প্রাণের আলোয়

দীলতাজ রহমান

শুক্রবার , ৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ
15

একটি আবৃত্তি সংগঠনে আবৃত্তি শিখতে গিয়ে শ্যামলীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো মিলনের। অতঃপর পরিচয় থেকে তা প্রেমে পৌঁছে নিতে খুব বেশি সময় ওরা নেয়নি। বিষয়টি প্রকাশিতও হয়ে পড়লো দ্রুত। ইচ্ছে করলে শ্যামলীর পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা এতে বাদ সাধতে পারতেন। কিন্তু ভদ্র নিরীহ এবং সচ্ছল পরিবারে সবাই তাদের মেয়ের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের মূল্য দিলেন। শ্যামলীর বাবার আদেশ পেয়ে শ্যামলীর বড়ভাই একদিন মিলনকে বাড়িতে এনে হাজির করলো শ্যামলীর অজান্তেই।

প্রথম দর্শনেই মিলনের পৌরুষদীপ্ত চেহারা, স্মার্টনেস ও সাবলীল বাচনভঙ্গি মুগ্ধ করলো ওদের সবাইকে। মিলনও তখন সবার অকপট মনোভাবটি বুঝতে পেরে সাহস পেলো বলতে, বললোও বিনয়ের সঙ্গে, ‘মাত্র তো লেখাপড়া শেষ করলামআমার চাকরি হওয়া পর্যন্ত সময় দিতে হবে। শ্যামলীকে আমার বাবামা’র পছন্দ। আপনাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যথাসময়ে আমার বাবা আসবেন।’

কিন্তু শ্যামলীর বাবা অবকাশ দিলেন না। নিজেই গিয়ে হাজির হলেন পাত্রের বাবার কাছে। আপত্তির প্রশ্নই আসে না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ বিয়ের মত দিলেন বরপক্ষ। কিন্তু বিয়ের আগে শ্যামলীর বাবা নিজের ক্ষমতাবলে হবু জামাইয়ের চাকরির ব্যবস্থা করলেন একটি জাতীয় দৈনিকে। সাংবাদিকতার ওপর মিলনের আগেই ট্রেনিং নেয়া ছিলো। মাস্টার্স যদিও কমপ্লিট করেছিলো পলিটিক্যাল সায়েন্সে।

বাবার বিশাল বাড়ি ছেড়ে ভাড়া করা দু’রুমের ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে সারাদিন গান শোনে। কবিতার ক্যাসেট বাজায় আর অনভ্যস্ত শ্যামলী নিজের সংসারটি গোছায়। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় অথবা বাবার বাড়ির অথবা গ্রাম থেকে শ্বশুরবাড়ির কেউ হঠাৎ এসে পড়লে হাত পোড়াতে পোড়াতে নাস্তার আয়োজনও করে সে নিখুঁত আন্তরিকতায়। আর বই দেখে দেখে বিভিন্নধরনের রান্নার হাত পাকানো কসরত তো আছেই প্রতিবেলা।

আনন্দের দীপ্তি কখনো নেভে না। জীবনটা এত সুন্দর হবে, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান মিলন তা ভাবতেই পারেনি। শ্যামলীকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়ানো নিয়ে ওর যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিলো না, তা নয়। ওর নির্ভেজাল সরলতা মিলনকে প্রচণ্ড টানতো। ওর অসাধারণত্ব জয় করতে হলে অবশ্য তেমনি একটি স্পর্শকাতর মন চাই। না হলে সবার নজরে পড়ার কথা নয়। যার পড়ে তার সে জীবন তাকে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরিয়ে দেবেই।

ধনীর দুলালী শ্যামলী কখনো মিলনকে বিলাসী জীবন যাপনে প্ররোচিত করে না। বরং সংগ্রামী হতে উদ্বুদ্ধ করে। শ্বশুরবাড়ির সবার সঙ্গে কী নিবিড়ভাবে মানিয়ে যায়। নিজে নিজের মতো চলা এবং অন্যকেও তার মতো করে চলতে দেয়ার অনিন্দ্যসুন্দর এক স্বাধীন সহজাতবোধ লালন করে শ্যামলী। স্ত্রীর জন্য প্রথমদিকে কিছু কেনা হয়নি শ্যামলীর পছন্দ হবে কি না ভেবে। কিন্তু মিলন যা কিনছে, সেই জিনিসটি হাতে পেয়ে শ্যামলীর উৎফুল্ল ভাবটি দেখে সে চমকে যেত। অন্যকে সুখী করতে পারার মতো নিজে সুখী হতে পারাটাও একটি মহোত্তম গুণ। এটুকুর ঘাটতির আঁচে তাদের নিত্য টানাপোড়েনের অনেকেই দ্বগ্ধাতে দেখেছে সে।

