প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষী মিশরে আমরা

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:০১ পূর্বাহ্ণ
31

২য় পর্ব
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু
না। সেরকম কোন আক্ষেপ নেই। আমাদের দুইজনের মধ্যে কিছুটা ভাওয়ালেপনা আছে। দুজনে খুব ঘুরতে পছন্দ করি। দেশে কি বিদেশে। যখন যেখানে মন ছুটে যায়। ছানাপোনারা উড়ে গেছে। আমরা আবার একাকী হয়ে পড়েছি। তাই ইচ্ছে হলেই ঘুরে বেড়াই। মিশর ঐতিহাসিক জায়গা। প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক দিন থেকে ইচ্ছে ছিল মিশরে আসার। Lions international club এর ISSAME প্রোগ্রাম দুবাইতে হওয়ায় Travel agent মিশরের একটা প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা রাখাতে সুযোগটা পেয়ে গেলাম। বাস।
কায়রো মিউজিয়ামের ফারাও মমীগুলো রাতে ঘুমের মধ্যে আমাদের হোটেলরুমে এসে খুব ঘোরাফেরা করেছে। মাঝে মাঝে দুইহাত বাড়িয়ে গলাও টিপে ধরার চেষ্টা করেছিল। ভাগ্য ভাল ঘুম ভেঙে ছিল। নয়তো কি যে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের সাথে আরও থাকতে হতো। সেই যাই হোক আমাদের গাইড গতরাতেই জানিয়ে রেখেছিল সকালেই আমরা আলেকজান্দ্রীয়া রওনা দেব। আলেকজান্দ্রিয়া একটি রোমাঞ্চকর জায়গার নাম। মহাবীর আলেকজান্ডারের নামে আলেকজান্দ্রিয়া। তাছাড়া আলেকজান্দ্রীয়ার নামের সাথে জড়িয়ে আছে আর এক বিস্ময়কর রাণী ক্লিওপেট্রার নাম। তিনি মিশরের রাণী ছিলেন। ভালবাসতেন মিশরকেও। মিশরের উন্নয়নের জন্য তিনি অনেক কাজ করেছেন। চাষাবাদের সুবিধার জন্য নীলনদ কেটে তিনি আলেকজান্দ্রীয়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কিন্তু মিশরীয় ছিলেন না। তিনি নিজেকে সূর্যদেবতার এর বংশধর হিসেবে দাবি করতেন এর আইসীসের শিরোস্ত্রান পরে থাকতেন। তাঁর রূপ এবং সম্মোহনী শক্তির জন্য পৃথিবী বিখ্যাত ছিলেন। প্রেম আর মৃত্যু তাঁর জীবনে একাকার ছিল। মাত্র ৩৯ বৎসর বেঁচে ছিলেন। তাঁর প্রশংসা যেমন আছে তেমন সমালোচনাও কিন্তু কম নয়। তাছাড়া পশ্চিমা সাহিত্যিকরা তাঁকে খল নায়িকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দান্তে তো বলেই দিয়েছিলেন, লালসার শাস্তি হিসেবে ক্লিওপেট্রা নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। আপাতত ক্লিওপেট্রার চিন্তা বাদ। আমাদের সেই বিশালকার বাসটি ছুটে চলেছে কায়রো শহর পেছনে ফেলে। কায়রোর আবহাওয়া না শীত না গরম। কায়রো ছাড়তে ছাড়তে কিছু দোকানপাট চোখে পড়ে যেখানে সামনে সারিবদ্ধ চেয়ারে বসে অলস লোকজন (?) হুক্কা টানছে। মাঝে মধ্যে বোরকা পরিহিত কিছু মহিলাও চোখে পড়ল। চাকচাক্যহীন সাদামাটা শহর কায়রো। অর্থনীতির অবস্থা বোঝা যায় রাস্তার গাড়িগুলো লক্ষ্য করলে। তবে ওদের অবকাঠামোর প্রশংসা করতেই হয়। ছয় লাইনের বিশাল হাইওয়ের রাস্তায় সেরকম যানবাহন চোখে পড়ল না। আমাদের বিশালদেহী আব্বাসের এই বাস ছাড়া। দূরে দূরে লোকালয় নয় আমাদের মত। কমলা মাল্টার বাগানই চোখে পড়ল। টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা পর ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি আসলাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কায়রোতে লোকজন না দেখলেও এখানে পর্যটকেরা গিজ গিজ করছে। পশ্চিমা সুন্দরীরা সংক্ষিপ্ত কাপড় পরে খুব নিরাপদে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা সবাই খুব ক্ষুধার্ত। বসলাম একটা রেস্টুরেন্টে। সী ফুডের অর্ডার করতেই বিশ মিনিটের মাথায় প্লেটে করে মাছ নিয়ে আসলো। অনেকটা কাঁচা মাছের মত দেখতে। খাব কি! দেখতেই পেট গুলিয়ে আসলো। সবাই চুপ। ইমরান খাওয়া শুরু করল। বলতে থাকলো হেব্বি টেস্ট! কেউ কেউ চেষ্টা করে রেখে দিল। আমি মাল্টা আর কলা খেয়ে নিলাম। মিশরে ফলটাই মনে হয় খুব সহজে পাওয়াও যায় খাওয়াও যায়। তবে হোটেলের সেই খেজুর আর চোখে পড়ল না। যেখানেই খেয়েছি, খাওয়ার পর কলা, মাল্টা, কমলা, আপেলের থালা সাজিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশ কিংবা ভারতের মতো সবখানে চা সহজলভ্য নয়। ইচ্ছে করলেই আপনি রেস্টুরেন্টে চা খেতে পারবেন না। এখন ঘন ঘন চা খাওয়া বন্ধ।
