প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
48

তুরস্কে আসহাবে কাহাফ ও নবী দানিয়েল (আ.)
তুরস্কের পূর্ব-দক্ষিণে প্রাচীন ছোট্ট শহর তারসূস। তারসূস ঐতিহাসিক শহর হলেও তার দক্ষিণে বন্দরনগরী মারসীন ও উত্তরে আদানা বড় শহর বিধায় ঐ দু’শহরের প্রসিদ্ধিটা বেশি। এ অঞ্চলটি রোমান সাম্রাজ্যের এককালের অংশ বিশেষ হলেও প্রাচীন মূলকে শামের অনেকটা নিকটে কিছুটা পশ্চিমে।
তুরস্কের কয়েকটি স্থানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এটি। যেহেতু তথায় আসহাবে কাহাফ এর গুহা রয়েছে। এ ছাড়াও নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র স্মৃতি বিজড়িত অবস্থানসহ প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য তারসূস প্রসিদ্ধ।
আসহাবে কাহাফ হচ্ছে নবী হযরত ঈসা (আ.) এর আমলের কিছু আগে বা পরে। জালিম বাদশাহ প্রজাদের উপর অমানবিক অত্যাচার করছিল। উক্ত আসহাবে কাহাফের (মতান্তরে) ৭ ব্যক্তি আল্লাহপাকের একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এতে তাঁরা জালিম বাদশাহর রোষানলে পড়েন। শেষে তাদের জীবন বিপন্ন হলে পরে ঈমান আমলসহ জীবন বাঁচাতে তাঁরা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। এ গুহাই ইতিহাসে আসহাবে কাহাফের গুহারূপে প্রসিদ্ধ লাভ করে।
কুকুরসহ এ ৭ জনের পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা কোরআন মজিদের একাধিক স্থানে অবতারণা রয়েছে। সাগরপাড় তুরস্কের প্রসিদ্ধ মারসিন শহর থেকে তারসূস মাত্র ৩৫ কি.মি। তুর্কি ভাষা ইংরেজির সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় চেষ্ঠা করলে পড়তে পারা যায়। রাস্তার দুইদিকে পাহাড় আর পাহাড়,তবে তা তত উঁচু মনে হয়নি। অধিকাংশ পাহাড়ে বাগান অথবা ক্ষেত। দুইদিকেই জনবসতি।
তুরস্কে মিনার ছাড়া মসজিদ কল্পনা করা যায় না। মসজিদ ও সংলগ্ন ছোটখাট অবকাঠামো দূর থেকে দেখা যায়। একটি উঁচু বড় পাহাড় পর্বত এর শীর্ষের নিকটবর্তী স্থানে এ সকল অবকাঠামো।
মূলতঃ গুহার বহিরাঙ্গণে একটি মসজিদের অবস্থান। ৫০/৬০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে মত মসজিদের আয়তন হলেও মিনার আকাশচুম্বি। মসজিদ সংলগ্ন রাস্তার অপর পাশে একটি রেস্টুরেন্ট। একাধিক ছোট ছোট দোকান। বিশাল এ পাহাড়টি পাথরের মনে হবে। যেহেতু গুহায় প্রবেশের প্রাক্কালে পাথর রয়েছে। গুহার প্রবেশমুখ দিয়ে একত্রে ২ জন লোক যাওয়া আসা করতে পারবে। গুহার অভ্যন্তর ভাগ ৩০-৫০ ফুটের কম বাদে বেশি হবে না। আরও ভিতরে একদম অন্ধকার বিধায় কেহ যেতে সাহস করে না। গুহার চারপাশে পাথর আবৃত সমতলে কবরের অনুরূপ মনে হবে। গুহার ভিতর গুরুগম্ভীর ভাব নিতান্তই পারলৌলিক আমেজ অনুভব করছে। গুহার অভ্যন্তরে অন্ধকার থাকলেও বাহিরের আলোর প্রভাবে হালকা স্বর্গীয় আলোর ছোঁয়ায় মন ছুঁয়ে যাবে স্বাভাবিক।
আসহাবে কাহাফের এ প্রসঙ্গে কোরআন মজিদে আল্লাহপাক বলেন,“তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় লইল তখন তারা বলেছিল- হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি নিজ হইতে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর। অতঃপর আমি উহাদিগকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখছিলাম। পরে আমি উহাদিগকে জাগরিত করিলাম জানিবার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোনটি উহাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করিতে পারে। (সূরা কাহফ,আয়াত:৯-১২)
