প্রিয়নেত্রী: সামনেই স্বর্ণতোরণ

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ
30

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ও প্রচারবহুল ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকের সময় সাংবাদিকতার নতুন ধারা যোগ করে থাকে। যা, পাঠকের কাছে পত্রিকাটির চরিত্র, আবেদন ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরো পোক্ত করে। ট্রাম্প জমানায় ওয়াশিংটন পোস্ট ভিন্ন স্বাদ ও আঙ্গিক দিয়ে এরমাঝে অন্য সব গণমাধ্যমকে টপকে গেছে। রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টানা মিথ্যাচার ও বাগাড়ম্বর ওয়াশিংটন পোষ্ট তার সবচে’ আকর্ষনীয় সংবাদ পণ্য হিসাবে খুব ভালই বাজারজাত করে যাচ্ছে।
অবশ্য মার্কিনসহ বিদেশি প্রচারবহুল ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো নিয়মিতই প্রচলিত ধারণার বাইরে সাংবাদিকতায় নতুন নতুন মাত্রা, স্বাদ ও ধারণা যুক্ত করে। এর জন্য আলাদা গবেষণা ও আইডিয়া সেলও থাকে বড় হাউসগুলোর। এটা কোনভাবেই সংবাদের মান, স্বচ্ছতা, পেশাগত মর্যাদা বা বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে আপস করে নয়। উল্টো সাংবাদিকতার মূল চেতনাকে আরে শাণিত ও শক্তিশালী করার তাগিদেই। অবশ্য সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু কর্পোরেট স্বার্থ ও নিজস্ব মতাদর্শের টানা প্রচার। বিষয়টা এ’ লেখায় অপ্রাসঙ্গিক, তাই বাদ।
ট্রাম্প জমানার শুরু থেকে ওয়াশিংটন পোষ্ট ” ঋধপঃ পযবপশ” নামে একটি কলাম চালু করে। এতে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর ও মিথ্যাচারের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। ট্রাম্পের নিত্যদিনের মিথ্যাচারের সংখ্যা ও প্রমাণ্য তথ্য উঠে আসে কলামে। যা শুধু মার্কিন মুলুক নয় বিশ্বজুড়েই আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ বছর শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের কব্জায় চলে আসার পর কংগ্রেস ট্রাম্পকে টেঁসে ধরার সুযোগ পেয়েছে। মেঙিকো সীমান্ত দেয়াল তৈরির ৫৭০ কোটি ডলারের বাজেট আটকে দেয়ার পাশাপাশি ২৯ জানুয়ারি নির্ধারিত “ষ্টেট অব দ্য ইউনিয়ন” ভাষণও কংগ্রেসে দিতে পারেননি। অথচ বছরের নির্দিষ্ট দিনে প্রেসিডেন্টের এই ভাষণ মার্কিন রাষ্ট্রিয় রেওয়াজ। দেয়াল তৈরির বাজেট পাশে ব্যর্থ ট্রাম্প কংগ্রেসকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে উল্টো নিজে চাপে পড়ে যান। টানা ৩৫ দিন নজিরবিহীনভাবে সরকারের এক চতুর্থাংশ অচল থাকে। ৮ লাখ কর্মচারীর বেতন বন্ধ। কংগ্রেসের সভাপতি ন্যান্সি পোলেসির শেষ পর্যন্ত আপসরফা করে ৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দেয়ার সুযোগ পান ট্রাম্প।
এদিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে ট্রাম্প নিজ প্রশাসনের সাফল্য বিশেষ করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ঢোল বাজাতে গিয়ে নারীরা বেশি লাভবান হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে বিড়ম্বনার শিকার হন। নারী ডেমোক্র্যাট সদস্যরা একযোগে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে পরস্পরের প্রতি উল্লাসে ফেটে পড়েন। কারণ গত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা ট্রাম্প বিরোধিতার জোয়ারে ভেসে বিপুল ভোটে জয়ী হন। প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভাষণে ব্রেক পড়ে। বিব্রত হয়ে কাষ্ঠহাসি সহযোগে বলেন, “এমনতো হবার কথা ছিলনা”! ভাষণে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সহযোগিতা ও সমঝোতার উদাত্ত আহবান জানালেও মেঙিকো সীমান্ত প্রাচির তৈরিতে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা দেয়ায় আবারো বৈরি পরিস্থিতির মুখে পড়েন। ভাষণে মার্কিন বিভক্তির ফাটল বন্ধ হওয়ার বদলে আরো গভীর হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের অবস্থা একেবারে ছ্যাড়াবেড়া। তার সম্পদ, রুশ সম্পর্ক, ব্যাবসা সবকিছুর হিসাব নেয়ার তোড়জোড় চলছে। এতে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর ও ক্ষোভ বাড়লেও আগুনে ঘি ঢালছে ওয়াশিংটন পোষ্টসহ বেশির ভাগ মিডিয়া। এমনিতেই ট্রাম্প মূলধারার মার্কিন মিডিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত। ওয়াশিংটন পোস্ট ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন ভাষণেও ৩০ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরেছে।
