প্রাসঙ্গিক

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
28

‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’ হুমায়ূন আহমেদের ছোট একটা বইয়ের নাম; যা-কে প্রচলিত অর্থে নভেলা বলা যেতে পারে। বিটিভির যুগে হুমায়ূন আহমেদ যখন টিভি নাটক লিখতেন, প্রথম পর্বটাতে চরিত্রগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। এখানেও তাই। লেখক আস্তে-আস্তে তার গল্পের চরিত্রগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তারপর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘আজ রবিবার’ এর মতো সোজা গল্পে ঢুকে পড়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদেও এই বইয়ের স্টোরি টেলিংটা খুব চমৎকার। এত কৌশলে তিনি কাজটা করেছেন, অনেকে পড়ার পর বিভ্রান্ত হতে পারেন। মনে করতে পারেন, এভাবে চাইলে যে কেউ একটা আখ্যান লিখে ফেলতে পারে।
এটা আসলে ঢাকা শহরের আশ্বিন মাসের এক রাতের গল্প, নাম দেখে চাঁদে পাওয়া গল্পও বলা যায়।
প্রচ্ছদশিল্পী মাসুক হেলালের স্ট্রাগল লাইফের একটা লেখায় উল্লেখ আছে, ওই সময় হুমায়ূন আহমেদ রাতের ঢাকা শহর দেখতে বেরিয়ে পড়তেন। এবং কোনও কোনও রাতে মাসুক হেলালও তার সঙ্গী হতেন। ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’এর কিছু সময় পরে লেখা। এতে বোঝা যায়, গল্পটি লেখার আগে হুমায়ূন আহমেদ যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এমনিতে তার লেখায় সময়, রাজনীতি এসব থাকে না বলে একটা অভিযোগ আছে, কিন্তু তিনি এই বইটাতে সেই অভিযোগ করার সুযোগ রাখেননি।
যেমন, মীর্জা সাহেব অনেক বছর পর দেশে ফিরেছেন। সঙ্গে তেরো বছর বয়সী মেয়ে পলিন। অনেক ঝড়-বৃষ্টিতে তারা এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের গাড়িতে উঠেছেন। যাত্রাপথে মীর্জা সাহেব ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, এই রাস্তাটা কি নতুন?
ড্রাইভার অনেকক্ষণ পর তাকে জানালেন, রাস্তাটা নতুন না, এবং এটা জিয়ার আমলে করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মীর্জা সাহেব ততক্ষণে উত্তর পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। যার কারণে উত্তরটা শুনে তিনি এমনিতেই বিস্মিত হয়ে পড়েন।
কাজেই হুমায়ূন আহমেদ এর ট্রিকস ভর্তি এই গল্পটার মূল ভিত্তি এরশাদের আমল, সেটা সহজেই বোঝা যায়। এর সঙ্গে আরও বোঝা যায়, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’ মূলত আলম, মজিদ ও মাহিন নামের তিনজন যুবকের গল্প, যারা কিছু মধ্যবিত্ত সমস্যায় আক্রান্ত এবং এক চন্দ্রাগ্রস্ত রাতে তারা ঢাকা শহরে ঘুরতে বের হয়। কিন্তু আসলেই কি প্রচুর উত্তেজনার এই গল্পটা তিনজনের?
না, এই গল্পটা আসলে মজিদের। সে হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র যেমন হয়, তেমনই। অসম্ভব বুদ্ধিমান, সাহসী। স্বাভাবিক গতিতে উল্টো করে কথা বলতে পারে। অথচ এই গল্পের তিনজন যুবকের মধ্যে তার অবস্থাটাই সবচেয়ে খারাপ। গাধা হওয়ায় লেখাপড়া করতে পারেনি, ফুফার আশ্রয়ে থাকে। চুরি করে। চড়-থাপ্পড় খায়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বলে, খুন করে ফেলব। মজিদ অবশ্য সংলাপটা এভাবে বলে না, হুমায়ূন আহমেদ এর চরিত্র হিসাবে উল্টো করে বলে।
‘নখু রেক বলফে।’
প্রথম প্রথম মজা লাগলেও, মজিদ কিন্তু সত্যি সত্যি একটা খুন করে ফেলে। সেই রাতে আলম যখন তার কাছে আসে, তারা হাঁটতে বের হয়, খাওয়া-দাওয়া করে, আর তাদের আরেক বন্ধু মাহিনকে সেলুনে দেখতে পায়। ক্রাইমের দিকে যাওয়ার আগে মজিদ সেখানে সবার অলক্ষ্যে একটা ক্ষুর চুরি করে ফেলে, আর এই একটা ক্ষুরই পাঠকদের জাগিয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট।
গল্পে এর সামনেই অনেকদিন পর দেশে ফেরা মীর্জা সাহেবকে পড়তে হয়। তিনি মেয়ে পলিনকে হোটেলের রুমে রেখে রাতের ঢাকা দেখতে বের হন, আর মজিদের ক্ষুরের সামনে পড়ে যান।
মীর্জা সাহেব বাঁচবেন কী মরবেন, বইটা পড়ার সময় তা নিয়ে দু:শ্চিন্তা হতে পারে, কিন্তু তার চোখে রাতের ঢাকা আত্ম-আবিষ্কার হয়ে দাঁড়ায়; যার কারণে খেয়ালই হয় না, মীর্জা সাহেব কখন মজিদ ও তার দুই বন্ধুর চক্রে যুক্ত হয়ে গেছেন।
হুমায়ূন আহমেদের এই বইটা অনেকেই পড়েছেন, অনেকে হয়তো পড়েন নি। যারা পড়েন নি, তারা আগ্রহ থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন। এই বইটা আপনাকে ফ্রিতে ঢাকা শহর চেনাবে।
সত্যি বলতে, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’ এমন একটা গল্পের বই, যেখানে একটা খুন হয় এবং খুনটা লেখক এক অর্থে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করেন। কিন্তু তিনি এমনভাবে কাজটা করেন, যাতে মজিদের পক্ষে মানসিকভাবে আপনার সূক্ষ্ম একটা অবস্থান তৈরি হবে, এবং আপনি ভাবতেও পারবেন না, শুধু চাঁদের আলোর সাহায্য নিয়ে একজন লেখক কী প্রাসঙ্গিক কাজটা করে ফেলতে পারেন!

Advertisement