প্রাচ্য, পাশ্চাত্য আর মণিপুরী উপাদানের ধ্রুপদ

কহে বীরাঙ্গনা

পাভেল আল মামুন

মঙ্গলবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
70

দুই হাজার বছর আগে ইতালীয় কবি ‘পুবলিয়ুস ওভিডিয়াস নাসো (ওভিড)’ রচনা করেন ২১ পর্বের কাব্যগ্রন্থ ‘হিরোইডাস’। ‘হিরোইডাস’ মূলত পত্র সাহিত্য যেখানে গ্রীক এবং রোমান মিথের নারী চরিত্রগুলি তাদের বীর প্রেমিকদের কাছে ক্ষুব্ধ পত্র লেখেন- যে প্রেমিকেরা তাদের প্রেমিকাদের প্রতি অবিবেচনা প্রসূত আচরণ, অবহেলা বা তাদের পরিত্যাগ করেছে। একই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঊনিশ শতকে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাতেও অনুরূপ কাব্য রচনার উদ্যোগ নেন। তন্মধ্যে ১১টি পর্ব তিনি রচনা করতে পেরেছিলেন তার জীবদ্দশায়। মহাভারতের ১১টি নারী চরিত্রকে তৎকালীন নারী ভাবনার বিপরীতে প্রতিবাদীরূপে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন ১১টি পর্বে (স্বর্গ) তাঁর ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ গ্রন্থে। বিপরীতমুখী ভাবনায় অমিত্রাক্ষর ছন্দে জাদুকরী নৃত্যস্বাদে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক মনোমুগ্ধকর পত্রসাহিত্য। প্রাচ্যের উপাদানে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় অনন্য এক মিথষ্ক্রিয়া এবং মেটামরফসিস (ভাব-রূপান্তর) এই কাব্যগ্রন্থ। তরুণ নাট্যকার ও নির্দেশক শুভাশিস সিনহা ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ গ্রন্থের ১১টি পর্ব থেকে ৪টি পর্ব বেছে নিয়ে মাইকেলের মিথষ্ক্রিয়ার সাথে যুক্ত করেছেন দেশজ নাট্য উপাদান সমূহের- প্রধানত মনিপুরী সঙ্গীত আর নৃত্যকলার। পাশ্চাত্য, প্রাচ্য আর দেশজ অনুষঙ্গের সংমিশ্রণে দিয়েছেন নাট্যরূপ ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নামে। নাটকটিতে বিবৃত হয়েছে চার পর্বে চার নারীর গল্প।
১ম পর্ব :
শকুন্তলা- পিতা-মাতা কর্তৃক পরিত্যক্ত এই নারী বেড়ে ওঠে কম্বমুনির কাছে তার আশ্রমে। মুনি’র অনুপস্থিতিতে তার আশ্রমে আগমন ঘটে রাজা দুষ্মন্তের। রাজ অতিথির সেবায় যথার্থ মনোনিবেশ করেন শকুন্তলা। রাজা জানতে পারেন তিনি ক্ষত্রকূল সম্ভবা। সাকুল্যে মুগ্ধ রাজা প্রেমাসক্ত হয়ে গান্ধর্ব মতে বিয়ে করেন। কিন্তু নিজ দেশে ফিরে তিনি আর শকুন্তলার খবর রাখেননি। শকুন্তলার বিরহ যাতনা প্রকাশ পায় দুষ্মন্তের নিকট লেখা একটি পত্রে।
২য় পর্ব:
দ্রৌপদী- পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। স্বামী অর্জুন তাকে রেখে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে যান সুরপরে। তথায় তিনি ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে ওঠেন । বিরহ কাতর দ্রৌপদী চিঠি লেখেন অর্জুনকে। যাতে বর্ণিত হয় ক্ষোভ, ঈর্ষা।
৩য় পর্ব:
দুঃশলা- অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা ও জয়দ্রথের স্ত্রী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়দ্রথের বাহিনীবধ করে অর্জুন পুত্র অভিমন্যুকে। প্রতিশোধ নিতে মরিয়া অর্জুন যখন জয়দ্রথ বিনাশে প্রতিজ্ঞ তখন শংকিত দুঃশলা স্বামীর কাছে চিঠি লিখে পাঠান। যে চিঠি তাকে উপস্থাপিত করে শান্তিকামী এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞাশীল নারীরূপে।
৪র্থ পর্ব:
