প্রস্তুত শপিংমল-মার্কেট বেচাকেনা শুরুর অপেক্ষা

এখনো দেখাদেখি ঘোরাঘুরি, হরেক রকম বাহারি পোশাক, ক্রেতা আকর্ষণে নানা আয়োজন, দাম গত বছরের তুলনায় বেশি

জাহেদুল কবির

সোমবার , ২৮ মে, ২০১৮ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
420

ঈদকে কেন্দ্র করে নগরীর বিপণি বিতানগুলো সেজেছে বর্ণিল সাজে। এর মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা আকর্ষণে নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস। ব্যবসায়ীরা জানান, শপিং সেন্টারগুলোতে এখন পর্যন্ত সেভাবে বেচাকেনা শুরু হয়নি। তারা আশা করছেন ১৫ রমজানের পর মার্কেটে ক্রেতার ঢল নামবে। তবে টেরিবাজার, রেয়াজুদ্দিন বাজার ও তামাকুমণ্ডি লেইনে প্রায় প্রতিদিনই ভিড় করছেন ক্রেতারা। এদিকে নামকরা শপিং সেন্টারসহ পাড়া মহল্লার বিভিন্ন দোকানে ভিনদেশী পোশাক সহজলভ্য হয়ে উঠার কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা খানিকটা বিচলিত। তারা বলছেন, আমাদের দেশে প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সারাবছর কষ্ট শিকার করে আমরা ঈদের এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু দেখা যায়, আমাদের গড়া মার্কেটটি ভারতীয় পণ্যের দখলে চলে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের শোরুমে অনেক ক্রেতা এসে ভারতপাকিস্তানের কাপড়ের খোঁজ নেন। প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ ভারতীয় পণ্য রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাইপথে দেশের বাজারে প্রবেশ করে। অথচ আমাদের পণ্যের গুণগত মান ভারত পাকিস্তানের পণ্যের চেয়ে অনেক ভালো। তারপরেও আমরা আশা করছি, এ বছর সব বয়সী ক্রেতার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশীয় পোশাকই।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শপিং সেন্টারগুলোতে রমজানের প্রথম সপ্তাহে কেনাবেচার কিছুটা জোয়ার ছিল। তারপর থেকে অধিকাংশ ব্যবসায়ী দিনের বেশিরভাগ সময় অলস সময় কাটাচ্ছেন। সরেজমিন গতকাল দেখা গেছে, নগরীর টেরিবাজার, রেয়াজুদ্দিন বাজার, নিউ মার্কেট, জহুর হকার্স মার্কেট, ভিআইপি টাওয়ার, আমিন সেন্টার, ইউনেস্কো সেন্টার, সেন্ট্রাল প্লাজার বিভিন্ন কাপড়ের শো রুমে ক্রেতারা আগ্রহভরে পছন্দের পোশাকটি দেখছেন। এসময় তাদের দোকানিদের সাথে দর কষাকষি করতেও দেখা যায়। একই দৃশ্য দেখা গেছে, স্যানমার ওসান সিটি, শপিং কমপ্লেক্স, ফিনলে স্কয়ার, আফমি প্লাজা ও মিমি সুপার মার্কেটে।

জাহানারা বেগম নামের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা দৈনিক আজাদীকে বলেন, স্যানমারে এসেছি, মেয়ের জন্য কেনাকাটা করতে। পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। মেয়ের জন্য একটি শাড়ি কিনেছি।

স্যানমারের পরিনীতা বুটিকসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মুসলিম আনসারী মিলন বলেন, ঈদের কেনাকাটা এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। গত দুইদিন ধরে ক্রেতা খুব বেশি আাসেনি। যে কয়জন ক্রেতা এসেছেন, তারা দরদাম করে ফিরে যাচ্ছেন। গতবার তরুণীদের প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিলো গ্রাউন। তাই এবারও আমরা বিভিন্ন ডিজাইনের গ্রাউন এনেছি। আমাদের সংগ্রহে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু ৮০ হাজার টাকা দামের গ্রাউন আছে। এছাড়া থ্রি পিচ আছে। দাম পড়বে আড়াই হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে ৮ হাজার টাকার মধ্যে।

ফ্যাশন হাউস ‘অঞ্জনস’ এর ব্যবস্থাপক আবদুল আলিম বলেন, বরাবরের মতো এবারও অঞ্জনস দেশীয় নানা ধরণের পোশাক নিয়ে এসেছে। আমাদের পণ্যের দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশা মাফিক বেচাবিক্রি হচ্ছে না।

আফমি প্লাজার শৈল্পিক শো রুমের ব্যবস্থাপক মো. আরিফুল হক বলেন, নিজস্ব ডিজাইন প্রদর্শন করে ইতোমধ্যে শৈল্পিক ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবছরও আমরা সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছি। কিছু পণ্য এসেছে। আর কিছু আসার পথে রয়েছে। আমাদের পণ্যের দাম গত বছরের মতোই রয়েছে। আমাদের শোরুমে গত বছর যে পাঞ্জাবি ১৮শ টাকা ছিলো সেটা আমর একই দাম রেখে দিয়েছি। আমাদের কাছে ক্রেতাসন্তুষ্টিই আসল।

