প্রাণের উচ্ছ্বাস পহেলা বৈশাখে

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
153

সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটকের মধ্যে দিয়ে গত রোববার ‘বাংলা নববর্ষ ১৪২৬’ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নেয়া হয়েছে। প্রখর রোদ উপেক্ষা করে সকাল থেকে ছেলেরা সাদা-লাল রঙের পাঞ্জাবি এবং মেয়েরা সাদা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে বৈশাখের এই মিলনমেলায় যোগ দেন। নানা বয়সী নারী পুরুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষতলা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। অনুষ্ঠানগুলোতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানের সুরের মূর্ছনায় বিমোহিত হন দর্শক শ্রোতারা। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে মাইলস ব্যান্ডের শিল্পী শাফিন আহমেদের ‘মেলায় যাইরে’ গানটির তালে তালে বাঁধভাঙ্গা উল্লাস করতে দেখা গেছে। বৈশাখের উৎসব থেকে বাদ যাননি বয়োঃবৃদ্ধরাও।
এছাড়া বৈশাখী উৎসবকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের ব্যবসায়ীদের চোখে মুখেও ছিল হাসির ঝিলিক।
মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অনুষ্ঠানে কফি শপ, বিরানির দোকান, ঢোল, ডুগডুগি, বাঁশি, মৃৎশিল্প ও পাটজাত পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন। উৎসবে আগত মা-বাবারা তাদের সন্তানদের পছন্দ মত এসব পণ্য কিনে দেন। তবে আগের বছরের মতো এবারও প্রশাসনের নির্দেশে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন আয়োজকরা। অপরদিকে শুধুমাত্র ডিসি হিল ও সিআরবি মিলে পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। চার স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের ভেন্যুগুলোতে। আগত দর্শক-শ্রোতাদের নিরাপত্তার জন্য প্রবেশমুখে তল্লাশি ও আর্চওয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সার্বিক নিরাপত্তায় নগরবাসী সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
সিআরবি শিরীষতলা : সকাল ৮টায় ভায়োলিনিস্ট চট্টগ্রাম নামে একটি সংগঠনের শিল্পীদের ভায়োলিন বাজানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রামের আয়োজনে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠান। এরপর দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় আনন্দ ধ্বনি, সংগীত ভবন, বোধন আবৃত্তি পরিষদ। পরবর্তীতে একে একে মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন সুন্দরম শিল্পীগোষ্ঠী, চারুতা নৃত্যকলা একাডেমি, বাংলাদেশ রেলওয়ে সাংস্কৃতিক ফোরাম, গুরুকুল, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, সংগীতালয়, উদীচী চট্টগ্রাম, নৃত্য নিকেতন, সুর সাধনা সংগীতালয়, উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ, অদিতি সংগীত নিকেতন, আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী, শব্দ নোঙ্গর, ছন্দানন্দ সাংস্কৃতিক পরিষদ, সৃজামি, স্লোগান সাংস্কৃতিক স্কোয়াড, স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, সৃজনী ছন্দ সংঘ, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, নৃত্যনন্দন, অভ্যুদয় ও মনোরমা নৃত্যাঙ্গন। এছাড়া দুপুরে প্রায় অর্ধ শতাধিক বলীর অংশগ্রহণে সিআরবির সাত রাস্তার মোড়ে অনুষ্ঠিত হয় সাহাবউদ্দিনের বলী খেলা। বলী খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন চকরিয়ার বাদশা ও কুমিল্লার শাহজাহান। সিআরবির রেলওয়ের সাত রাস্তার মোড়ে বলী খেলা দেখতে হাজারো দর্শক জড়ো হন। কানায় কানায় পূর্ণ ছিল মাঠের আশে পাশের বিভিন্ন জায়গা।
অনুষ্ঠানে সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, পহেলা বৈশাখ নতুন দিন, নতুন বছর, শুধু নতুন একটি সকাল নয়, যারা আমাদেরকে পেছনে নিয়ে যেতে চায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীপ্ত শপথ নেয়ার দিন আজ। আগের বছরের ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে, ভুলগুলো অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে। পহেলা বৈশাখ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শপথ নেয়ার দিন। যারা দেশকে পেছনে নিয়ে যেতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই, জরাজীর্ণ, অশুভ শক্তি, অমঙ্গল বিতাড়নের লড়াইয়ে জিততে হবে সবাইকে। শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারা বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এবং নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সভাপতি এম এ মালেক বলেন, আজকে নববর্ষের প্রথম দিন। দেখতে দেখতে সকাল থেকে বছরের একটা দিন শেষ হয়ে গেছে। আজকে সারাদিন আমাদের পরিবার নিয়ে যেভাবে একটা দিন উপভোগ করলাম, প্রতিটি দিন যাতে সবাই এভাবে সুখে শান্তিতে কাটাতে পারে সেই কামনাই করছি। আপনারা