প্রতীক্ষা শেখ

সাদিয়া চৌধুরী

বুধবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ
43

(৩২,২২৮)
‘ও জালালের বউ, রহিমের মা, কে কোথায় আছ? তাড়াতাড়ি আও। আমার ছেলে, আমার মানিক আমার জন্য ট্যাকা পাঠাইছে বিলেতি শাড়ি পাঠাইছে’।
আয়েশা বেগমের এ রকম চিৎকার শুনে অভ্যস্ত পাড়া প্রতিবেশীরা। তাঁর ছেলে মানিক মুক্তিযুদ্ধে যায়। যাওয়ার সময় আয়েশা বেগম অনেক বলেন, ‘বাবা, যাসনে। আমি যে তোরে ছাড়ি এক মুহূর্ত থাকতে পারুম না।’ ছেলে বলে, ‘মা, দেশকে ঐ ঘাতকদের থাইক্যা মুক্ত কইরতে হইব; আমারে যাতি দাও’। ছেলের এমন জেদ মাকে বাধ্য করে ছেলেকে বিদায় দিতে। আয়েশা বেগম ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয়। পূরণ হয় আয়েশা বেগমের মানিকের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু ছেলে আর ফিরে আসে না। লোকেরা বলে সে শহীদ হয়েছে। কিন্তু আয়েশা বেগম তা বিশ্বাস করেন না। কেনইবা বিশ্বাস করবেন তাঁর ছেলেতো মায়ের জন্য চিঠি পাঠায়, শাড়ি আর টাকা পাঠায়।
আজ সকালেও খুশিতে চিৎকার করে উঠেন আয়েশা বেগম। জালালের বউ বলে, ‘বুড়িমার ছেলে যুদ্ধে শহীদ হইছে। বুড়ি শুধু শুধু মিথ্যা আশ্বাস পায়’।
এ কথা শুনতে পেয়ে আয়েশা বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন আর জালালের বউয়ের চুলের মুঠি ধরে অকথ্য ভাষায় বলেন, ‘কি কইলি তুই? এত বড় সাহস! আমার মানিক ফিরে আসবই।’
পরিস্থিতি সামাল দিতে জালাল বলে, ‘না, না, বুড়ি মা, কুসুম ভুল কইছে। ছাড়ি দেন’।
রাগে গজ গজ করতে করতে বুড়ি চলে যায়।
ফারজানা এসব দেখতে থাকে। তার বুড়ির জন্য কষ্ট হয়। এমন সময় স্বামী রাশেদের ফোন আসে। রাশেদ মানিকের বন্ধু। স্বামীর ফোন পেয়ে ফারজানা ঘরে চলে আসে। রাশেদ ফোনে বলে, ‘ফারজানা, বুড়ি মা টাকা আর শাড়ি পেয়েছে’? ফারজানা বলে, ‘হ্যাঁ, আজ সকালেও বুড়ি মা আনন্দে, খুশিতে চিৎকার করতে থাকেন। পাশের বাড়ির ভাবি তাঁর ছেলে মারা গিয়েছে বলেছেন বলে সে কি লঙ্কাকাণ্ড!’
রাশেদ বলে আচ্ছা, ফারজানা, আমি কী কোনো ভুল করছি?
মানিক সেজে তাঁর মাকে টাকা, শাড়ি আর চিঠি দিচ্ছি। মাঝে মাঝে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। ফারজানা বলে, ওমা! একি কথা! তুমি যদি এ দায়িত্ব না নিতে তবে হয়তো তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার দিনই ছেলের শোকে মারা যেত। ‘জানো ফারজানা, যুদ্ধের সময় আমি আর মানিক এক সাথে যুদ্ধ করেছি। মানিক আমাকে বারবার বলেছিল তাঁর মায়ের খেয়াল রাখতে। জানি না কতটুকুই বা দায়িত্ব পালন করেছি।’ আবেগ বিজড়িত কণ্ঠে বলে রাশেদ।
পরদিন সকালে আয়েশা বেগম ঘুম থেকে উঠেন তারপর পুরনো টিনের বাক্স থেকে ছেলের ছবিটি নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। সম্বিত ফিরে এলে উঠান ঝাড়ু দিতে চান। হঠাৎ করে মাথা ঘুরে ওঠে। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। তারপর চোখ মেলে নিজেকে আবিষ্কার করেন বিছানায়। পাশে জালালের বউ, ফারজানা উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন। ডাক্তার বলেছেন যে আয়েশা বেগমের বার্ধক্যজনিত কারণে এ রকম হয়েছে। প্রতিবেশীরা তাঁকে খাইয়ে দাইয়ে আবার নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘরে একলা পড়ে থাকেন আয়েশা বেগম। হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করেন। ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন যে মৃত্যু তাঁর দুয়ারে হানা দিয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি স্পষ্ট দেখতে পান তাঁর মানিক স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আনন্দে ছুটে আসছে মায়ের কাছে।

x