প্রথমবারের মতো ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া

নজরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার , ১২ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
239

৫২ বছর আগের স্মৃতিটা ফিরিয়ে আনতে পারল না ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক হতে পারলেন না হ্যারি কেন। দলকে দুর্দান্ত গতিতে টেনে আনার পর শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যেতে পারল না ইংল্যান্ড।

১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল ইংলিশরা। আর থ্রি লায়ন্সদের সেই পালে হাওয়া দিচ্ছিলেন হ্যারি কেন নামক এক ‘হ্যারিকেন’। তবে শেষ পর্যন্ত সে হ্যারিকেন লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারল না ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ দেয়ালকে। ফলে অতৃপ্তি নিয়ে ফিরতে হলো ইংলিশদের নতুন প্রজন্মকে।

অপরদিকে এবারের বিশ্বকাপে নতুনের কেতন উড়িয়ে এসেছিল ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮ সালে আবির্ভাবেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা ক্রোয়েশিয়া পরের তিন আসরে অংশ নিতে পারলেও পার হতে পারেনি প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি। তবে এবার যেন পণ করেই এসেছিল দলটি; যার প্রতিফলন ঘটিয়েছে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই। নাইজেরিয়াকে হারিয়ে শুরু। এরপর একে একে সব প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে আজ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণে বিভোর ক্রোয়েটরা। সেই স্বপ্ন পূরণের সবকটি ধাপ পার হয়ে আজ শেষ ধাপে মদ্রিচরতিকিচরা। এখন কেবল ইতিহাস গড়ার পালা। গতকাল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে ২১ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে জায়গা করে নেয় প্রথমবারের মতো ক্রোয়েশিয়া। আগামী রোববার মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের মোকাবেলা করবে ক্রোয়েশিয়া।

গতকাল ইংলিশদের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করেছে ক্রোয়েশিয়া। আর তার ফলটা পেয়েছে তারা। হ্যারি কেনড্যালে আলিরাহিম স্টার্লিংদের চেয়ে মদ্রিচরতিকিচমানজুকিচরা দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ক্রোয়েশিয়া। যে দলটিকে ঘিরে ইংলিশরা আবার স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্ব জয়ের, সেই দলটি শেষ পর্যন্ত তীরে এসে তরী ডুবাল। দীর্ঘ ৫২ বছর পর আবার বিশ্ব সেরা হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল ইংলিশদের। আরো একবার ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হচ্ছে ইংলিশদের। আর ক্রোয়েশিয়া যেন নিজেদের নিয়ে গেল অনন্য উচ্চতায়। এখন ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের ইতিহাসের অংশ করার অপেক্ষায় ক্রোয়েশিয়া।

ইংল্যান্ড ম্যাচটা শুরু করল একেবারে ভেল্কি দিয়ে। দু দলের সমর্থকরা নড়েচড়ে বসার আগেই জালে বল পাঠিয়ে দেয় ইল্যান্ড। খেলার চার মিনিট তখন। ক্রোয়েশিয়া ডি বক্সের বাইরে ফাউল করায় ফ্রি কিক লাভ করে ইংল্যান্ড। কিকটা নেওয়ার দায়িত্ব পড়ল কিরেন ট্রিপিয়ার ওপর। সামনে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদের গড়া মানব প্রাচীর। কিন্তু ট্রিপিয়ার দুর্দান্ত কিকটি অনেকটা বাঁক খেয়ে জড়িয়ে যায় জালে। উল্লাসে মাতে ইংলিশ শিবির। এরপর নড়েচড়ে বসে ক্রোয়েশিয়াও। কিন্তু খেলার গতি ধরে রাখার পাশাপাশি বল দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ইংলিশদের রক্ষণ দেয়াল ভেদ করা সম্ভব হচ্ছিল না মদ্রিচরকিতিচদের। উল্টো ৩০ মিনিটে আবার গোল খেয়ে বসছিল ক্রোয়েশিয়া। একটি সংঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে একেবারে ডি বক্সে থাকা হ্যারি কেন যে শট নেন তা ফিরে ক্রোয়েশিয়ার এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে। আর ফিরতি বলে আবার শট নেন হ্যারি কেন। কিন্তু এবার সাইডবার বাঁধা হয়ে দাঁড়াল তার সামনে। পরের মিনিটে সমতা ফেরাতে পারত ক্রোয়েশিয়া। এবার ডি বক্সের বাইরে থেকে রেবিচের দুর্দান্ত শট গ্রিপে নিয়ে নেন ইংলিশ গোলরক্ষক। এরপর দু দলই আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেছে। কিন্ত গোল আর হয়নি। তাই এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের মধ্যদিয়ে চলছিল খেলা। কিন্তু গোল করার মতো সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি কোনো দল। মাঝেমধ্যে দু একটা ঝটিকা শট নিয়েছে মাত্র। তবে ৬৪ মিনিটে সমতা ফেরানোর আরো একটি সুযোগ হাতছাড়া করে ক্রোয়েশিয়া। ৬৮ মিনিটে সমতা ফেরায় ক্রোয়েটরা। ডান প্রান্ত থেকে উঠে আসা সিমের লম্বা ক্রস। ডি বঙে থাকা পেরিচিচ দুর্দান্ত শট ঠিকানা খুঁজে নেয় জালে। সমতা ফিরে ম্যাচে।

৭১ এগিয়ে যাওয়ার সহজ সুযোগটা নষ্ট হয় ক্রোয়েশিয়ার ভাগ্য দোষে। পেরিচিচের দুর্দান্ত শট ইংলিশ কিপারকে পরাস্ত করলেও বল ফিরে সাইডবারে লেগে। নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় ক্রোয়েশিয়া। ৭৬ মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত ইংল্যান্ডও। এবার ডান প্রান্ত থেকে লিনগার্ডের চমৎকার মাইনাস। কিন্তু পা লাগাতে পারেনি কেউ। আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচটিতে এগিয়ে যেতে পারত ক্রোয়েশিয়া। ৮২ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মানজুকিচের শট এবার রুখে দিল ইংলিশ গোলরক্ষক। ম্যাচের বাকি সময়ে আর কোনো গোল হয়নি। ফলে ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচ।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে একচেটিয়া খেলেও গোলের দেখা পায়নি ইংল্যান্ড। এরপর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে। আর তাতেই এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। খেলার ১০৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মানজুকিচ। ডি বঙের বাইরে থেকে হেডের সাহায্যে বল দিয়েছিলেন পেরিচিচ। আর সেই বলে কোণাকুণি শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মানজুকিচ। শেষ পর্যন্ত সেই গোলেই ক্রোয়েশিয়া পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের ফাইনালে।

x