গত ১১ বছর ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠানে আসছেন, তাই আপনাদের ধন্যবাদ জানাতেই হয়। এছাড়া আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে, তারা যদি এই জায়গাটি না দিত, তাহলে আমরা এরকম সুন্দর অনুষ্ঠান করতে পারতাম না। সবশেষে আমাদের কর্মীরা যারা গত এক মাস ধরে আপনাদের (দর্শকদের) সামনে সুন্দর একটা অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছেন এবং সকাল থেকে শিল্পী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে সহায়তা করেছেন সেজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান মারুফ রুমী বলেন, পহেলা বৈশাখ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃস্টান এবং আদিবাসী মানুষসহ সকলের উৎসব। সকল ভেদাভেদ ভুলে সমতার বাণী নিয়ে আমরা নতুন বছরকে বরণ করেছি। নুসরাত জাহান রাফি হত্যার প্রতিবাদে জানিয়ে তিনি বলেন, আর কোনো নারী আবার কোনো ধরনের সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার না হয় এই শপথ নিয়েই যেন আমরা বাড়ি ফিরি।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম এবং সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করায় এনায়েতবাজার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সভাপতি এম এ মালেক। পরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
এবারের অনুষ্ঠানে ফেনীর আলোচিত মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে আগত দর্শকরাও। এসময় তাদের কপালে ‘নুসরাত হত্যার বিচার চাই’ লেখা ব্যান্ড দেখা যায়। শুধু তাই নয়; সিএমপি কমিশনারের কপালেও তরুণরা তা বেঁধে দেন। সিএমপির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে টাঙানো ফেস্টুনের লিখা হয়েছে-‘দিনের আলোয় কাটুক সব অন্ধকার রাত, এই বাংলায় চাই না আর কোনো ভিকটিম নুসরাত’।
সিআরবিতে ঘুরতে আসার বায়েজিদ শেরশাহ এলাকার বিবি আমেনা শাপলা বলেন, বন্ধুদের সাথে নতুন বছর উদযাপন করতে এসেছি। বছরের এই একটি দিনের জন্য সারা বছর আমরা অপেক্ষায় থাকি। এখানে আসতে পেরে অনেক বেশি ভালো লাগছে, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি গোলাম মোস্তফা কাঞ্চন, হাজী মো. সাহাবউদ্দিন, রিজুয়ানুর রহমান খান, স্বপন মজুমদার, শামীম আহমেদ, ফারুক তাহের, শীলা দাশ গুপ্তা, মো. মোরশেদুল আলম, শহীদ শিমুল অপূর্ব নাথ প্রমুখ।
ডিসি হিল : ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ স্লোগান নিয়ে নগরীর ডিসি হিলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। তীব্র তাপদাহও তাদের দমাতে পারেনি। সকাল থেকে মঞ্চ মাতিয়ে ছিলেন সংগীত ভবন, রক্তকরবী, জয়ন্তী, ছন্দানন্দ, গুরুকুল, সুর-সাধনা, সৃজামি, গীতধ্বনি, রাগেশ্রী, বংশী, খেলাঘর, প্রীতিলতা ও সপ্তডিঙা শিল্পাঙ্গন। এছাড়া নৃত্য পরিবেশন করছে নটরাজ নৃত্যাঙ্গ, ওড়িশি অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, গুরুকুল, ঘুঙুর, সঞ্চারী, চারুতা, দি স্কুল অব ক্লাসিক্যাল অ্যান্ড ফোক ডান্স, নৃত্য নিকেতন ও কৃত্তিকা নৃত্যালয়। আবৃত্তি পরিবেশন করেছেন বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা, উচ্চারক, নরেন ও শৈশব আবৃত্তির সদস্যরা। তবে এবার নগর পুলিশের উদ্যোগে ডিসি হিলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আসা দর্শকদের মাঝে পানি ও হাতপাখা বিতরণ করা হয়েছে। দিনভর নগরবাসী উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেয়।
সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। আমাদের বড় পরিচয় আমরা বাঙালি। এই একটি উৎসবে আমরা ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষ একত্রিত হয়। কোনো বিধিনিষেধ দিয়ে বাঙালিকে তার এই প্রাণের আয়োজন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট : নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট। সকাল ১০টায় নগরীর চট্টেশ্বরী রোডের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি কাজীর দেউড়ী, প্রেসক্লাব, সার্সন রোড প্রদক্ষিণ করে। ‘নন্দিত স্বদেশ নন্দিত বৈশাখ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ ছিল লোকায়িত কাহিনীর সেই কর্ণফুলী। তবে কর্ণফুলীর চোখে জল। দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত কর্ণফুলীই যেন কাঁদছে। নারীর মুখাবয়বের সেই কান্নার সেই দৃশ্যে রয়েছে কর্ণফুলী নদীকে বাঁচানোর আকুল আকুতি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক প্রণব মিত্র চৌধুরী বলেন, এবারের শোভাযাত্রায় বিপন্ন কর্ণফুলীকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতীকী নারীর মুখাবয়বে এক কানে ছিল দুল, অন্যটি খালি। চোখে ঝরছে জল। এছাড়া বড় আকারের মাছ, নৌকা-সাম্পান, হরেক রঙের মুখোশ সহ নানা প্রতিকৃতি নিয়ে চারুকলার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।

x