ছোট্ট ফ্ল্যাটটি শ্যামলীর সবদিক দিয়েই স্বর্গের মতো করে তুলেছে। তার একাকিত্ব্ব সে মুখর করে রাখে স্বামীর জন্য অধীর প্রতীক্ষায়। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই পাশের ফ্ল্যাটের মহিলাটি এসে একঝলক তার মনোপীড়া ঘটিয়ে যায়। প্রথম দিন মহিলার স্বাচ্ছন্দ্য আগমনে খুশিই হয়েছিলো শ্যামলী। ভেবেছিলো, যাক বাবা মাঝে মাঝে গল্প করা যাবে। বয়সও কাছাকাছি। যদিও মহিলার পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবন। এক সন্তানের জননী। তবু সখ্য হতে বাধা নেই। শ্যামলী সবখানে জমে উঠতে পারে না। কিন্তু মহিলা প্রতিদিন বোধহয় ছক কষে আসে, কী কী বলে সে শ্যামলীকে জ্বালাবে। সেই প্রথম দিন থেকেই সে শ্যামলীর প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে নিজের দামি জিনিসের তুলনা করে আসছে। এমনকি বিয়ের শাড়ি পর্যন্ত। অস্বস্তি বাড়তে থাকে শ্যামলীর। তবু মাপাজোকা একখানি হাসি সে মহিলার জন্য ঝুলিয়ে রাখে। বোবো, রাগ করে লাভ নেই। সমাজে এদের সংখ্যাই বেশি। তবু মানুষ কি মানুষ ছাড়া থাকতে পারে?

মাকেও তো দেখেছে কত ধরনের মানুষের সঙ্গে মানিয়ে চলতে। শ্যামলী কখনো তার প্রতিবেশিনীর একটানা কথার ফাঁক গলিয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে একটু ঢুকতে পারলেও মহিলা ঠিকই তার আলোচ্য বিষয়টিতে এনে যেন ধোপার কাপড়ের মতো তাকে নিষ্ঠুর ভাবে আছড়ায়। মিলনের বেতনটিও যে তার স্বামীর রোজগারের বহু ভাগের একভাগ, এ কথাও না বলতে পারলেও বোধহয় তার গায়ে ফোস্কা পড়ে। তবু কি আগুন নেভে? শ্যামলীর বিকারহীন পরিতৃপ্ত মুখ দেখে, সহনশীলতা দেখে, ঈর্ষা নিয়েই ফিরে যায় সে আগামীকাল আবার আসার অব্যক্ত প্রতিশ্রুতি রেখে।

মহিলা একএকদিন একএকসেট গহনা পরে আসে। অথচ শ্যামলীর বিয়ের সেটটিও এ যাবত দেখালো না! পরিবর্তে মিলন আর তার যৌথভাবে আবৃত্তি করা কবিতার ক্যাসেট বাজিয়ে শোনায়। ভালো কোনো গান শোনায়। থরেথরে সাজানো বই দেখিয়ে বলে, কখনো ইচ্ছে হলে নিয়ে পড়বেন। বই পড়লে মন বড় হয়। ভালো হয়। সময়ও ভালো কাটে। নিজেকে ফুরফুরে মনে হয়, ভালোমন্দের তারতম্যটা ভেতর থেকে বোঝা যায়। সবচেয়ে বড় কথা চলমান স্রোতে নিজেকে যুক্ত রাখা

কিন্তু বছর দু’য়েকের ছেলেটিকে ইশারায় দেখিয়ে মহিলাটি বলে ‘কনকের বাবা আমাকে পড়তে দেয় না। সমস্ত দিন বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। সে বাসায় ফেরার পর চায়, তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি।’

তবু বই পড়ার অভ্যাস থাকলে এরইমধ্যে সময় হয়ে যায়।’ জোর দিয়ে বলে শ্যামলী।

কনকের বাবা আমার বই পড়া সহ্য করতে পারে না। বাইরের কারো সঙ্গে পরিচিত হই, তাও সে চায় না।

কেন?

ওর ধারণা, তাতে আমি বেশি চালাক হয়ে যাবো।

আপনি কি এমনিতে কম চালাক? ওনার এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি বলেছি, বলবেন।

আপনার এখানে আসি এটাই তো বলা যাবে না।

এমনভাবে থাকলে আপনি মানসিক রোগী হয়ে যাবেন। তা জানেন?

ও মনে করে, বেশি মিশলে মানুষ নষ্ট হয়। এই যে আপনি লেখেন, আবৃত্তি করেনআর আমি আপনার কাছে আসি, ও জানলে এই ফ্ল্যাট বিক্রি করে অন্যখানে বাসা নেবে। আগেও একবার এরকম হয়েছে।

আপনার ভয় লাগে না, এরকম একজন মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে?

