প্রত্নসম্পদ পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে

রবিবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ
21

প্রত্নসমৃদ্ধ বাংলাদেশ অঞ্চল আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের নজরে পড়েছে। দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে তারা মূল্যবান প্রত্ন নিদর্শন সংগ্রহ করে গোপনে পাচার করছে। সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে পত্রিকান্তরে গত ৩১ আগস্ট এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট রাতে ঢাকার নর্দ্দা এলাকার একটি বাসা থেকে ২৮টি অতি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় মনিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে আটকও করা হয়। উদ্ধার হওয়া এসব প্রত্ন নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে হরগৌরি, নবগ্রহ গণেশ, গৌতম বুদ্ধের মতো কষ্টি পাথরের ১০টি মূর্তি। ৫৭৭ খ্রিস্টাব্দের একটি তাম্রলিপি, ১৮টি বিভিন্ন ধরনের ধাতব মুদ্রা ও বেশ কয়েকটি অতি প্রাচীন স্মারকও উদ্ধার করা হয় এ সময়। এসব প্রত্নসম্পদ উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, চক্রটি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রত্নসম্পদ সংগ্রহের পর তা ঢাকায় সংরক্ষণ করে। পরে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সদস্যরা ঢাকায় এসে পরীক্ষানিরীক্ষা করে এসব প্রত্নসম্পদের মূল্য নির্ধারণ করে। মূল্যবান থেকে অতি মূল্যবান এসব প্রত্নসম্পদ চলে যায় বিদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্নসম্পদের সবচেয়ে বড় চালানটি উদ্ধারের পর তা পরিদর্শনে যান জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নবিভাগের অধ্যাপক ও ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল উয়ারীবটেশ্বর প্রত্নগ্রামের পাশাপাশি বিক্রমপুরের বেশকিছু স্থানে ১৬ বছর ধরে জরিপ, অনুসন্ধান, খনন ও গবেষণা কর্মের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের উদ্ধার করা প্রত্ন নিদর্শনগুলো শত ভাগ আসল। এগুলো মহামূল্যবান। অনেক প্রত্নসম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দেশি কিছু রাঘববোয়ালের সহায়তায় আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যরা এসব প্রত্নসম্পদ পাচার করছে। এসব অতি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো শক্ত ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

প্রত্নসম্পদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অপরিসীম। সমাজসভ্যতার বিবর্তন বিশ্লেষণ ও ইতিহাস বিনির্মাণে এ সম্পদের সীমাহীন গুরুত্ব তো রয়েছেই। তার ওপর যেটা রয়েছে, সেটা হলো, কাল নির্ধারণ। ঐতিহাসিকরা প্রত্নসম্পদকে বলে থাকেন পাথুরে প্রমাণ। এর মূল্য অর্থের অঙ্কেও বিচার্য নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশের প্রত্নসম্পদ আজ হুমকির সম্মুখীন। পুরাতত্ত্ববিদদের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বিভিন্ন সময় এ অঞ্চলের প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনের খোঁজ মিলেছে। আবিষ্কৃত এসব প্রত্ন নিদর্শনের কিছুটা সংরক্ষণ হলেও চোরাচালান চক্রের তৎপরতায় বেহাত হয়ে যাচ্ছে এসব অনেক নিদর্শন। এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা তেমন কার্যকর হচ্ছে না, কোন গভীরতর প্রভাব ফেলতে পারছে না। কিছুদিন পর পর দেশে প্রত্নসম্পদ পাচারের ঘটনা ঘটছে। গত ২৭ আগস্টের ঘটনা তার এক দৃষ্টান্ত। একটি হিসেব বলছে, পাচারকালে গত এক যুগে শুধু র‌্যাব জব্দ করেছে ১ হাজার ২৯৭টি প্রত্নসম্পদ। এর বাইরে তো বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও পুলিশের অভিযানেও প্রত্নসম্পদ জব্দ হচ্ছে। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে দেশে প্রত্নসম্পদ পাচারের অবৈধ ব্যবসার আকার কি বিরাট। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যা ধরা পড়ে তার চেয়েও অনেক বেশি পাচার হয়। আর এ পাচার ব্যবসা বড় হচ্ছে দেশীয় চক্রগুলোর সহায়তায়। তারা অর্থের লোভে দেশের মূল্যবান সম্পদ বিদেশে পাচার করতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করছে না। দেখা যাচ্ছে বিদেশিরা চাহিদা ঠিক করে দেয়ার পর সে অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মূল্যবান প্রত্নসম্পদ চুরি করে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে দেশীয় চক্রগুলো। সন্দেহ নেই, প্রত্নসম্পদ পাচার বন্ধ করতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রুটিন অভিযান চালালে হবে না, পরিকল্পিত টার্গেটভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত। একটি বিষয় স্পষ্ট যে স্থানীয়দের সহায়তা ছাড়া বিদেশিদের পক্ষে প্রত্নসম্পদের অবৈধ পাচার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। প্রত্নসম্পদ পাচারে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সর্বাগ্রে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের ফলে অনেক মূল্যবান প্রত্নসম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ অবশ্যই প্রাপ্য তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে পাচার রোধ করা সম্ভব নয়। পাচারকারীরা যে রুটগুলো তাদের কাজের জন্য ব্যবহার করে সেগুলো চিহ্নিত করে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। একই সাথে যেসব বিদেশি এ ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করে ইন্টারপোলের সহায়তায় এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

দেশের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। কিন্তু সংস্থাটির নেই চোরাকারবারিদের ওপর নজরদারি করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা। ফলে সংরক্ষণে যত্নশীল হলেও প্রত্নসম্পদ পাচারে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। সংস্থাটির নিজস্ব কোন ইন্টেলিজেন্স নেই। যদি এনবিআর, দুদকসহ তাদেরও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিজস্ব গোয়েন্দা টিম থাকত, তাহলে তারা প্রত্নসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত বিশেষ নজরদারি করতে পারতো। প্রত্নসম্পদ পাচারের সম্প্রসারণশীল ব্যবসার বাস্তবতায় আলোচ্য গোয়েন্দা টিম গঠনের সময় এসেছে। সেটি হলে সংস্থাটির সক্ষমতা আরো বাড়বে অবশ্যই। তবে এখন যেটা করতে হবে সেটা হলো, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্নসম্পদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং দেশে এর মূল্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। স্থানীয় প্রশাসন এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব করা গেলে পুরাকীর্তি পাচার বন্ধ করা অনেকটাই সহজ হবে।

x