বস্তুতঃ আসহাবে কাহাফের গুহা প্রকৃতই কোনটি তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যেহেতু তুরস্কের এ তারসূসে, জর্ডানের রাজধানী আম্মানের প্রায় ১৫ কি.মি দূরত্বে এবং সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের অনতিদূরে পৃথক পৃথক আসহাবে কাহাফের গুহা রয়েছে। অতএব, কোনটি আসল আসহাবে কাহাফ এর গুহা তা প্রকৃতই রহস্যাবৃত থেকে যায়। আল্লাহ ও তাঁর রসূল (স.) ভাল জানেন।
তবে জর্ডান ও সিরিয়ার আসহাবে কাহাফের গুহা দুটি মূলকে শাম এর ভিতরেই। অপরদিকে, তারসূস এর আলোচ্য গুহাটি রোম সাম্রাজ্যভুক্ত মূলকে শাম এর নিকটতম স্থানে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র.) এর বর্ণনায় দেখা যায়,তিনি একবার হাবীব ইবনে মাসলামার সাথে কোন এক জেহাদ অবিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পথিমধ্যে রোম দেশের এমন স্থানে পৌঁছলেন যেখানে পাহাড়ের গুহাসমূহের সারি রয়েছে। তথায় তিনি কোন একটি গুহার ভিতর বহু মানুষের হাড় ও দেহপিঞ্জর দেখতে পান; তখন কোন একজন বক্তা বলল, ইহা আসহাবে কাহাফের হাড় বলে মনে হয়। এতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র.) বলেন,“ এ হাড়গুলোত ৩ শত বছরেরও অধিক আগের।” মূলতঃ আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি হযরত ঈসা (আ.)’র আবির্ভাব এর কিছু আগে বা পরে এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে এ আসহাবে কাহাফের সংখ্যা হল ৭ জন ও একটি কুকুর। তাঁরা হলেন: মাকসালমীনা, তামূলীখা, মা’তনাস, কাসতুনাস, বীরুনাস, ওয়ানীমুস, নাতুনাস এবং তাঁদের কুকুরের নাম কেতমীর বা হামরান। আসহাবে কাহাফ সম্বন্ধে হযরত শেখ সাদী (রহ.) বলেন,“আসহাবে কাহাফের কুকুর কিছু দিনের জন্য নেক্‌কারদের সৎসঙ্গ অবলম্বন করে মানুষ হয়ে গিয়েছে। আর নূর (আ.)’র পুত্র কোরআন পাপিষ্ঠদের সঙ্গে উঠা-বসা করে নবুওয়াত বংশের মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে।
এখানে নিয়মিত বাস টেক্সী যোগে বহু নর-নারী আসে যেয়ারতের উদ্দেশ্য । এ শহরের প্রাচীন অংশে নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র বসতবাড়ী রয়েছে। খ্রিস্ট-পূর্ব (৬০৫-৫৬২) খ্রিস্টাব্দে ব্যবিলনের রাজা নেভোসান্ডনিজার এর আমলে নবী হযরত দানিয়েল (আ.) বাস করতেন। তখনকার বাদশাহ তার প্রজারদেরকে দাসত্ব বরণ করতে বাধ্য করার পাশাপাশি প্রতিপালকের একত্ববাদ বিরোধী নানা কর্মকান্ডে বাধ্য করত। এমন কি অনেক ইহুদীকে ধর্মীয় কারণে সাজাভোগ করতে হয়েছিল। ঐ সময় নবী হযরত দানিয়েল (আ.) তাঁর পান্ডিত্য ও যোগ্যতাবলে ইহুদীসহ নির্যাতিতদের রক্ষা করতে তৎপর ছিলেন। আজও হযরত নবী দানিয়েল (আ.)’র জন্মস্থানসহ তাঁর বাড়িঘর ভূগর্ভস্থ মাটির অনেক নিচে বিদ্যমান। পর্যটকগণ তথায় অবতরণ করে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ রয়েছে। জন্মস্থান থেকে অনতিদূরে নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র মাজার। তাঁর বিশালাকৃতির কবর শরীফটি প্রাচীন মসজিদের অভ্যন্তরে বলা চলে। এবং তাও মাটির অনেক নিচে অবস্থিত। নিচে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা করা আছে।
একবার দুর্ভিক্ষের সময় নবী হযরত দানিয়েল (আ.)কে ব্যবিলন থেকে তাঁর জন্মস্থান তারসূসে চলে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এরপর তিনি আর ব্যবিলন ফিরে যাননি।
