ধ । যথাক্রমে ১. স্ত্রী সহবাস কালে ২. পায়খানা-প্রশ্রাবের সময় ৩. ব্যবসার পণ্য প্রচারের সময় ৪. হোছট খাওয়ার সময় ৫. পশু জবেহ করার সময় ৬. আশ্চর্য জনক সংবাদ শ্রবণের সময় ৭. হাঁচি দেয়ার সময় । (সূত্র: শামী: ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং: ৩৭৪)
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম স্বীয় কিতাব জালাউল আফহাম ৬০ পৃষ্ঠায় লিখেন “ প্রত্যেক দু’আর শুরুতে ও শোষে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ শরীফ পাঠ করা অপরিহার্য। ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্য অর্জনের লক্ষ্যে দরুদ-সালাম এক মহান ওসীলা। দরুদ-সালামের গুরুত্ব ও ফজিলত সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস শরীফ উপস্থাপন করার প্রয়াস পাচ্ছি।
১. হযরত আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ শরীফ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তার উপর দশটি রহমত অবতীর্ণ করবেন, তার দশটি পাপ মোচন করবেন এবং তার দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (নাসাঈ শরীফ : হাদীস নং ৩১৫০, মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল হাদীস নং-১২০১৭)
২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নিশ্চয়ই দুআ আসমান ও জমীনের মাঝখানে স্থগিত থাকে এর কিছুই উপরের দিকে উঠে না (অর্থাৎ আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না) যে পর্যন্ত না তুমি তোমার নবীর উপর দরুদ পাঠ করা। (তিরমিযী শরীফ)
৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন। কিয়ামতের দিন লোকদের মধ্যে আমার সর্বাধিক নৈকট্যধন্য ঔই ব্যক্তি হবে যে তাদের মধ্যে আমার উপর সবচেয়ে অধিক দরুদ পাঠ করবে। (তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ৪৮৪)
৪. হযরত আউস বিন আউস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যে, নিশ্চয়ই তোমাদের দিন সমূহের মধ্যে থেকে জুম’আর দিনই সর্বোত্তম। সেদিন হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সেদিনই তিনি ওফাত প্রাপ্ত হয়েছেন। সেদিনেই সিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে।সেদিনেই বিকট আওয়াজ প্রকাশিত হবে। অতএব তোমরা সেদিন আমার উপর অধিক হারে দরুদ শরীফ পাঠ করো। কেননা তোমাদের দরুদ আমার নিকট পেশ করা হয়। বর্ণনাকারী বলেন, সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের দরুদ আপনার ওফাতের পর কিভাবে আপনার উপর পেশ করা হবে? আপনার দেহ মোবারক কি মাটিতে মিশে যাবেনা? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, আল্লাহ তা’য়ালা ভূপৃষ্টের জন্য সম্মানিত নবীগণের দেহ ভক্ষণ করাকে হারাম করে দিয়েছেন। (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং ১০৪৭)
সম্মানিত মুমীনগণ!
প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ তাফসীরকারক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ইসলামী মনীষী ও মুজতাহিদ ইমামগণ, দরুদ সালামের অসংখ্য উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। এ পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হলো:
১.দরুদ শরীফ পাঠে নবীজির শাফায়াত অর্জিত হবে। ২. দরুদ পাঠে গুনাহ সমূহ ক্ষমা করা হয়। ৩. দরুদ পাঠে কিয়ামত দিবসে বান্দা নবীজির নৈকট্য ধন্য হবে। ৪. দরুদ শরীফ পাঠে বিভিন্ন বৈধ উদ্দেশ্য পূরণ হয়। ৫. দরুদ শরীফ পাঠে দারিদ্র দূরীভূত হয়। ৫. দরুদ পাঠকারীর জন্য জান্নাতের পথ সুগম হয়। ৬. দরুদ পাঠ কারীর কাজে কর্মে হায়াতে ও কল্যাণমূলক উপকরণে বরকত হয়। ৭. দরুদ শরীফ পাঠে অন্তরে নবী প্রেম স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পায়, নবী প্রেমই ঈমানের মূল সেতু বন্ধন। ৮. দরুদ পাঠ কারীর জন্য পূলসিরাতে অবিচলতা ও অতিক্রম সহজ হয়। ৯. দরুদ শরীফ মৃত্যুর পূর্বে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্তির মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের আপনাদেরকে পবিত্র কুরআনের বরকত দান করুন। আমি বিতাড়িত শয়তানের প্রতারণা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে “পবিত্রতা আপনার প্রতিপালকের জন্য, মহা সম্মানিত প্রতিপালকের জন্য, তাদের উক্তি সমূহ থেকে এবং শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি সমস্ত জাহানের প্রতিপালক।” (সূরা: সাফফাত: পারা: ২৩, আয়াত ১৮০-১৮২)
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x