টেরিবাজার ‘পরশমনি’ ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, রমজানের আগে বেশ ভালো বিক্রি হয়েছে। তবে সত্যিকার অর্থে এখনো ঈদের আমেজ শুরু হয়নি। আমাদের এখানে ৫০ শতাংশ দেশীয় পোশাক ও ৫০ শতাংশ বিদেশী পোশাক রয়েছে। চট্টগ্রামের মানুষজন বিশেষ করে ভারতীয় পোশাকের প্রতি বেশি আগ্রহী। তবে এ বছর এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, দেশীয় পোশাকের দিকেও ঝুঁকছে তারা। আমাদের সংগ্রহে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা দামের পর্যন্ত দেশী ও ভারতীয় শাড়ি আছে। এছাড়া থ্রি পিচ পাওয়া যাবে ৪৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। দাম গত বছরের তুলনায় খুব বেশি বাড়েনি।

টেরিবাজার ‘সানা’ ফ্যাশন হাউসের অন্যতম স্বত্ত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা মতো বিক্রি করতে পারিনি। আশা করছি, আগামী তিন চারদিন পরে ভিড় বাড়বে। ঈদ উপলক্ষে এবার আমরা বেশ ভালো প্রস্তুুতি নিয়েছি। আমাদের এখানে ভারতীয় শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। দেশীয় শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায়। এছাড়া দেশীয় থ্রি পিচ পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকায়।

খুলশীর ফ্যাশন হাউস মেঘ রোদ্দুরের স্বত্ত্বাধিকারী ফ্যাশন ডিজাইনার নাসরিন সরোয়ার মেঘলা দৈনিক আজাদীকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমরা এবার মসলিন জাতীয় পোশাক এনেছি। এছাড়া ঈদ যেহেতু গ্রীষ্মকালে হচ্ছে তাই হাল্কা কালারের সিল্ক ও এন্ডি সিল্কের কিছু শাড়ী ও পাঞ্জাবীর কালেকশন আছে। এছাড়া হাতের কাজ করা বেশ কিছু সুতির থ্রি পিচও এসেছে। দেশে সুতাসহ বিভিন্ন এক্সেসরিজের দাম দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তারওপর ভারতীয় পোশাকের আগ্রাসনের কারণে দেশীয় উদ্যেক্তারা বারবার মার খাচ্ছে। কারণ এসব পণ্য রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথেও আসছে। তাই ব্যবসায়ীরা কম দামে বিক্রি করতে পারছে। কিন্তু আমরা চাইলেও অনেক সময় কম টাকায় পোশাক বিক্রি করতে পারি না। তাই সরকারকে এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

নাসিরবাদ হাউজিংয়ের ফ্যাশন হাউস সায়মা ক্রিয়েশনের স্বত্ত্বাধিকারী ফ্যাশন ডিজাইনার সায়মা সুলতানা দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের পোশাকে হাতের কারুকাজ বেশি। যেহেতু এখন গরমের সময় তাই সুতির কাপড়ের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছি। আমাদের পোশাকের দামও বাড়ানো হয়নি। গত বছর যা ছিলো এবছরও একই দাম রাখা হয়েছে।

ফ্যাশন হাউস মিয়া বিবি’র স্বত্বাধিকারী ফ্যাশন ডিজাইনার সুলতানা নুর জাহান রোজি দৈনিক আজাদীকে বলেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বেচাকেনা সেভাবে হচ্ছে না। তবে গত বছর এমন সময়ে বিক্রি বেশ ভালোই ছিলো। চার পাঁচদিন পর আশা করি পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে। বিভিন্ন শপিং সেন্টারে বর্তমানে ভারতীয় পোশাকের প্রচুর কালেকশন এসেছে এটা ঠিক। তবে মনে হয়, ক্রেতারা এখন দেশীয় পোশাকের দিকেই ঝুঁকছে। দেশীয় পোশাক ভারতীয় পোশাকের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক।

এদিকে ঈদ উপলক্ষে দর্জি দোকানে দম ফেলার ফুসরত নেই। কিছু কিছু টেইলার্সে আর অর্ডার নেয়া হচ্ছে না। কেউ কেউ অবশ্য এখনো অর্ডার নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে ২ নং গেট এলাকার মহুয়া টেইলার্স। টেইলার্সের স্বত্ত্বাধিকারী মো. ইসমাইল বলেন, ঈদে সাধারণত রেডিমেইড কাপড়ের দিকেই তরুণ তরুণীদের আগ্রহ বেশি থাকে। তবে অনেকে পোশাক ফিটিং করানোর জন্য আমাদের কাছে নিয়ে আসে। মূলত আমরা সেইসব নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। দামপাড়া এলাকার দর্জি রুবেল দাশ জানান, গত বছরের চেয়ে এবছর বেশ ভালো অর্ডার পেয়েছেন। কাজের খুব চাপের কারণে এখন সারারাত ধরে কাজ করতে হচ্ছে তাদের।

x