প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্যগাঁথা

সানজিদা আজাদ রূপা

শনিবার , ২৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
112

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম শিক্ষা। যার শুরুটা প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে। যে শিক্ষাটা দিয়েই আমাদের শুরু সেটাই প্রাথমিক শিক্ষা। সুতরাং সকল শিশুর জন্য ৫ বছর মেয়াদী শিক্ষাই প্রাথমিক শিক্ষা। কথায় বলে যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা আবশ্যক। এক সময়ে বিপুল সংখ্যক কোমলমতি শিশুরা বিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ পেত না। অনেকেই আবার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ঝরে পড়ত। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে বদলে গেছে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্র। পাল্টে গেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। সাফল্যের তালিকায় শিক্ষার অবস্থানও পিছিয়ে নেই।
দেশের সকল শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে একান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ১০০%। আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়তে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে গৃহিত পদক্ষেপগুলো হল-
বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ : বিদ্যালয়ের পরিবেশ থাকবে উৎসবমুখর। তাই বছরের প্রথম দিনেই পালিত হয় বই উৎসব। যেখানে সকল শিক্ষার্থীর হাতে থাকবে নতুন বই। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২,১৭,২১,১২৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে বই বিতরণ করা হয় তার মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে ৩২,৬২,৮৬৪ জন। বিশ্বের কোনো দেশে এত বই বিনামূল্যে বিতরণের রেকর্ড নেই।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা : বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগে সুফল পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আনন্দমুখর শিক্ষাদান পদ্ধতি শিশুদের মধ্যে স্কুল ভীতি দূর করেছে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দৃঢ় হওয়ায় বাড়ছে শিক্ষার মানও। কমছে ঝরে পড়া। প্রাক-প্রাথমিকে শিশুদের তেমন বইয়ের বোঝা নেই। বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় গল্প, ছড়া, কবিতা আবৃত্তি নাচ ও গান। বেশ স্বাচ্ছন্দের সাথে রপ্ত করে শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষ সাজানো থাকে শিশুদের উপযোগী করে। দেয়ালজুড়ে আঁকা খেলনা, পুতুল, ফল, ফুল, জীবজন্তু, রঙিন ছবি, সরকারী বরাদ্দের পাশাপাশি স্কুুল পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় লোকজন সহায়তা করছে এসব উদ্যোগে। সবার প্রচেষ্টায় পরিবর্তন এসেছে প্রাক-প্রাথমিকে।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা : অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। দেশে প্রথমবারের মত এই পরীক্ষা শুরু করে বর্তমান সরকার। এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি এর মত পাবলিক পরীক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কমছে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতি।
যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি : মুখস্থ করে পাশ করার দিন নেই বললেই চলে। পড়তে হবে বুঝতে হবে প্রয়োগ করতে হবে তবেই না পাস। ২০১০-২০১৮ সাল পর্যন্ত যোগ্যতা ভিত্তিক প্রশ্ন ১০%-১০০% করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নের মান। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার ভাল ফল ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। পড়ালেখার মান বেড়েছে দ্বিগুণ। অভিভাবকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে সচেতনতা। পাশাপাশি বাড়ছে প্রাথমিক শিক্ষার মান।
উপবৃত্তি প্রদান : দেশব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত সকল ছাত্রছাত্রীকে আর্থিক সহায়তা প্রদানে এক ইতিবাচক ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। ভর্তি ও উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধকরণ ও প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের মায়ের মোবাইল নম্বরে শিওর ক্যাশের মাধ্যমে অনলাইনে উপবৃত্তির টাকা প্রেরণ করা হচ্ছে। শহর এবং গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার ব্যবস্থা সমতায়নে সরকার সমগ্র বাংলাদেশে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে।
মিড ডে মিল : বর্তমান সরকার মিড ডে মিল কর্মসূচিও চালু করেছে। শিক্ষার্থীরা ক্ষুধার্ত থাকে বিধায় পড়ালেখায় মনোযোগী হতে পারে না। পরবর্তীতে তারা প্রাথমিকে থাকা অবস্থায় ঝরে যায়। অভিভাবক সমাবেশ ও উঠান বৈঠক এর মাধ্যমে অভিভাবকদের এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়। অভিভাবকরা নিজ সন্তানের স্বাস্থ্য ও পড়ালেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে বাড়ি থেকে তাদের সন্তানের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং এ প্রয়া বর্তমানে চলমান। প্রাথমিক শিক্ষার কল্যাণে এটি গৃহিত সফল একটি কর্মসূচি।
ডিজিটাল কনটেন্ট : ডিজিটাল যন্ত্রের সাহায্যে যে কোন কিছু উপস্থাপন, স্থানান্তর বা প্রতিবেদন তৈরি করাটাই হল ডিজিটাল কনটেন্ট। ডিজিটাল কনটেন্ট এর মাধ্যমে পাঠদানে অধিক সুফল পাওয়া যায়। আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরিচিতি বাড়ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য স্ব-শিখনের ব্যবস্থার সুযোগ হচ্ছে। অডিও ও ভিডিও এর মাধ্যমে অনেক কঠিন বিষয়বস্তু খুব সহজেই আয়ত্ব করতে পারছে। শিক্ষার্থীরা আনন্দদায়ক পরিবেশে শিখছে বিধায় তাদের পড়ালেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বার্ষিকড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যম : সহপাঠ্যমিক কার্যমের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়ন পর্যায় হতে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃথকভাবে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা হয়।
স্লিপ বরাদ্দ : শিক্ষার মান বাড়াতে। পাঠের একঘেয়েমিতা দূর করতে গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে হাতে কলমে শেখানোর জন্য প্রয়োজন প্রচুর শিখন সামগ্রী। এ লক্ষ্যে সরকার প্রতিবছর স্লিপের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে প্রতিটি স্কুলে।
ওয়াশ ব্লক : স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আর এ স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। যার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে তৈরী হচ্ছে ওয়াশ ব্লক। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের যত্নের প্রতি লক্ষ্য রেখে গঠন করা হয়েছে ক্ষুদে ডাক্তার টিম। শিক্ষার্থীদের ওজন, উচ্চতা, পরিমাপ এবং কৃমিনাশক ট্যাবলেট সেবনসহ বিভিন্ন কার্যম পরিচালনা করে।
স্টুডেন্ট কাউন্সিল : বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি গণতন্ত্র। আর এ গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব এবং দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় যুক্ত হয়েছে স্টুডেন্ট কাউন্সিল নির্বাচন।
জাতীয় দিবস পালন : জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে সরকার জাতীয় দিবসগুলো পালনে বাধ্যতামূলক করেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে জাতীয় দিবস উদযাপিত হয়ে থাকে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি ভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করেছে। একটি গাছ, একটি প্রাণ সবুজ পৃথিবী উন্নত বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে পালন করা হয় বৃক্ষরোপণ অভিযান। তারপরও কথা থেকে যায় এত কিছুর পরও আমরা যদি নিজেরা সচেতন না হই তাহলে কখনই প্রাথমিক শিক্ষার ১০০ ভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব না। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাই আমাদের উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে নিজেকে সচেতন করা। সকলের সম্মিলিত মনোভাবই পারবে প্রাথমিক শিক্ষাকে সফলতার শীর্ষে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

লেখক : সহকারী শিক্ষক
পাঠানটুলী খান সাহেব বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

x