প্রতীক্ষার বৈঠকে শান্তির বার্তা

ট্রাম্প-কিম সমঝোতা, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
109

বিশ্বের মনোযোগ ছিল ট্রাম্পকিমের বৈঠকের দিকে। সবার আশা ‘শান্তির দ্বীপে’ শান্তি বইবে। গতকাল বহুল প্রত্যাশার সেই বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত যৌথ ঘোষণায় কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য উভয় দেশ কাজ করবেণ্ডএমনও বলা আছে ওই ঘোষণায়। গতকাল মঙ্গলবার দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর এই সংক্রান্ত একটি

নথিতে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। প্রথম পর্বের একান্ত বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের ঐতিহাসিক সমঝোতার আভাস দিয়েছিলেন। সকালে কিমের সঙ্গে ৪০ মিনিটের একান্ত বৈঠক শেষে দ্বিতীয় পর্বে দুই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন তারা। বৈঠক শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে তার দেশ। দিনের শুরুতে দুই নেতার মধ্যে কোনো চুক্তির আগাম আভাস না পাওয়া গেলেও স্থানীয় সময় সাড়ে বেলা ১১টায় দুপুরের খাবারের পরের বিরতির এক পর্যায়ে কিছু সময় কিমের সঙ্গে হোটেলের আঙিনায় হাঁটেন ট্রাম্প। সেই সময় তিনি ঘোষণা দেন, দুপুরের পর একটি নথি সই হতে পারে। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিকদের সামনে নথি নিয়ে আসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। খবর বিডিনিউজ, বাংলানিউজ ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।

গতকাল দুই প্রেসিডেন্টের যৌথ ঘোষণার যে ছবি ফটোগ্রাফাররা তুলেছেন, তাতে এর আংশিক কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে এ খবর জানায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো।

ট্রাম্পকিম যৌথ ঘোষণার প্রধান তিনটি বিষয় হলো : . যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া) শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুই দেশের জনগণের আকাঙক্ষা অনুযায়ী সহযোগিতার ভিত্তিতে ‘নতুন ইউএসডিপিআরকে সম্পর্ক’ স্থাপনে প্রতিশ্রুতিবব্ধ থাকবে। ওদিকে, উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। ২. কোরীয় উপদ্বীপে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও ডিপিআরকে যৌথ উদ্যোগ নেবে। ৩. চলতি বছরের ২৭ এপ্রিলের পানমুনজম ঘোষণা পুনর্নিশ্চিত করে কোরীয় উপদ্বীপকে পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করতে ডিপিআরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিম জং উন আবারও কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন। তবে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।

গতকালের ঐতিহাসিক বৈঠকের শুরুতে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানান কিম। বৈঠক শুরুর আগে বৈঠকের প্রারম্ভিক বিষয়গুলো সম্পন্ন করেছেন তারা। এরপর তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সভার জন্য হোটেলের বৈঠক কক্ষে প্রবেশ করেন।

এসময় কিম বলেন, জনাব প্রেসিডেন্ট, আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমি আনন্দিত। কিমের অভিনন্দনের জবাবে ট্রাম্প কিমকে পছন্দ সূচক ইশারা (থাম্বস আপ) দিয়েছেন। ট্রাম্প জানান, তিনি নিশ্চিত তাদের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হবে।

ট্রাম্পের সঙ্গে হাঁটার সময় কিমকে প্রেসিডেন্টের লিমুজিন গাড়ির ভেতরটা দেখতে দেওয়া হয়। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীরা ‘বিস্ট’ নামের গাড়ি দেখান। কিছুক্ষণ বাদে অপেক্ষারত সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি সই করছি। একটি দুর্দান্ত বিস্তারিত দলিল।’ এতে কী আছে, তা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হবে। এটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

বৈঠক নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এর আয়োজনে মূল ভূমিকা পালনকারী দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জেইন। তিনি বলেছেন, গত রাতে ঘুমাতে পারিনি। কেবিনেটের এক বৈঠকে মুন বলেন, আশা করি, বৈঠক সফল হবে এবং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে।

এর আগে সব জল্পনাকল্পনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে সেন্টাসা দ্বীপে বৈঠক শুরু করেন দুই নেতা। প্রথমেই দুই দেশের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে হাত মেলান ট্রাম্পকিম।

কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক মহড়া বন্ধ করবেন ট্রাম্প

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জংউনের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া বন্ধের প্রতিশ্রশুতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোরিয়া উপদ্বীপে ওই যৌথ মহড়াকে ‘খুবই উস্কানিমূলক’ এবং ‘ব্যয়বহুল’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছরই নিয়মিত এ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠান করে আসছে। এ মহাড়কে ‘যুদ্ধের উসকানি’ বলেই মনে করে উত্তর কোরিয়া।

