প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

বুধবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
29

প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রায় শতভাগ পৌঁছেছে। কমেছে ঝরে পড়ার হারও। প্রাথমিকের ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থী ভর্তি ও ঝরে পড়ার হার মাধ্যমিকেও কমেছে। শিক্ষার এই স্তরের গণ্ডি পেরোচ্ছে ৬২ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী। এরা মূলত অতি দরিদ্র পরিবারের বাইরের সন্তান। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে অতি দরিদ্র পরিবারের ৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবছর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) প্রকাশ করে আসছে ইউনেস্কো’। ২০১৭-১৮ সালের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে গত ১৫ মে। ‘অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি ইন এডুকেশন : মিটিং আওয়ার কমিটমেন্টস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ইউনেস্কো বলছে, বাংলাদেশে অতি দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের ৫৭ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করলেও মাধ্যমিকে এসে তা ধরে রাখতে পারছে না। এসব পরিবারের ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগে ঝরে পড়ছে। মেয়েদের মধ্যে এ হার আরো বেশি। অতি দরিদ্র পরিবারের ৬৮ শতাংশ প্রাথমিক পেরোতে পারলেও মাধ্যমিক শেষ করার আগেই ঝরে পড়ছে এদের ৯৭ শতাংশ। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এসব তথ্য সংযোজিত এ খবরটি প্রকাশিত হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষার হারে এগিয়ে রয়েছে শ্রীলংকা। দেশটির দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রমকে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ ছাড়াও বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদানসহ শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন তহবিল ব্যবস্থা। শিক্ষার হারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। প্রাথমিকে সব শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমের আওতায় থাকলেও মাধ্যমিকসহ উপরের স্তরে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে এ সুবিধা কম। তাই প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছালেও মাধ্যমিকে গিয়ে এ হার কমছে। ইউনেস্কোর জিইএম রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের অতি দরিদ্রদের মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারছে। এসব পরিবারের ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ছে। এই তথ্যটি সর্বজনীন শিক্ষা কার্যক্রমে আমাদের সরকারকে নতুন মনোযোগের নির্দেশ দেয়।
এদিকে এম ডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ নিবন্ধন করার যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়ে নিবন্ধনের অনুপাতের সমতার হারেও সফলতা আসে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এস ডিজি। সেখানে সুষ্ঠুভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে শিক্ষার ওই সূচকগুলোয় উন্নতি করতে হবে। তাই, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক গণ্ডি পেরোনোর দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ঝরে পড়া রোধে সরকারের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা অপরিহার্য। তা না হলে আমরা আগামীতে এস ডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কতটা সফল হবো, তা ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। যদিও শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে রীতিমত উদাহরণে পরিণত হয়েছে। এবার তাই সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের যেমন উপবৃত্তি দেওয়া হয় তেমনি দরিদ্র পরিবারের ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি এবং ছেলে শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানে বেতনাদি থেকে অন্যান্য খরচ বেশি হওয়ায় দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের এই খরচ মেটাতে অক্ষম। ফলে প্রাথমিকের পর এসব শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে স্কুল বিমুখ হয়। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘুচাতে রোজগারে নামতে বাধ্য হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্যোগে মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার মাধ্যমে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র তথা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা- সরকার দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এ কাজ করবে।

x