প্রতিষ্ঠাকালীন জনবলেই চলছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড

২২ বছরে পরীক্ষার্থী বেড়েছে ৫ গুণ স্কুল কলেজ হয়েছে দ্বিগুণ

রতন বড়ুয়া

শুক্রবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৯ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
109

১৯৯৫ সালের আগ পর্যন্ত এ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে। শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের জন্য এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ছুটতে হতো সুদূর কুমিল্লায়। চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, চট্টগ্রাম। এর মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ-ভোগান্তি থেকে মুক্তি পায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা) শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠাকালীন (১৯৯৬ সালে প্রাপ্ত) জনবলেই চলছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পরও প্রতিষ্ঠানটির জনবল বাড়েনি। শুরুর জনবল নিয়ে খুঁড়িয়েই চলছে এটি। অথচ প্রতিষ্ঠাকালীন দুটি পাবলিক (এসএসসি ও এইচএসসি) পরীক্ষা থাকলেও বর্তমানে তিনটি পাবলিক পরীক্ষা নিতে হয় শিক্ষাবোর্ডকে। ২০১০ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সমাপনী পরীক্ষা হিসেবে জেএসসি যুক্ত হয়।
জনবল সংকটে পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফল প্রক্রিয়ায় হিমশিম খেতে হয় উল্লেখ করে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানান। শিক্ষাবোর্ড সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪৫ হাজার ৭২১ জন পরীক্ষার্থী। আর এইচএসসিতে অংশ নেয় ৩৮ হাজার ৭৬৫ জন। দুটি পাবলিক পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৪ হাজার ৪৮৬ জন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার শুরুতে সবমিলিয়ে এক লাখেরও কম পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের সাথে সম্পৃত্ত ছিল শিক্ষাবোর্ড। কিন্তু ২০১৮ সালে কেবল জেএসসি পরীক্ষাতেই অংশ নিয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ২৯৭ জন পরীক্ষার্থী। একই বছরে এসএসসি ও এইচএসসিতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৭৮ জন এবং ৯৭ হাজার ৭৮৪ জন। হিসেবে শুধু ২০১৮ সালে তিনটি পাবলিক পরীক্ষায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫৯ জন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা পরিচালনা, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশ করতে হয়েছে শিক্ষাবোর্ডকে। ১৯৯৬ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের পরক্ষার্থীর এ সংখ্যা ৫ গুণেরও বেশি। কেবল পরীক্ষা আর পরীক্ষার্থীই নয়; পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে স্কুল-কলেজের সংখ্যাও।
শিক্ষাবোর্ডের তথ্য মতে, ১৯৯৬ সালে শিক্ষাবোর্ডের অধীন স্কুলের সংখ্যা ছিল ৭১০টি। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬টিতে। একই ভাবে শুরুতে বোর্ডের অধীন কলেজের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০টিতে। হিসেবে গত ২২ বছরে স্কুল-কলেজের এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পরীক্ষা পরিচালনা, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের পাশাপাশি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, স্বীকৃতি, বিষয়খোলা, পরিদর্শন, ম্যানেজিং কমিটি অনুমোদন, বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয় শিক্ষাবোর্ডকে। এছাড়াও তিনটি পাবলিক (জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি) পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র বিতরণ ও ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ, পরীক্ষকদের বিল পরিশোধসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে শিক্ষাবোর্ড।
শাখা ও জনবল :
১৯৯৬ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর এ এম এম আহসান উল্লাহ মোট ৩৯৫ জনের একটি জনবল কাঠামো প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেন। কিন্তু এর মধ্যে ১৫৬টি পদ অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অনুমোদিত ১৫৬টি পদের মধ্যেও সবমিলিয়ে ১০৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি কর্মরত রয়েছেন বলে জানান শিক্ষাবোর্ড সচিব প্রফেসর শওকত আলম। বাকি ৫০টি পদ শূন্য বলে জানান তিনি।
শিক্ষাবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬টি শাখার মাধ্যমে শিক্ষাবোর্ডের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব শাখার মধ্যে রয়েছে, সংস্থাপন শাখা, পরীক্ষা শাখা, কলেজ শাখা, বিদ্যালয় শাখা, হিসাব শাখা ও কম্পিউটার সেকশান। ৬টি শাখায় শিক্ষাবোর্ডে সবমিলিয়ে বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারির সংখ্যা ১০৫ জন। এর মধ্যে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৭ জন কর্মকর্তা (প্রথম ও ২য় শ্রেণির পদে) প্রেষণে নিযুক্ত আছেন। এর মধ্যে একজন সাময়িক বরখাস্তও। স্থায়ী জনবলের মধ্যে ৩ জন প্রথম শ্রেণি ও ৯ জন দ্বিতীয় শ্রেণির পদে কর্মরত আছেন। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি হিসেবে কর্মরত আছেন ৭৬ জন। ১৯৯৬ সালে অনুমোদন পাওয়া ১৫৫টি পদের মধ্যেও অর্ধশত পদ এখনো শূন্য।
পরীক্ষা শাখা :
শিক্ষাবোর্ডের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হয় পরীক্ষা শাখাকে। এই শাখাকে বোর্ডের নিওক্লিয়াসও বলা চলে। প্রতি বছর তিনটি পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি) আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পন্নের যাবতীয় কার্যক্রম এ শাখার উপরই ন্যাস্ত। প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষা যেন এক একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। তিনটি (পাবলিক) পরীক্ষা মিলিয়ে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ করতে হয় এ শাখাকে। আর এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য শাখায় মাত্র ৬ জন কর্মকর্তা ও ১৬ জন কর্মচারি কর্মরত আছেন বলে জানিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। সার্বিক কার্যক্রম সম্পাদনে ত্রাহি অবস্থার কথা তুলে ধরে শাখায় অন্তত ৫০ জন লোকবল প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন পরীক্ষা শাখার প্রধান।
কম্পিউটার সেকশান :
পরীক্ষা শাখারই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ কম্পিউটার সেকশান বা কেন্দ্র। এই সেকশানেই বোর্ডের যাবতীয় পরীক্ষার ফলাফল প্রক্রিয়াকরণের কাজ সম্পাদন হয়ে থাকে। কিন্তু বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন ও ফলাফল প্রক্রিয়াকরণে মাত্র তিনজন কর্মকর্তা ও তিনজন কর্মচারি এ শাখায় নিয়োজিত আছেন।