আসলে বিশ্ব রাজনীতির সাথে আমাদের অভ্যন্তরিণ রাজনীতিও এখন বিনিসূতোর মালায় গাঁথা। তাই ট্রাম্পের মিথ্যাচার ও তার ব্যবসায়িক স্বার্থের রাজনীতি দেশীয় রাজনীতিতেও ছাপ ফেলবে। কারণ অঘোষিত মোড়ল মার্কিনীরা বিশ্ব কাঁপায়, ঝাপায়। যার অভিঘাত আমাদের দেশেও আছড়ে পড়ে। ট্রাম্পের অহংএ ঘন্টা বাঁধতে এতদিন ওয়াশিংটন পোস্ট টানা তাঁর মিথ্যা ও বাগাড়ম্বর ফাঁস করে দিলেও এবার তাঁকে সাইজ করতে খোদ কংগ্রেসও শরিক হয়েছে। এতে ষ্পষ্ট, ট্রাম্প নিজের মিথ্যাচারের জালে নিজেই শিগগিরই ফেঁসে যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের রাজনীতিও কোনভাবেই দূষণমুক্ত হচ্ছেনা। ধর্ষক গুপ্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত অদৃশ্য খুনী ‘হারকিউলিস’কে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় নানা মুখরোচক খবর আসছে। ধর্ষণ মামলার মূল আসামিদের অদৃশ্য ঘাতক ‘ হারকিউলিস’টা কে এখনো আমাদের আইনী এজেন্সিগুলো খুঁজে বের করতে পারেনি। এ’ নিয়ে দেশে- বিদেশে ছড়াচ্ছে নানা বিভ্রান্তি। অন্যদিকে একমুখী ভারসাম্যহীন রাজনীতির আড়ালে কিছু অদৃশ্য মাফিয়া দানবও গড়ে উঠছে। ব্যাঙ্কিং ও কিছু কর্পোরেট সেক্টরে এদের প্রভাব লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে দেশের চলমান উন্নয়ন অভিযাত্রায় বড় ধরনের হুমকির আশংকা করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। দেশের বরেণ্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম আজাদীসহ জাতীয় পত্রিকায় এ’ নিয়ে তাঁর আশঙ্কার পাশাপাশি উদ্ধারের নির্দেশনাও দিয়ে যাচ্ছেন বারবার। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল মহল এখনো ব্যাঙ্কিং সেক্টরের অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে বিপুল সম্পদ পাচারকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনেনি। গ্রহণ করা হয়নি শাস্তির কোন ব্যবস্থা। দুর্নীতি, মাদক, নারীর উপর সহিংসতার বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” এর ঘোষণা দেয়া হলেও এর শিকড় উচ্ছেদ সম্ভব হচ্ছেনা। বরং বড় বড় দুর্নীতিবাজরা বেশি বেশি নীতি-নৈতিকতার কেরাত শোনাচ্ছেন!
মাদক,সন্ত্রাস,চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার স্লোগান আওড়ানো যত সহজ, বাস্তবায়ন ঠিক ততটাই কঠিন। এর জন্য দরকার কঠোর-কঠিন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গিকার। রাজনৈতিক অঙ্গনে মেধা-মননহীন ভাঁড়ের সংখ্যা বাড়লে সুস্থ, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন কল্পনা বিলাসমাত্র। সবচে’ বড় সঙ্কট রাজনীতি এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। জবাবদিহির অঙ্গন তাই ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু সুখি,শোষণমুক্ত, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিজের পরিবার, কর্ম, জীবন সবকিছু বাজি রেখেছেন। জীবনে একটা পূর্ণ বিশ্রাম করার দিন খুঁজে পাননি। মানুষ,দেশ,কাজ, সংগঠন এই ছিল তাঁর জীবন, কর্ম, ধর্ম, বিশ্রাম সবকিছু। তাঁর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন ‘বাকশাল’ বাস্তবায়িত হলে দেশ এতোদিনে বিশ্বের প্রথম কাতারের উন্নত দেশের শীর্ষে থাকতো। দুর্নীতি, ঘুষ, মাদক, সন্ত্রাস নামের শব্দগুলো থাকতো অভিধানের পৃষ্ঠায়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন শিকড় গজানোর মত কোন নরম মাটি পেতনা। অথচ, তাঁর সাধের প্রিয় দল আওয়ামী লীগ আজ দুর্বৃত্তায়নের শিকার! ভুঁইফোড় নব্য সর্বভুক হাইব্রীড আফ্রিকান মাগুরেরা দল সরকারি সুযোগ-সুবিধা লুটেপুটে খাচ্ছে। দেশের দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষ আরো বেশি গরীব হচ্ছে। অথচ অতি ধনী প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে! বঙ্গবন্ধুতো এমন বাংলাদেশ চাননি! বঙ্গবন্ধুর দু’ কন্যা দেশে না থাকায় ‘৭৫এর মধ্য আগস্টের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞে ভাগ্যের জোরে বেঁচে আছেন। দেশে থাকলেতো এতদিনে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের চিহ্ন এমনকী নামগন্ধও বাংলাদেশ থেকে মুছে ফেলা হতো। বঙ্গবন্ধু বা জননেত্রী শেখ হাসিনার গুণগানের “কুহু কেকা’য় সদা তৎপর বসন্তের এতো কোকিলরা তখন কোথায় থাকতো!
প্রিয় নেত্রী অনেক সময় হেলায় ফেলায় পার হয়েছে! প্লিজ আর একদিনও নষ্ট করা নয়, সর্বভুক দানবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ঝাঁট দিন আগে নিজের ঘর। ভাগ্যশিকারিদের সম্পদের হিসাব নিন। ক্ষমতার পদ পদবীতে যারা আছেন, তাদেরও। আপনার সামনে বিশাল সুযোগ! বঙ্গবন্ধুর গণকল্যাণ ব্রতের সব আলো জ্বালিয়ে পুরো দেশটাকে শুধু উন্নয়ন নয়, চোর বাটপারমুক্ত বিশ্বের শীর্ষ দেশের তালিকায় তুলে আনুন। পুরো পৃথিবী মুখিয়ে আছে- আপনাকে অভিবাদন জানাতে। সুবিধা শিকারি অসংখ্য ভাঁড়ের “কুহু কেকা” আপনার সামনের সোনালি দিগন্তের আহবানকে উল্টো পিচ্ছিল করে দিচ্ছে।

x