গতকাল কিমের সঙ্গে বৈঠকের পর সিঙ্গাপুরে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ওই যুদ্ধ মহড়া (ওয়ার গেম) খুবই ব্যয়বহুল। এ মহড়া অনুষ্ঠানের জন্য বেশিরভাগ অর্থ আমরাই দিতাম। বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেহেতু আমরা আলোচনা করছিআমার মনে হয় ওই যুদ্ধ মহড়া চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

তবে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করার কথা বলে ট্রাম্প আসলে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

বিশ্ব একটি বড় পরিবর্তন দেখবে’

আমরা একটি ঐতিহাসিক বৈঠক সম্পন্ন করেছি এবং একটি ঐতিহাসিক নথিতে সাক্ষর করেছি। বিশ্ব একটি বড় পরিবর্তন দেখতে চলেছে। সিঙ্গাপুরে বৈঠকের পর একটি নথিতে স্বাক্ষরের সময় অনুবাদকের মাধ্যমে এ কথা বলেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গত ১৮ মাসে উত্তরের শীর্ষ নেতার সঙ্গে তার সম্পর্কের উত্থানপতনের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। প্রথম দিকে একে অপরকে চূড়ান্ত অপমান করে যুদ্ধের হুমকি দিলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুজনের মধ্যে উষ্ণতার আবহ গড়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বৈঠক। এতে বৈরিতার পরিবর্তে জেগে উঠেছে শান্তির আশা।

নিষেধাজ্ঞা থেকে উত্তরের রেহাই চায় চীন

সিঙ্গাপুরে ট্রাম্পকিম সম্মেলনে কোরীয় উপদ্বীপ নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে একটি ‘বিস্তারিত’ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর হওয়ায় এখন উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে করে চীন। বৈঠকের পর বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং বলেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপ করা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞাগুলো এমনভাবে তৈরি যে, দেশটির কার্যক্রমের পরিবর্তন হলে সে অনুযায়ী ওই নিষেধাজ্ঞা সমন্বয়, স্থগিত বা তুলে নেওয়া যাবে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়নি। তবে বর্তমানে আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের যে চেষ্টা চলছে, নিরাপত্তা পরিষদের সে উদ্যোগে সমর্থন দেওয়া উচিত বলে আমাদের বিশ্বাস।

বৈঠকের উল্লেখযোগ্য ৫ বিষয়

দীর্ঘ দিন একে অপরকে চূড়ান্ত অপমান ও যুদ্ধের হুমকি দিলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুজনের মধ্যে উষ্ণতার আবহ গড়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বৈঠক। দুই নেতার প্রথম বৈঠকের উল্লেখযোগ্য পাঁচটি বিষয় হলো :

পতাকা : উত্তর কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ঘিরে উভয় দেশের পতাকা পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশকে সহযোগী ও সমকক্ষ হিসেবে বোঝানো হয়।

কোরিওগ্রাফি : ট্রাম্প প্রথমে হোটেল ছাড়লেও কিম পৌঁছানোর সাত মিনিট পর হোটেলে প্রবেশ করেন ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ট্রাম্পকে শ্রদ্ধা জানানোর নমুনা হিসেবে ট্রাম্পের আগে বৈঠকস্থলে পৌঁছান। এই দুই নেতা পাশাপাশি হেঁটেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রথম হাত প্রসারিত করেছেন ট্রাম্প।

করমর্দন : ট্রাম্প এবং কিম বৈঠক শুরুর আগে দুই দেশের পতাকার সামনে করমর্দন করেন। তারা প্রায় ১২ সেকেন্ড সময় ধরে করমর্দন করেছিলেন। এর আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাথে ২৬ সেকেন্ড ধরে করমর্দন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ।

গুরুত্বপূর্ণ উক্তি : ট্রাম্প এই বৈঠককে সম্মান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের মধ্যে একটি অসাধারণ সম্পর্ক স্থাপন হবে। এসময়ে কিম তাদের দেশের পুরনো একতরফা মনোভাব এবং এর চর্চা স্বীকার করেন। যার কারণে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রউত্তর কোরিয়ার মধ্যে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল।

বৈঠকের সময় : ট্রাম্প ও কিম প্রায় ৪০ মিনিট ধরে বৈঠক করেন। এসময় তাদের সঙ্গে উভয় দেশের অনুবাদকরা উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প এই বৈঠকে অসাধারণ সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলেন। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, কিম পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে সচেতন না হলে তিনি মাত্র এক মিনিটের জন্য কথা বলতে পারবেন।

x