বিদ্যালয় শাখা :
শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি প্রাপ্ত ১ হাজার ২৪৬টি বিদ্যালয় (নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক) রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামে। বিশাল সংখ্যক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক তদারকি, পরিদর্শন, ব্যবস্থাপনা কমিটিসহ স্বীকৃতি প্রদান-বাতিল ও নবায়নে দেখভাল করার দায়িত্ব বিদ্যালয় শাখার। কিন্তু বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে এ শাখায় মাত্র ৪ জন কর্মকর্তা ও ১১ জন কর্মচারি আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর মো. আবু তাহের। তিনি বিশাল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি ও সম্পাদনে জনবল অন্তত দ্বিগুণ করা দরকার বলে মনে করেন।
কলেজ শাখা :
শিক্ষাবোর্ডের অধীনে স্বীকৃতি প্রাপ্ত মোট ২৭০টি কলেজ রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামে। এসব কলেজের সার্বিক তদারকি, পরিদর্শন, ম্যানেজিং কমিটিসহ স্বীকৃতি প্রদান-বাতিল ও নবায়নে দেখভাল করার দায়িত্ব্ব বোর্ডের কলেজ শাখার। এছাড়াও একাদশ শ্রেণির অনলাইন ভর্তি কার্যক্রমের চাপটুকুও সামাল দিতে হয় এ শাখাকে। কিন্তু কলেজ পরিদর্শকসহ ৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন কলেজ শাখায়। আর কর্মচারি রয়েছেন ৭ জন। বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর গত ২২ বছরে কলেজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হলেও শাখায় জনবল না বাড়ায় কার্যক্রম সম্পাদনে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক। প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী দ্বিগুণ হওয়ায় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে জনবলও অন্তত দ্বিগুণ করা দরকার বলে দাবি করেন তিনি।
এর বাইরে সংস্থাপন শাখা ও হিসাব শাখা রয়েছে শিক্ষাবোর্ডে। অন্যান্য শাখার ন্যায় এ দুটি শাখায়ও বিরাজ করছে জনবল সংকট।
বোর্ড কর্তৃপক্ষ যা বলছে : জনবল সংকটে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম আজাদীকে বলেন, গত ২২ বছরে সবকিছুই বেড়েছে। স্কুল-কলেজ বেড়েছে। শিক্ষার্থী বেড়েছে। পরীক্ষার্থী বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগও বেড়েছে। অর্থাৎ শিক্ষাবোর্ডের সেবা গ্রহীতা বেড়ে কয়েকগুণ হয়েছে। সেবার পরিধিও বেড়েছে। কিন্তু যাদের মাধ্যমে সেবা প্রদান নিশ্চিত হবে, সেই জনবল কিন্তু বাড়েনি। এই জনবল সংকট বর্তমানে খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছি। বিদ্যমান অনুমোদিত পদের বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারির আরও ২৭০টি পদ সৃজনের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ইতিবাচক পদক্ষেপ নিবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে অনুমোদিত ১৫৫টি পদের মধ্যে ১ম শ্রেণির পদ সংখ্যা ২০টি। দ্বিতীয় শ্রেণির পদ রয়েছে ১২টি। আর ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদ সংখ্যা যথাক্রমে ৭৬ ও ৪৭টি। তবে শিক্ষাবোর্ডের প্রস্তাবনায় অতিরিক্ত ২৭০টি পদের মধ্যে নতুন করে আরো ৮টি প্রথম শ্রেণি, ১৫টি দ্বিতীয় শ্রেণি, তৃতীয় শ্রেণির ১৫৫টি এবং ৯২টি ৪র্থ শ্রেণির পদ সৃজনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত পদগুলো অনুমোদন পেলে জনবল সংকট আর থাকবে না এবং বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে মনে করেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম।

x