প্রথম দিনেই প্রাণের সঞ্চার

চট্টগ্রামে অভিন্ন বই মেলা শুরু

আজাদী প্রতিবেদন

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
302

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের তখনো দুই ঘণ্টা বাকি। অবশ্য এরি মধ্যেই নতুন বইয়ের গন্ধে মেলাপ্রাঙ্গণে ভিড় করতে শুরু করেন বইপ্রেমীরা। স্টলে-স্টলে ঘুরে মলাট উল্টিয়ে দেখছিলেন নতুন বইয়ের। সাথে খবর নিচ্ছিলেন, প্রিয় লেখকের বই কবে আসবে। বইপ্রেমীদের এ উচ্ছ্বাস, এ আনন্দ ছিল চট্টগ্রামে শুরু হওয়া বইমেলাকে ঘিরে। গতকাল বিকেল পাঁচটায় এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে এ বইমেলার উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। গত কয়েকদিন ধরেই চট্টগ্রামের পাঠক, লেখক এবং প্রকাশকসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই ছিলেন উচ্ছ্বসিত। কারণ, এবারই প্রথম অভিন্ন আয়োজনের বইমেলা হচ্ছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এ বইমেলা বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ এবং চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। তাই বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের প্রথম দিনেই মেলা প্রাঙ্গণে ছিল ভিড়। অসহনীয় এই ভিড়ের মধ্যেও খুশি ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। সেই খুশির ঢেউ ছিল প্রকাশক এবং আয়োজকদের চোখে-মুখেও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বইমেলা ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন। এসময় তিনি ‘একসময় বইপড়া নেশা ছিল’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এখন বইপড়া চলে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এটার বিরূপ প্রভাব সমাজের উপর আছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এটার অনেকগুলো ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক আছে।’ এসময় তিনি অবিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে, আমাদের কিশোর-কিশোরিদের রক্ষার জন্য, তাদেরকে আত্মপ্রত্যয়ী করার জন্য, তাদের দেখা স্বপ্ন পূরণের জন্য তাদের হাতে মোবাইল ফোন-স্মার্ট ফোন তুলে দেয়ার পরিবর্তে বই তুলে দিন।
এ সময় স্মৃতিকাতর হয়ে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমার ছোটবেলায় হেমসেন লেন থেকে মুসলিম হাইস্কুলে হেঁটেই যেতাম। দু-তিনজন বন্ধু হাঁটার সময় বই পড়ে পড়ে হাঁটত। তারা যাতে বই পড়তে পড়তে ফুটপাত থেকে পড়ে না যায় সেজন্য আমরা দুই একজন পাহারা দিতাম।’ এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে আটক হয়ে কারাবরণ করার স্মৃতিরোমন্থন করে তিনি বলেন, ‘আটকের পর কোতোয়ালী থানার যে হাজতে রাখা হয়েছিল, যেখানে মলমূত্র ছিল। তখন আমি বাসায় খবর দিয়েছিলাম আমার জন্য বই পাঠাতে। আমার বাবা দুটো বই পাঠিয়েছিলেন। আমার মনে আছে, সারা রাত আমি ঘুমাইনি। বই পড়েছিলাম। বই পড়ার ফলে সরারাত আমার কষ্ট হইনি।’
তিনি বলেন, মানুষকে বইমুখী করার জন্য, মানুষের সুকুমারবৃত্তি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এসময় ‘যারা বই লিখেন তারা বেঁচে থাকেন’ মন্তব্য করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে অনেক রাজনীতিবিদ ছিলেন। সব রাজনীতিবিদকে মানুষ মনে রাখেনি। যারা নিজের জীবনী লিখে গেছেন, বই লিখে গেছেন তারা বেঁচে আছেন। সমাজে অনেক গুণী মানুষ ছিলেন। যারা হারিয়ে গেছেন। কিন্তু যাদের সম্পর্কে পুস্তিকা বেরিয়েছে তারা এখনো অঅমাদের মাঝে বেঁেচ আছেন। কাজেই বই শুধু সুকুমার বৃত্তি প্রকাশের জন্য নয়; সমাজকে পরিশীলতা করার জন্য নয়; সমাজকে সঠিকভাবে প্রবাহিত করার জন্য নয়; নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যও বইয়ের প্রয়োজন আছে।
চট্টগ্রামে সুন্দরভাবে বইমেলা আয়োজনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আগেও বইমেলা হতো। তবে আগে এত বড়পরিসরে হয়েছে কি না আমার জানা নেই। তবে এবার যেখানে আয়োজন করা হয়েছে জায়গাটি প্রশস্ত। জনগণের অংশগ্রহণের জন্য সুবিধাজনক এবং জায়গাটি পছন্দ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত চমৎকার। তথ্যমন্ত্রী বইমেলাকে ঘিরে প্রতিদিন বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানমালা সাজানোর প্রশংসা করেন।
ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বাঙালিরা মেধাবী। বাঙালিরা যুগে যুগে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইউরোপের বাইরে প্রথম পুরস্কার প্রথম বাঙালি হিসেবে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গাছের প্রাণ আছে, এটা প্রথম যিনি (স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু) আবিস্কার করেন তিনিও বাঙালি। কিছুদিন আগেও পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন ছিল ‘শিকাগো উইলিস টাওয়ার’। এটার স্থপতি বাংলাদেশের ফজলুর রহমান। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. অর্মত্য সেন ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাথমিক স্কুল ছিল ঢাকায়।’
