প্রবাসী আয়ের চলমান ধারাকে গতিময় রাখতে হবে

সোমবার , ৬ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ
42

গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহে এসেছে দারুণ সুখবর। এই সুখবর নিয়ে শুরু হলো নতুন অর্থবছর। দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ২০১৮১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৩১ কোটি ৭০ লাখ (.৩১ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অংক গত বছরের একই মাসের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি, গত অর্থবছরের জুলাই মাসে ১১১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছিল। ২০১৫১৬ অর্থবছরের খরা কাটিয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ করে বাংলাদেশ। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেও সেই ধারা বজায় থাকাকে সুখবর বলছেন অর্থনীতির গবেষকরা। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৬১৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিটেন্সের নিম্নগতি সরকারের নীতিনির্ধারকদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ বৃদ্ধি।

আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিটেন্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।

বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতে রেমিটেন্স আয় আরো বাড়ানোর জন্য হুন্ডি প্রতিরোধ করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। বর্তমানে মোট উপার্জিত রেমিটেন্সের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও কোরিয়ার রেমিটেন্সের ২৩.৩০ শতাংশই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রেরণ করার ক্ষেত্রে নানা ঝামেলা থাকায় প্রবাসীদের অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে তাদের টাকা দেশে প্রেরণ করছে। জনশক্তি রফতানি খাতটি এখনো বলতে গেলে পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এতে বিদেশ গমনকারীদের যেমন বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তেমনি নানাভাবে প্রতারিত হতে হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে বিদেশে জনশক্তি রফতানি করা গেলে এ সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা ১৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। ২০১৭১৮ অর্থবছরের জুলাই মাসে এসেছিল ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। ২০১৬১৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে এসেছিল ১০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীরা চলতি অগাস্ট মাসে আরও বেশি রেমিটেন্স পাঠাবেন বলে প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থবছরের প্রথম মাসে রেমিটেন্সের ভালো প্রবৃদ্ধি সুখবর। তবে আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, কিছুদিন হয়তো এই ইতিবাচক ধারা থাকবে, তারপর নাও থাকতে পারে। সে কারণে রেমিটেন্স বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে যেসব ভাইবোনদের আমরা বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছি তাদের অবশ্যই দক্ষ করে পাঠাতে হবে। আর আরেকটি হচ্ছে, তারা যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়া কম খরচে দ্রুত টাকা দেশে পাঠাতে পারেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

যেহেতু আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম, তাই এ আয় যেন কখনো না কমে, বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের ১৯ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনসংখ্যা এখন বিপুল, এই শ্রমশক্তিকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা দরকার, যেন তাঁরা বিদেশে চাকরির প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন। আর প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর অনানুষ্ঠানিক পন্থা নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করতে হবে। সে জন্য প্রচলিত ব্যাংকিং পন্থাকে আরও সহজ, দ্রুতগতিসম্পন্ন ও লাভজনক করতে হবে।

x