প্রযুক্তি বিষয়ক অপরাধ দমনে প্রযুক্তি দিয়েই লড়তে হবে

বুধবার , ১৭ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
42

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র সম্প্রতি ইন্টারনেট ব্যবহার ও অপরাধ বৃদ্ধি বিষয়ে রাজধানী ঢাকায় এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এতে বক্তারা বলেছেন, অনলাইনে হয়রানি ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় নারী ও শিশুরাই মূলত ভুক্তভোগী। আবার শিশুদের দ্বারাই এ ধরনের অপরাধ বেশি সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধ দমনে ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
‘ইন্টারনেটে শিশু যৌন নির্যাতন’ শীর্ষক সভায় বক্তারা আরো বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে শিশুরা প্রতিনিয়ত হুমকিতে পড়ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ১৮ নারী ও শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট যৌন হয়রানি থেকে নিজেকে সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে জানে না তারা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব উদ্ভাবন বিশ্বকে নতুন মাত্রা দান করছে প্রতিনিয়ত। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত অনাবিল শান্তিময় বিশ্ব রচনার স্বপ্ন এখন সবার চোখে। ইতিমধ্যে পৃথিবীতে ঘটে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক গ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ।
উল্লেখ করার দাবি রাখে যে, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাস্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। মাত্র চারটি কম্পিউটারের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুলেছিলেন প্রথম অভ্যন্তরীণ নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা। ক্রমশ এই নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটে। ১৯৯০-এর দশকে মানুষ পরিচিত হয় ইন্টারনেট জগতের সঙ্গে। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ইন্টারনেটকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তখন থেকেই, অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের ১১ই নভেম্বর বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজারে। ২০০০ সালের শুরুতে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ষাট হাজারে।
ইন্টারনেট এমন এক মাধ্যম, যার ব্যবহার মানুষের জীবনে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আজ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এর সাহায্যে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে, যে কোনো সময় তথ্য বা খবর প্রেরণ করা যায়। রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনোদন, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিপণন প্রভৃতি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ইন্টাননেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় আট লাখ-এ। বর্তমানে সেই সংখ্যা এখন নয় কোটিরও বেশি-যা সত্যিই বিস্ময়কর। ইন্টারনেটের ইতিবাচক সকল দিক স্বীকার করেও বলতে হয়, এর রয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটে। এর মাত্রা এতো বেশি পরিমাণে হচ্ছে, যার কারণে বলতে হচ্ছে ইন্টারনেট ‘সুযোগ’ না হয়ে ‘দুর্যোগ’ হয়ে পড়ছে। এর আগ্রাসী থাবায় শিশুরা আর নারীরা হুমকির মুখে পড়ছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। এই জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ যেমন দরকার, তেমনি দরকার সচেতনতা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠেকা কাজ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু অনলাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঠেকা কাজ চালানো পর্যাপ্ত নয়। কারণ প্রযুক্তি বিষয়ক অপরাধ দমনে প্রযুক্তি দিয়েই লড়তে হবে।
আজকার ইন্টারনেট নির্ভর অপরাধ বা সাইবার ক্রাইম এতোই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তার প্রতিরোধ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় উপকারের বিপরীতে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল এক অন্ধকার জগৎ। যেখানে প্রবেশ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই নিয়ন্ত্রণহীনতা তাদের নিয়ে যাচ্ছে অপরাধ জগতে। ক্রমশ তারা বাসিন্দা হয়ে পড়ছে সেই জগতের।
আমরা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি তাদের গতিবিধি তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলতে পারি। বিশেষ করে ব্যবহারকারীর বয়স বিবেচনায় রেখে তাদের কার্যক্রম মনিটরিং জরুরি। এ জন্য প্রযুক্তিগত উত্তরণও দরকার।

x