অতঃপর এই তারসূসেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুক (র.)’র আমলে মূলকে শামের পাশাপাশি তারসূসও খেলাফতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তখন নবী দানিয়েল (আ.)’র কবর শরীফটি উন্মুক্ত করা হয়েছিল। বিশাল কবরের ভিতর স্বর্ণের কারুকার্য খচিত সিল্ক কাপড় এর কাফনে আচ্ছাদিত বিশালাকৃতির অক্ষত মৃত দেহটি দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরই হাতের আঙ্গুলের আংটি দ্বারা তিনি যে আল্লাহর নবী হযরতে দানিয়েল (আ.) তা শনাক্ত করা যায়।
উক্ত কবর শরীফে আরও পাওয়া যায় বহু অর্থ-কড়ি। প্রায় ৭ শত বছর অতিক্রান্ত নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র অক্ষত লাশ মোবারক পেয়ে সসম্মানে চুম্বন করেন হযরত আবু মূসা আশআরী (র.)। অতঃপর সেনাপতি ও প্রখ্যাত সাহাবা হযরত আবু মুসা আশয়ারী (র.) কর্তৃক আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (র.) কাছে পত্র লিখেন নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র লাশ মোবারকের দাফন এবং সঙ্গে থাকা টাকা-কড়ি সম্পর্কে করণীয় জানতে।
এতে হযরত ফারুকে আজম (র.) নির্দেশ দেন, নবী হযরত দানিয়েল (আ.)’র লাশ মোবারক যথাযথ মর্যাদায় কাফন,জানাযা ও দাফনের জন্য এবং তাঁর কবর শরীফে পাওয়া টাকা-কড়ি রাষ্ট্রীয় তথা বাইতুলমাল ফান্ডে জমা করে দিতে।
অতঃপর আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (র.)’র নির্দেশে নবী হযরত দানিয়েল (আ.) কে মাটির অনেক গভীরে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
তারসূসের উপকন্ঠে একটি নদী রয়েছে,নদীটির নাম সাইহান-নদী। তারসূসবাসী বিশ্বাস করে হযরত লোকমান হাকীম (আ.) এক সময় তারসূস আগমন করেছিলেন। তাঁর উপর পবিত্র কুরআন মজিদে সূরা রয়েছে এবং তিনি নবী হযরত দাউদ (আ.)’র সমসাময়িক বলে উল্লেখ রয়েছে। হযরত লোকমান হাকীম (আ.)’র মানবের অমরত্ব লাভের গোপনীয় বিষয় আয়ত্বে ছিল। তিনি কোন ব্যক্তির বিষয়ে কোথাও লিখে দিলে সে ব্যক্তি অমরত্ব লাভ করবে বলে তারসূসবাসী বিশ্বাস করত। তেমনিভাবে অমরত্ব লাভের গোপনীয় বিষয় এক কাগজে লিপিবদ্ধ করার পর ঐ সায়হান নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে তারসূসবাসী উক্ত সায়হান নদীর পানি পবিত্র আবে হায়াত মনে করে। নদীটি শহর থেকে কিছুটা দূরত্বে।
সাহাবা হযরত বেলাল (র.) মসজিদ: নবী পাক (স.) ’র অতি প্রিয় সাহাবা এবং মসজিদে নববী (স.)’র প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল হাবসী (র.)। আল্লাহর রাসূল (স.)’র ওফাতের পর নবী পাক (স.) কে না দেখতে পাওয়ায় বিরহ ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তিনি দামেস্কে চলে যান এখান থেকে তিনি এক সময় তারসূস গমন করেছিলেন। তারসূসের যে স্থানে তিনি অবস্থান করেছিলেন তথায় একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি পুনঃনির্মিত হয়।
মারসিন শহরে সাগর পাড়ে রয়েছে মহান সাহাবা হযরত মিকদাদ (র.)’র মাজার। মাজার কমপ্লেক্সটি সাগরের পাশে যে বড় হাইওয়ে রয়েছে,তার অনেকটা নিকটে সাগরের বিপরীতে। বিশাল জামে মসজিদ সংলগ্ন এ মাজার। এর নিকটে টয়লেট ও ওযুর সুন্দর ব্যবস্থা; যেমনটা সমগ্র তুরস্কে রয়েছে। মাজার এলাকা জুড়ে নানা ফল ফুলের বাগানে সবুজের সমারোহসহ নূরানী পরিবেশ বিদ্যমান মনে হবে। তুরস্ক আধুনিক দেশ বিধায় নারী-পুরুষ সমান্তরালে যেয়ারত করতে দেখা যায়। তবে যেয়ারতকালীন মহিলারা শরীর আবৃত মাথায় স্কার্ফ পরে শালীনতা বজায় রাখতে সচেষ্ট।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও গবেষক

x