জনা- প্রবীর এর মাতা, রাজা নীলধ্বজের স্ত্রী। অর্জুন- এর হাতে যুদ্ধে নিহত হয় প্রবীর। আর নীলধ্বজ্জ করেন পুত্র হন্তারক এর সাথে আপোষসন্ধি। স্বামীর এহেন কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে জনা একটি পত্র লেখেন তাকে। যেখানে অভিব্যক্ত হয় ঘৃণা, ক্ষোভ আর শোকের সংমিশ্রিত এক ভাব।
ক্ষুব্ধ নারীগণের পত্রসমূহ প্রাপকের কাছে কখনো পৌঁছেছে কিংবা পৌঁছেনি তা আমরা জানি না। তবে- ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাট্যকাব্য তা পৌঁছে দিয়েছে দর্শকের কাছে। গত ১০ নভেম্বর এই অনন্য নাট্যকর্মটি নিয়ে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে দর্শকের সামনে হাজির হয় মণিপুরী থিয়েটার। এই দিনের প্রদর্শনীটি ৭৫তম হওয়ায় আয়োজনে ছিল উদযাপনের সংযোজন। প্রারম্ভে নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ এর সূচনা বক্তব্য প্রযোজনাটি সম্পর্কে একটি পূর্বধারণা এবং উচ্চমানের প্রত্যাশা সৃষ্টি করে দেয় দর্শকের মনে। নাটকটি কতখানি তা পূরণ করেছে সেই বিশ্লেষণে যাবার পূর্বে একটু পরিচয় করিয়ে দিতে চাই ‘মণিপুরী থিয়েটার’ সর্ম্পকে। ‘মণিপুরী থিয়েটার’ এর অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। প্রত্যন্ত এই গ্রামে তাদের রয়েছে নিজস্ব নাটমণ্ডপ। সেখান থেকেই তারা সৃষ্টি করছেন অনন্য নাট্যকর্মসমূহ। মূলত মণিপুরী সংস্কৃতি এবং নাটককে প্রাধান্য দিলেও বাংলা ভাষাতেও তারা অনেক নাটক করেছেন। ঘোড়ামারা গ্রামে তারা নিয়মিত আয়োজন করেন বড় বড় নাট্য উৎসবের। অংশগ্রহণ করেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। এটি তৃণমূলের একদল নিবেদিত প্রাণ প্রান্তিক মানুষের সংগঠন- যার অন্যতম লক্ষ্য মণিপুরী সংস্কৃতিকে আগামী প্রজন্মের কাছে টিকিয়ে রাখা এবং পৌঁছে দেয়া।

প্রসঙ্গে ফেরা যাক- ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকের একেবারে শুরুতে আলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে মুহূর্তেই নৃত্যকলার মুদ্রার ব্যবহারে এবং বাচিক অভিনয়ের কৌশলে জ্যোতি সিনহা দর্শকের মনোযোগ এমনরূপে আকৃষ্ট করেন- যেন বহুপূর্ব হতেই দর্শক অভিনয়ের সাথে আছেন। এত দ্রুত মনোযোগ সৃষ্টি এবং দর্শককে সম্পৃক্তকরণ যে কোনো শিল্পকলা প্রদর্শকের জন্যই কঠিন কাজ। মাইকেলের সাহিত্যের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা সহজেই অনুভব করতে পারবেন তা কতটা দুর্বোধ্য – আর বোধগম্যতায় পৌঁছাতে পারলে তা কতটা আনন্দময়। এ-যেন মহাসমুদ্রের উপরিভাগ থেকে কষ্টকর যাত্রা শেষ করে অতল গভীরের মূল্যবান সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ। এই সুন্দর উপভোগ এবং উপভোগ্য করার জন্য দরকার কষ্টসাধ্য যাত্রা, গভীর সাধনা। জ্যোতি সিনহার উচ্চারণ আর প্রতিটি শব্দের চয়নে ছিল সেই সাধনার প্রমাণক। একক অভিনয়ে শিল্পীকে বারবার চরিত্র বদল করতে হয় উপস্থাপন করতে হয় নতুন আঙ্গিক। এই নাটকে অভিনেত্রী তার চেয়েও গভীরে গিয়ে কাজ করেছেন প্রতিটি শব্দ নিয়ে । মুহূর্তে আলাদা-আলাদা শব্দ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ভিন্ন-ভিন্ন অনুভূতি। প্রতিটি শব্দ উপস্থাপিত হয়েছে সমন্বিত অভিনয়ের কৌশলে স্বতন্ত্র অভিব্যক্তিতে। শকুন্তলা পর্বের শুরুতেই নৃত্যমুদ্রা সহযোগে প্রারম্ভিক অংশের অভিনয়ের পর পত্র লিখনের ভঙ্গিতে পঠিত হয়-
বন-নিবাসিনী দাসী নামে রাজপদে,
রাজেন্দ্র! যদিও তুমি ভুলিয়াছ তারে,
ভুলিতে তোমারে কভু পারে কি অভাগী?