বাস এসে দাঁড়ালো বাতিঘরের সামনে। ময়লা নদীর ধারে দাঁড়ানো মিশরের আলেজান্দ্রিয়ার বাতিঘর। ধারে বলা ঠিক হয়নি। যদি যেতে চাই বোটে উঠেই যেতে হবে। প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের এটি একটি। এটি নির্মিত হয়েছিল খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে। প্রথমে বন্দরের চিহ্ন হিসেবে তৈরি করা হলেও পরবর্তীকালে এটি বাতিঘর হিসেবে কাজ করে।
বাতিঘরের মূল ভিত্তি ভূমির আয়তন ছিল ১১০ বর্গফুট। উচ্চতা ছিল ৪৫০ ফুট। মূল ইমারতের সাথে প্যাচানো সিঁড়ি ছিল। বাতিঘর তৈরির সময় ৪৫০ ফুট উঁচুতে যে বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল ধ্বংস হওয়ার পূর্বে এটি আর কখনো নিভেনি, ৫০ মাইল দূর থেকেও বাতিঘরটি দেখা যেতো। দ্বাদশ শতকে এক প্রবল ভূমিকম্পে বাতিঘরটি ভেঙে পড়ে। আমরা আর যাওয়ার চেষ্টা করলাম না। সারাদিনের ক্লান্তি তখন পেয়ে বসেছে সবাইকে।
এরপর সেই বিখ্যাত গ্রন্থাগারটি
প্রাচীনতম গ্রন্থাগারগুলোর মাঝে প্রথমেই যে নামটি আসে তা হচ্ছে আলেকজান্দ্রিয়ার এই রাজ গ্রন্থাগার। প্রাচীন গ্রীস সভ্যতার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি সুপরিচিত। খৃষ্টপূর্ব ৪৮ সালে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি-দর্শন, আইন ও ধর্ম বিষয়ক নথিপত্র বই ও পাণ্ডুলিপির সর্ববৃহৎ সংগ্রহ।
লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে এবার সোজা হোটেলে। আলেকজান্দ্রিয়াতে আমরা হোটেল শেরাটনেই উঠলাম। সাগর তীরে এর অসাধারণ অবস্থান। মন ভাল করার মত রুম। ছুটে গিয়ে বারান্দার দরজা সরাতেই সাগরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া চুপসে দিল। আহা এত ঠাণ্ডা! শাল জড়িয়ে নিয়ে ইমরানকে বলি, আসো বারান্দায়। দেখ রাতের সাগরের রূপ কি অসাধারণ। ও একটু এসেই আমাকেও ডাকাডাকি শুরু করলো। ঠাণ্ডা লেগে যাবে, জ্বর আসবে! তবুও দাঁড়িয়ে থাকি। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে কোন হোটেলের বারান্দায় এভাবে আর কখনো কি দেখা হবে? হোটেলের লাইটগুলো সাগরের সৌন্দর্য্যে যেন ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। চাঁদের আলোয় প্রাণ ভরে দেখে নিতাম। স্বপ্নের মত রাত। আকাশভরা নীল জোসনা। সাগরের বুকে ছড়ানো জোসনার মায়াজাল। অসাধারণ, অনুভূতি, ঠিক করলাম আজ রাত না ঘুমিয়েই কাটাব। আবার শুরু হলো ডাকাডাকি। চলো খেতে যাব। লবীতে সবাই অপেক্ষা করছে। আসলে আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। আমাদের গাইডকে আমরা অনুরোধ করলাম। আমরা খেতে পারি মতো এমন কোন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। সীফুড খাওয়ার শখ একেবারেই মিটে গেছে। অনেক চিন্তাভাবনা করে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। বাহ! বেশ তো। অর্ডার হলো গ্রীল চিকেন, বেফড সবজি, বীফ আর খবুজ। বীফ বলতে লম্বা সাইজের কাবাব। স্বাদটা কিন্তু ভিন্ন। তবুও সবাই তৃপ্তির সাথে খেল। খাওয়ার পরে সেই থালা ভর্তি ফল বিনে পয়সায়। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা তবুও ভাল লাগছে। ওপাড়ে গ্রীস। বড় বড় সব দার্শনিকের দেশ। আলেকজান্ডার দি গ্রেট এই নগরের প্রতিষ্ঠাতা।
এটি শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র, কারণ এর সাথে সুয়েজ হয়ে আসা প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলের পাইপ লাইন রয়েছে। এই শহরটি গভর্নর শাসিত। এবং এ ধরনের শহরকে মিশরে মুহাফাজা বলা হয়। “দ্যা পার্ল অফ মেডিটেরিয়ান” নামে সুপরিচিত। আলেকজান্দ্রিয়ার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।
টলেমী সাম্রাজ্যের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর ক্লিওপেট্রার অভিশপ্ত জীবনের ট্রাজিক পরিণতি! তার আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে মিশরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডিয়ান শাসনের অবসান ঘটে।

x