গায়ে হাত তোলে না। এমনি শুধু চিৎকার করে, ভয় পাওয়ার মতো রাগী নয়।

উহ! কত রকমের মানিয়ে চলা! এসব নিয়ে শ্যামলী ভাবতে চায় না। পারেও না। এর ক’দিন পর, এক সন্ধ্যায় মিলন বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামলী বলতে শুরু করলো, যেন কথাগুলো বলার জন্য তার দম আটকে ছিলো। ‘জানো, আজ পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোককে দেখলাম।’

জীবনে এই প্রথম তুমি কোনো ভদ্রলোককে দেখলে? জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে উজ্জ্বল মুখে স্ত্রীর দিকে তাকায় মিলন।

আরে তা হবে কেন?

তবে? ওরকম হাফাচ্ছো কেন? দুপুরে ওদের দরজায় টোকা শুনে ভাবলাম, আমাদের দরজায় বুঝি বা

তা পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোককে আবার আমাকে ভেবে বসোনি তো?

দূর, সেরকম হয় নাকি।

ঘটনার শুরুটা তো সেরকমই মনে হচ্ছে।

তুমি তো আসল কথাটা বলতে দিচ্ছো না।

বলো। বলে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করো। তারপর চা দাও।

পিপহোল দিয়ে দেখলাম, মাথায় বিরাট টাক। রুক্ষ মেজাজের কারণে কপাল এমনভাবে কুঁচকানো, মনে হয় বারোমাস আমাশয়ে ভুগছে। দরজায় দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছে, তাও আঞ্চলিক ভাষায়। বিচ্ছিরি রকমের চিৎকার..

তো আমার মাথা থেকে চুল পড়ে গেলে, শুদ্ধ উচ্চারণ রেখে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে তুমি বাবার বাড়ি ফিরে যাবে নাকি?

তোমার চুলের গোড়া সিথিল হতে হতে আমাদের প্রেম আরো শক্ত হবে। আঞ্চলিক ভাষা আমিও কি জানি না ভেবেছো? শুনতে চাও?

ওই দম্পতির এখন সেরকম অবস্থা চলছে।

বিষয়টিকে তুমি অতো সোজা অর্থে নিচ্ছো কেন?

বাঁকা হতে বলছো? সেটা তোমার জন্য ভালো হবে?

শোনো, এতদিন আমাকে শাড়ি গহনা দেখিয়ে স্বামীর রোজগারের পরিমাণ বলে বলে কোণঠাসা করতে চাইছো কেন, এবার বুঝলাম! এবার ঠিক ধরেছি, কেন আমার কান দুটো পচিয়ে ছেড়েছে।

কেন?

যেকোনো মানুষই যখন তার নিজের কোনো বড় ধরনের ঘাটতি প্রকটভাবে টের পায়

হ্যাঁ, পায়। তো?

আরে তাই তো বুঝলাম, শোনো, যা সে নিজেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে না পারে। পুষিয়ে নিতে না পারে, তখন অন্যের চোখে কোনো না কোনোভাবে পূরণ দেখাতে চায়। তাই নিজের বৈরিতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একজন সবল প্রতিপক্ষকে ঘনিষ্ঠভাবে ধরে রাখতে চায়। আজীবন। পারে না অবশ্য। যন্ত্রণা সেখানেও বাড়ে। হীনম্মন্যতার এসব ফলই তাই নির্বোধের মতো কখনো কখনো অতি চালাকেরাও ওরই মতো সেই বানানো প্রতিপক্ষের কাছে প্রকাশ করে ফেলে। অনেকেই বোঝে না মাত্রাজ্ঞানের অবশিষ্টটুকুও লুপ্ত হচ্ছে এতে।

একজন ভদ্রলোককে এই এতটুকুু দর্শনেই এতবড় একটা উপলব্ধি দিয়ে অর্জন করে ফেললে? এর ক্রেডিট কিন্তু ওই ভদ্রলোকেরই।

অবশ্যই। না হলে তোমাকে দেবো ভাবছো?

তা মহাশয় তোমার এত আত্মবিশ্বাস কীসে?

উপচে পড়া যৌথ আনন্দরাশি ভাগাভাগি করতে মিলনের হাতে তুলে দেয়ার সন্ধিক্ষণে ছলকে পড়ে গেলো কতখানি টগবগে চা। মিলন উহু হুহুকরে ওঠার আগেই তার ঘন কালো চুলের ভেতর নিজের পেলব আঙ্গুলগুলো চালিয়ে শ্যামলী মৃদুু থমথমে স্বরে বললো, ‘আমার আত্মবিশ্বাসঅহংকার তোমাকে নিয়েও কি কম! অবশ্যই!

মিলন সুযোগ ছাড়ে না। হাত ধরে আরো কাছে টেনে আনে শ্যামলীকে। শ্যামলী পালাতে চেয়ে পারে না। ডাইনিং টেবিলের উপর পাশাপাশি দু’কাপ চা তুমুল ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। অথচ তার কাছাকাছি তখন নেই ওদের দু’জনের কেউই!

x