এরপরই নৃত্য ভঙ্গিতে অভিনীত হয়-
হায়! আশামদে মত্ত আমি পাগলিনী!
হেরি যদি ধূলারাশি, হে নাথ আকাশে,
পবন স্বনন যদি শুনি দূর বনে
অমনি চমকি ভাবি,- মদকল করী,

অসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে অভিনেত্রী এখানে প্রতিটি শব্দের জন্য আলাদা মুদ্রা ব্যবহার করেছেন পরবর্তীতে পুনরাবৃত্তি না করেই। যার অভ্যন্তরে ছিল শব্দগুলির গুঢ়ার্থ। নৃত্যাভিনয় এতই শক্তিশালী ছিল যে- মাইকেলের উচ্চমার্গের সাহিত্যটি সাধারণ এর কাছে সহজেই পৌঁছে যায়। নৃত্য মুদ্রা ব্যবহারের ধারাবাহিকতা ছিল শকুন্তলা এবং দ্রৌপদীর দুটি পর্বেই। নৃত্য, কণ্ঠ, শরীর ইত্যাদির ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের বিশেষ যোগ্যতা না থাকলে কাজটি সম্ভব নয়। অভিনেত্রী এখানে দক্ষতার শিখরে পৌঁছে দর্শককে এক অপরিচিত নান্দনিক সুখের প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রতিটি চরিত্রের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি আলাদা করেছেন স্বতন্ত্রভাবে। প্রতিটি চরিত্র এবং এর প্রতিটি শব্দচয়ন আলাদা আঙ্গিক পেয়েছে উপস্থাপনার গুণে। এক অসম্ভবকে সম্ভব করে মঞ্চে আনা হয়েছে ‘কহে বীরাঙ্গণা’। নাট্যজন মামুনুর রশীদ নাটক শুরুর আগে দর্শককে একটি তথ্য দেন- অভিনেত্রীর মাতৃভাষা বাংলা নয়। তদুপরি তিনি সঠিকভাবেই আত্মস্থ করেছেন মাইকেলের দুর্বোধ্য শব্দগুলোকে এবং এক ঘন্টার উপস্থাপনে তা নিয়ে খেলেছেন মঞ্চে একটিও অশুদ্ধ উচ্চারণ ব্যতিরেকে। চারটি পর্বে শকুন্তলা, দ্রৌপদী, দুঃশলা আর জনার চারটি পৃথক চরিত্র রূপায়ন করেন অভিনেত্রী। প্রথম দুটি চরিত্রে নৃত্যরূপের প্রাধান্য থাকলেও পরের দুটিতে ছিলো কায়িক ও বাচিক অভিনয়ের প্রাধান্য। চরিত্রগুলোকে আলাদাভাবে উপস্থাপনের জন্য চরিত্রায়ন ভাবনাটি খুবই কার্যকরভাবে সফল। ‘কহে বীরাঙ্গনা’র পর্বগুলি রচিত হয়েছে এমন এক সময়কালে যখন ভারতবর্ষ সবে সতীদাহ প্রথা থেকে বের হয়ে এসেছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন বিধবা বিবাহ নিশ্চিতকরণে উদ্যোগী। নারীর সত্তা ভারতীয় নারী নিজেও তখন ভাল করে চেনেনি। ভারতীয় চেতনায় নারী তখনও স্বামীর মঙ্গলকামনায় নিবেদিত সদা সতীরূপে বিরাজমান অবলা একটি প্রতিচ্ছবি। মানসপটে অংকিত নারীর রূপটি পুরুষের মুখাপেক্ষী এবং অনুগ্রহ প্রত্যাশী। পুরুষ মাত্রই নারীর দেবতুল্য। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, ব্যক্তিত্ব সেখানে ভাবনার অতীত। বঙ্গদেশে আদর্শ নারীর মর্যাদায় তখন পুরাণের নারী চরিত্রগুলোই প্রথম সারিতে পুরুষশাসিত মানসিকতায় চিত্রিত। এহেন সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিপরীতমুখী কম্পন ছিল ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’। তার চারটি পর্বে নির্মিত ‘কহে বীরাঙ্গনাা’র অভিনয়ে জ্যোতি সিনহার অভিব্যক্তিতেও মাইকেলের সেই প্রতিবাদগুলো স্পষ্টতই পাওয়া গেছে। উপরন্তু নাটকটি