এসময় তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্য পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের অনেক কবিতা এবং গল্পের বই অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এবং সেগুলো সমগ্র পৃথিবীতে সমাদৃত হয়েছে।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের ফলে গত ১০ বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যখন বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী যখন দ্বিতীয়বার দেশ পরিচালনা দায়িত্ব পান তখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। এখন হয়েছে আট কোটির বেশি। সমসংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে। বাংলাদেশে কয়েক হাজার অনলাইন মিডিয়া আছে। স্থানীয়সহ প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি পত্রিকা আছে। ৩০টির বেশি টেলিভিশন অনএয়ারে আছে। ৪৪টি লাইসেন্স পেয়েছে। আরো কয়েকটি অনএয়ারে আসবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘বিগত বইমেলার সঙ্গে এবারের মেলার পার্থক্য আছে। আগে একাধিক সংগঠন আয়োজন করতো। এতে সবার মধ্যে একধরনের ক্ষোভ, আক্ষেপ ও হতাশা ছিল। ঢাকার পরে চট্টগ্রামের অবস্থান। কিন্তু বইমেলা আয়োজনে চট্টগ্রাম ঢাকার চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। এবার সেটা দূর হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের আয়োজন ভিন্ন আঙ্গিকে হওয়ায় প্রাথমিক ভাবে আমরা সফল হয়েছি। আগামীতে এই বই মেলা জিমনেশিয়ামের সামনের রাস্তাসহ সম্প্রসারণ করে আরো বৃহত্তর পরিসরে আয়োজন করা হবে। আর মেলা ঘিরে নতুন নতুন লেখক প্রকাশক সৃষ্টির প্রয়াস থাকবে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে মেলাকে ঘিরে পাঠক-লেখকের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করা। যাতে পাঠকরা লেখকদের উপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করেন। এসময় তিনি প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ে এ বইমেলা শুরু হবে বলেও ঘোষণা দেন।
বইমেলা স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা। বক্তব্য রাখেন বইমেলা কমিটির আহ্বায়ক ও চসিকের কাউন্সিলর নাজমুল হক ডিউক, বইমেলা কমিটির সদস্য সচিব ও চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা সুমন বড়ুয়া, সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি ও মেলা কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু, বইমেলা কমিটির যুগ্ম সচিব লেখক ও গবেষক জামাল উদ্দীন।
মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু বলেন, আগে যখন একই সময়ে একাধিক বইমেলা হতো তখন প্রকাশক কিংবা পাঠক উভয়ে বিব্রত হতেন। কোনটি আসল বইমেলা সেটা কেউ বুঝতে পারতেন না। কিন্তু মেয়রের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবার অভিন্ন মেলা সম্ভব হয়েছে। তিনি সবাইকে বই কিনতে অনুরোধ করে বলেন, সবাই কমপক্ষে একটি করে বই কিনুন। এতে প্রকাশকরা উৎসাহী হবেন।
প্রসঙ্গত, বইমেলা চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকবে। তবে ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। এবারের মেলার আয়তন প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ বর্গ ফুট। স্টল থাকছে ১১০টি। এর মধ্যে ঢাকার প্রকাশকদের জন্য ৬০টি এবং চট্টগ্রামের প্রকাশকদের স্টল থাকছে ৫০টি।
বইয়ের মোড়ক উন্মোচন :
এদিকে গতকাল দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। বই দুটো হচ্ছে জামাল উদ্দীনের ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্য এবং অক্ষর বৃত্ত প্রকাশনীর ‘বসন্ত কাবিন’। আজ থেকেও প্রতিদিন নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উনো্মচন করা হবে।
এদিকে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রথমদিনেই মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় ছিল পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের ভিড়। সংকল্প প্রকাশনের মালিক মো. মনির হোসাইন মল্লিক দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রথমদিন হিসেবে সন্তোষজনক সাড়া মিলছে। শৈলী প্রকাশনীর স্টলে কথা হয় আরিফ রায়হানের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথম দিনেই প্রত্যাশানুযায়ী সাড়া পাচ্ছি। ধীরে ধীরে মেলা আরো জমজমাট হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সাইদ নামে এক পাঠক বলেন, প্রথমদিন দেখতে আসলাম। পরিবেশ ভালো লাগছে। আবারো আসবো বই কেনার প্রস্তুতি নিয়ে।

x