প্রবাসীদের দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনার সুফল নিয়ে সংশয়

সৌদিতে ব্যাংকিং সুবিধা বাড়াতে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান

হাসান আকবর

মঙ্গলবার , ১৮ জুন, ২০১৯ at ৪:২২ পূর্বাহ্ণ
1116

সদ্য ঘোষিত বাজেটে রেমিটেন্স প্রেরণে প্রবাসীদের জন্য নগদ দুই শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা দেয়া হলেও তার সুফল কতটুকু মিলবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকারি ঘোষণায় প্রবাসীরা খুশি হলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যাংকিং সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় হুন্ডি ব্যবসা বন্ধের সম্ভাবনা কম বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ফলে সৌদিতে অবস্থান করা বিশ লাখ প্রবাসীর কথা বিবেচনায় এনে রেমিটেন্স প্রেরণে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি চাকরি এবং ব্যবসা বাণিজ্য করেন। এরমধ্যে সৌদি আরবে প্রায় বিশ লাখসহ মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছেন পঞ্চাশ লাখের মতো প্রবাসী। প্রতিবছর তারা হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে প্রেরণ করেন। এই টাকার বেশিরভাগই পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। গত বছর ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩০ হাজার কোটিরও বেশি টাকা দেশে এসেছে। দেশের অর্থনীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এই ১৫ বিলিয়নেরও বেশি ডলার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহু বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের রেমিটেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এবারই প্রথম তাদের প্রেরিত অর্থের উপর দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। অর্থাৎ একজন প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেলে এক হাজার টাকা প্রেরণ করলে ব্যাংক তাকে এক হাজার বিশ টাকা প্রদান করবে।
সরকারের এই ঘোষণাকে প্রবাসীরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। তারা বিষয়টিকে টাকায় মূল্যায়ন না করে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বলে বিবেচনা করছেন। কিন্তু একই সাথে তারা সরকারের এই উদ্যোগের সুফল নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর জটিলতার অবসান না হলে সরকারের এই উদ্যোগ সফল হবে না।
গতকাল একাধিক প্রবাসী বলেছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠানো টাকার বহু বেশিগুণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয়। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যাংকিং অসুবিধার কারণে হুন্ডিতে লেনদেন বেশি চলে। ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে কম টাকায় হুন্ডি কারবারিদের হাতে কষ্টার্জিত টাকা তুলে দিতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত একজন শ্রমিক বা ব্যবসায়ী প্রতি মাসে কত টাকা দেশে পাঠাতে পারবেন তা নির্ধারিত করে দেয়া আছে। এর বেশি অর্থ তিনি পাঠাতে পারেন না। অপরদিকে শ্রমিকরা যেখানে কাজ করেন সেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের কোনো শাখা নেই। শ্রমিকদেরকে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখাগুলোতে যেতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকে কর্মস্থল থেকে অনেক বেশি দূরে ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে পড়তে হয়। ভোর থেকে প্রবাসীদের লাইন জমে যায় এসব ব্যাংকে। সকাল দশটার পরে গেলে লাইন ছয় সাতশ’ জনে গিয়ে ঠেকে বলে জানান তারা। প্রতিদিন এক একটি শাখা থেকে এক দেড় হাজার মানুষ টাকা পাঠান মাসের শুরুতে। এতে দেশে টাকা পাঠাতে সারাদিন চলে যায়। ব্যাংকে আসা যাওয়ায় গাড়ি ভাড়াও খরচ হয় অনেক। পুরোদিন ব্যাংকে লাইনে কাটানোর মতো সময় এবং সুযোগও অনেকের হয় না। অনেকেই ছুটি পান না। অনেকেই কাজ বন্ধ করে ব্যাংকে আসতে হয়। এতে অর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং হয়রানির কবলে পড়েন তারা।
অপরদিকে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা প্রবাসীদের বাসা থেকে গিয়ে টাকা নিয়ে আসেন। কোনো গাড়ি ভাড়া খরচ হয় না। কাজেরও ব্যাঘাত ঘটে না। টাকা প্রেরণের সুবিধার জন্য হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ব্যাংক রেটের চেয়ে কম দামে কষ্টার্জিত রিয়াল তুলে দেন প্রবাসীরা।
সৌদি আরবে বসবাসকারী রাউজানের আবদুর রহিম নামের এক ব্যবসায়ী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ব্যাংকে ২২.৫ টাকা দরে রিয়াল পাঠানো হচ্ছে। অথচ হুন্ডি কারবারিদের ২২ টাকা দিয়ে রিয়াল দিয়ে দেয়া হয়। হয়রানি এবং কাজের ব্যাঘাত থেকে বাঁচতে শত শত প্রবাসী হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠান বলে দাবি করেন তিনি।
এই প্রবাসী ব্যবসায়ী আরো বলেন, শুধু সৌদি আরবের বিশ লাখ প্রবাসীর রেমিটেন্স ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসলে আর কোনো রেমিটেন্স সরকারের লাগবে না। হাজার হাজার কোটি টাকা হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে। যা দেশের কোনো কাজে লাগছে না। শুধু সৌদি আরবের হুন্ডি বন্ধ করতে পারলেই দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রবাসীরা জানান, সৌদি আরবের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক ছাড়া অন্যান্য ব্যাংক থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো যায় না। আবার ওইসব ব্যাংকের শাখাও সব জায়গায় নেই। এটিই প্রধান সমস্যা। এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীরা বলছেন, সৌদি সরকারের সাথে বৈঠক করে যদি ব্যাংকে টাকা পাঠানোর সুযোগটি অবারিত করা যায় তাহলে বাংলাদেশকে রেমিটেন্স নিয়ে আর ভাবতে হতো না। ব্যাংকিং সুযোগ বৃদ্ধি না করে দুই শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তা প্রবাসীদের কোনো লাভ হবে না মন্তব্য করে তারা বলেন, বিদেশে সময়ের খুব দাম। এই সময় সাশ্রয় করতেই হাজার হাজার প্রবাসী হুন্ডিতে লেনদেন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনার ঘোষণা অবশ্যই একটি সাহসী ও মানবিক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রবাসীদের সংকটগুলো এত সহজে সুরাহা হবে না। তিনি বলেন, মুদ্রাপাচারকারী, চোরাকারবারী, বিদেশে চিকিৎসা ও পড়তে যাওয়া বিপুল সংখ্যক লোক ‘কার্ব’ মার্কেটের ডলারের উপর নির্ভরশীল। এতে হুন্ডির ডলারের কদর কমার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যতদিন হুন্ডির কদর থাকবে ততদিনই তাদের দাপট থাকবে। সরকার ব্যাংকিং চ্যানেলে সুযোগ দুই টাকা বাড়ালে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা পাঁচ টাকা বাড়াবে। অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেবে। ফলে হুন্ডির অপতৎপরতা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের আরো বহু কাঠখড় পোড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন ড. মইনুল ইসলাম।

x