দেখতে-দেখতে মনে পড়ে যায় ইবসেনের নোরা’র কথা, নারায়নগঞ্জের সিমি’র কথা। এই যে, সমকালীনতা এবং সার্বজনীনতা তা সৃষ্টির কৃতিত্ব এই প্রযোজনায় নির্দেশক শুভাশিস সিনহা এবং অভিনেত্রীর প্রাপ্য। এই নাটকের নির্দেশনা এবং অভিনয়ের মান এমনই যুগপৎ। প্রতিটি চরিত্র তথা প্রতিটি গল্পকে আলাদা করতে সাার্থক ছিল মঞ্চের অন্য অনুষঙ্গ সমূহও- আলো, সঙ্গীত, মঞ্চসজ্জা, পোশাক এবং ভাব-অভিনয় দল।
চারটি চার ধরনের গল্প তথা অনুভূতি কিন্তু অভিনীত হয়েছে একই মঞ্চে একই নকশায়। উপস্থাপন- এর ধরনের কারণে খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল ভিন্ন মঞ্চ-নকশা তৈরি করা। মঞ্চ নির্মাতা আলী আহমেদ মুকুল এবং সজল কান্তি সিংহ সার্থকভাবে খুঁজে নিয়েছেন চারটি গল্পের সাদৃশ্যগুলোকে এবং একই নকশায় ভিন্ন অনুভূতির সৃষ্টির যোগসূত্রমূলক উপাদান সমূহকে। মঞ্চের উপর থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে খড়ের তৈরি কয়েকটি রশি। যা কখনো রাজ প্রাসাদ, কখনো বন, কখনো উদ্যান, আবার কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের ইমেজ সৃষ্টি করে। পৌরাণিক গল্পগুলিতে আমরা এরকম ইমেজ-ই কল্পনা করি সবসময়। মঞ্চ নির্মাণের উপাদানগুলির সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় তৃণমূল জীবনের। রশিতে ব্যবহার করা হয়েছে খড়- যা গ্রামীণ জীবনের নিত্য বিষয়। গল্পের অনুভূতিগুলো আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ জীবনের সাথেই সম্পৃক্ত। নাটকের মঞ্চ নকশা সেই ইঙ্গিতই প্রদান করে। চারটি পর্বের প্রতিটি পর্বেরই শুরুতে রয়েছে সূত্রধরের মতো ছোট বর্ণনার- তার পরই চরিত্রটির বয়ান থেকে পত্রপাঠের অভিনয়ে উপস্থাপিত হয় গল্পগুলি। এই দুয়ের মাঝখানে ব্যবহার করা হয়েছে গল্পের ভাব অনুযায়ী সঙ্গীতের- যা দর্শককে সাহায্য করেছে বর্ণিত গল্পের ভাবার্থের সাথে একাত্ম হতে। এই সংগীতটি প্রারম্ভিকার মতো কাজ করেছে। কন্ঠ আর যন্ত্র সঙ্গীতের সাথে যুগপৎভাবে ভাব-অভিনয় দল দৃঢ় করেছে অন্তর্গত অনুভূতিকে প্রধানত মণিপুরী নৃত্যকলায়। পুরো কাজটিতে আলো, শব্দ, সঙ্গীত সেট এর সাথে অভিনেত্রীর সমন্বয় এর এতটুকু ঘাটতি চোখে পড়েনি। স্বল্প বিরতিতে পোশাকবদলের যে নমুনা দেখেছি তা রীতিমত ম্যাজিক। এই স্বল্প সময়ে এর ব্যবধানে যে পোশাক ভিন্নতা সৃষ্টি করা গেছে তা নিঃসন্দেহে প্রতিটি চরিত্রের জন্য যথার্থ।
নাটকটির অন্যতম প্রশংসাযোগ্য দিক থিয়েট্রিক্যাল কৌশলগুলোর ব্যবহার এবং পরিমিতিবোধ। প্রযোজনাটিতে কোথাও কোথাও নির্দেশক ভেঙেছেন থিয়েটারের ব্যাকরণ। একটি নমুনা দেয়া যাক- প্রচলিত ব্যাকরণে অভিনেতারা নেপথ্য পর্দার (সাইক্লোরমা) রং এর বিপরীত (কন্ট্রাস্ট) রং পোশাকে ব্যবহার করেন। অথচ এই নাটকে নেপথ্য পর্দার রং কালোর বিপরীতে অভিনেত্রী জনার চরিত্রে কালো পোশাক পরেই অভিনয় করেছেন। থিয়েট্রিক্যাল অন্য কৌশলের কারণে বিষয়টি একেবারেই দৃষ্টিকটু মনে