প্রাথমিক শিক্ষা পরিদর্শনে জনবল সংকট : শূন্য পদ দ্রুত পূরণ হোক

রবিবার , ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ
171

দেশের বেশিরভাগ উপজেলাতেই পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের নজরদারি ও তদারকি কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোর মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে যথাযথ তদারকি ও নজরদারির অভাবে। এ নিয়ে সম্প্রতি সহযোগী দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষকরা সময়মতো আসছেন কিনা, শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার, অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, এসব নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিদর্শনের বিকল্প নেই অথচ বেশিরভাগ উপজেলাতেই পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটি করা হচ্ছে না। ছয় মাস বা এক বছর বাদে পরিদর্শন করে একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে কিনা, তা বোঝা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ তাই পর্যাপ্তসংখ্যক লোকবল নিয়োগ দিয়ে বিদ্যালয়গুলোয় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সম্প্রতি জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান সংস্কৃতি বিষয়কসংস্থা ইউনেস্কো ‘স্কুল ইনস্পেকশন চ্যালেঞ্জঃ এভিডেন্স ফ্রম সিক্স কান্ট্রিজ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিদ্যালয় পরিদর্শন কার্যক্রমের নানা সমস্যার দিক উঠে আসে।

ইউনেস্কোর ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়, দেশে মূলত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের মাধ্যমে স্কুল পরিদর্শন ও তত্ত্বাবধান করা হয়। সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা ক্লাস্টারভিত্তিক এসব স্কুল পরিদর্শন করে থাকেন। কিন্তু এ নজরদারী ব্যাহত হচ্ছে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে। একজন কর্মকর্তার একটি বিদ্যালয় পরিদর্শনে যেতে কয়েকমাস সময় লেগে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষেত্রে সেটি বছরও ঘুরে যায়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নজরদারি ও তদারকিতে দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ হলোজনবল সংকট। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলাগুলোয় পর্যাপ্তসংখ্যক লোকবল না থাকায় অনেক সময় একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে একাধিক ক্লাস্টারের দায়িত্ব দেয়া হয়। ফলে অধিকাংশ স্কুলই নজরদারির বাইরে থেকে যায়। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় যেখানে শিক্ষকের পদ ১৩ টা/ ১৪ টা করে খালি থাকে সেখানে এরকম অবস্থা হবে না তো কি হবে? প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদনেও জনবল সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশনঃ অ্যানুয়েল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় দেশে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ২৮ শতাংশ সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৩২ শতাংশ, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ১৫ শতাংশ ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ১১ শতাংশ পদ খালি রয়েছে। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে দেশে সাক্ষরতার হার বাড়বে কি করে? বিদেশিরা যদি জিজ্ঞাসা করে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কীভাবে চলছে? বাধ্য হয়ে আমাদের উত্তর দিতে হবেএক্কেবারে নড়বড়ে, যেনতেন প্রকারে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। এই নড়বড়ে অবস্থার কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে যোগ্যতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠদানে অনেক দোষ ত্রুটি অসামঞ্জস্য থাকলেও সরকার শিক্ষা বছরের প্রথম দিন কোটি কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়ে বই উৎসব করা, উপবৃত্তি প্রদান, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র ছাত্রীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়াসহ সুযোগ সুবিধার দিক থেকে প্রাথমিকে সরকার অনেক বড় সফলতা দেখিয়েছে সন্দেহ নেই প্রশ্ন হলো শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে। অব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক শিক্ষার আদর্শ মানতে আটকে দিয়েছে। যদি শিক্ষার গোড়ায় গলদ থাকে তবে উচ্চ শিক্ষার ভিত আরো দুর্বল হয়ে পড়বো জনবল সংকটের কারণে পাঠদান বা পরিদর্শন ব্যাহত হতে থাকলে সেটা হবে সরকারের জন্য ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া।’ এটা কাম্য নয়। প্রাথমিক শিক্ষা হলো জাতির ভিত্তি গড়ে তোলার আসল চাবিকাঠি। প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা শোচনীয় রেখে মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলা যাবে না। সুতরাং পরিদর্শন বিভাগকে ত্রুটিমুক্ত ও শক্তিশালী করার জন্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি প্রাথমিক স্কুলে দক্ষ শিক্ষক ও পরিদর্শক নিয়োগ করার বিকল্প নেই। বিশেষত গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত পরিদর্শন অপরিহার্য। অতএব স্কুলের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের জন্য দেশের যতগুলো উপজেলায় সহকারী উপজেলা কর্মকর্তার পদ শূন্য আছে সেগুলো পুরণ করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশাসরকার জরুরি ভিত্তিতে এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করবে।

x