হয়নি। শেষ দৃশ্যে মঞ্চের সম্মুখভাগে লাল আলোতে অভিনেত্রী যখন পুত্র প্রবীর-এর শোকে বিলাপ করছেন তখন শুধুমাত্র পরিমিতিবোধের কারণেই তা হৃদয়ে নাড়া দেয়। নাটকটির শুরুর মূহুর্তের মতো শেষ মূহুর্তটিও স্মৃতিতে আটকে থাকার মতো। পুত্রশোকে জলে ডুবে যাচ্ছেন মাতা- দৃশ্যায়নের কৌশলে লম্বা একটি কাপড়ের মাঝখানে বড় ছিদ্র তৈরি করে তার ভেতরে হারিয়ে যান অভিনেত্রী। প্রথমে শরীর, তারপর মাথা তারপর উঁচু হয়ে থাকা হাত ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হয় স্রোতধারায়। দর্শককে এভাবেই বিদায় জানানো হয় শিল্পযাত্রার শেষ মুহূর্তে। নির্দেশক ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাট্যকাব্যের জন্য মাইকেলের যে চারটি পর্ব বেছে নিয়েছেন তার চারটিতে চার ধরনের অনুভূতি বিবৃত। এখানে শুভাশিস সিনহা পর্যায়ক্রমে দর্শককে ভাবের গভীরতায় নিয়ে গেছেন। বিরহের যাতনা থেকে তিনি জাগিয়ে দিয়েছেন ঈর্ষা, প্রতিবাদ আর ঘৃণা মিশ্রিত ক্ষোভ। উপস্থাপন করেছেন নারীর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, প্রতিবাদী রূপ, বিচক্ষণতা আর আপোষহীন বীরত্ব।
ওভিডের ভাব ধারায় মাইকেল এর মূল রচনার সাথে শুভাশিস সিনহার দেশজ এবং মণিপুরি উপাদান সমন্বয়ে নাট্যরূপ এবং জ্যোতি সিনহার শারীরিক, বাচিক আর আত্মজ একক অভিনয় এর সংমিশ্রণে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ হয়ে উঠেছে অনন্য এক ধ্রুপদ ফিউশন। উপরন্তু মাইকেলের দুর্বোধ্যকাব্য- যা মূলত এলিট পাঠকের বোধগম্য বলেই বিবেচিত হয় তা শুভাশিসের নির্দেশনায় মণিপুরী থিয়েটার-এর উপস্থাপন কৌশলে তথা থিয়েট্রিক্যাল অনুষঙ্গ সমূহের কার্যকর এবং যথাযথ ব্যবহারে সর্বোপরি জ্যোতি সিনহার কায়িক ও বাচিক অভিনয়- এর সফলতায় অনেকখানিই সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগে সক্ষম হয়েছে। নাটকটির ভাবের সাথে সাধারণের সফল যোগাযোগ স্থাপনে সবচেয়ে লাগসই উপাদানের অবদান পরিশেষে বলতেই হবে- তা হলো মণিপুরী সংস্কৃতির সফল ব্যবহার। এটি ছাড়া নাটকটি ধ্রূপদ- এর মর্যাদা পেলেও সাধারণের হতে পারতো না। স্বল্প পরিসরে ‘কহে বীরাঙ্গণা’র আলোচনায় কমতি থেকেই যাবে। নাটকটি ভাববাদী এবং কারিগরী উভয় ধরনের নানা প্রপঞ্চ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার উপাদানের স্বকীয়তায় পূর্ণ।
‘কহে বীরাঙ্গনা’ উপস্থাপিত হয়েছে চার বীরাঙ্গনার গল্প নিয়ে- যাদের সৃষ্টি করেছেন মাইকেল। নাট্যকর্মটির উপস্থাপনায় আমরা খুঁজে পাই আরও একজন বীরাঙ্গনাকে- যিনি বীরদর্পে কহিয়াছেন এই সকল বীরাঙ্গনার কথা- এই শিল্পযাত্রায় যাকে সৃষ্টি করেছেন শুভাশিস সিনহা।
দর্শক সারিতে বসে আমার মাথা উঁচু হয়ে যায় আমার দেশে জ্যোতি সিনহার মতো অভিনেত্রী, শুভাশিস সিনহার মতো নির্দেশক আছেন বলে। আমি গর্ব করতে পারি আমার দেশে মণিপুরী থিয়েটারের মতো নাট্যদল আছে – যারা ধর্মজ্ঞান করে নাট্যচর্চা করেন।

x