প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে

বুধবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
26

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা অগ্রগতিকে এখন গুরুত্ব না দিয়ে পারা যায় না। বলা যেতে পারে, আজ আমাদের দেশের অর্থনীতি যথেষ্ট মজবুত। দেশের যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার অধিকাংশই নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা অর্জন করেছি। এবার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য শিল্প-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ জরুরি। সরকারিভাবে ব্যবসায় উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২রা ডিসেম্বর জাতীয় রপ্তানি ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, দলমত নির্বিশেষে তাঁর দরজা ব্যবসায়ীদের জন্য সব সময় খোলা। তবে ব্যবসায়ীদের উচিত হবে দেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধিতে আরও তৎপর হওয়া। রপ্তানিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার অব্যাহতভাবে রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল এক হাজার ৫২ কোটি ডলার, ২০১৭-২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৬৬৭ কোটি ডলার। বাণিজ্য বিশ্বায়নের এ যুগে শিল্প তৎপরতার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ উপাদান হচ্ছে রপ্তানি বাণিজ্য। রপ্তানি বাণিজ্য আমাদের শিল্প-উদ্যোক্তাদের বিদেশি ক্রেতা ও বাজারের কাছে নিয়ে যায়। বিশ্ব বাজারে রপ্তানির অর্থ হলো মূল্যের দিক থেকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের মান এক টানা উন্নত থেকে উন্নতর করা। ক্রেতা, বিক্রেতা, পণ্যের মান ও মূল্য-এগুলোর মিথষ্কিয়ার ফলে শুধু রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান বাড়ে না বরং স্থানীয় বাজারের জন্য তৈরিকৃত পণ্যের মানও বাড়ে। এবং ঐসব পণ্যের মূল্যও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জিত হয়। রপ্তানি বাণিজ্য থেকে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অন্যান্য দেশ থেকে প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা পণ্য আমদানি ও বিনিয়োগের জন্য একান্ত প্রয়োজন। উন্নতমানের পণ্য উৎপাদিত হলে দেশে অনুরূপ পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়। এ ছাড়াও রপ্তানি শিল্পের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে অতীব প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা মোকাবেলায় তাই রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের কার্যক্রম বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়ন, শিল্পায়নের জন্য রপ্তানি বাণিজ্য, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য রপ্তানি বাণিজ্যের কোনো বিকল্প নেই। কেননা, কোনো দেশ শুধু নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করে কখনো শিল্পায়িত হতে পারবে না।
রপ্তানি খাতে গতিশীলতা আনা এবং রপ্তানি বাণিজ্যে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতা সক্ষম করার লক্ষ্যেই নতুন রপ্তানি নীতি ২০১৮-২১ প্রণয়ন করা হয়েছে। শিল্পায়ন ছাড়া কোনো জাতির অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব নয়। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এদিকে, আঙ্কটাডের পক্ষে দ্য লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজ রিপোর্ট ২০১৮ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ উপস্থাপনের সময় সিপিডি বলেছে, বাংলাদেশে ব্যবসায় নীতি-সহায়তা একরোখা। প্রভাবশালী বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বেশি নীতি-সুবিধা পায়। এই বিশেষ গোষ্ঠীকে যেসব সুযোগ দেওয়া হয়, তা কখনো মূল্যায়ন করা হয় না। তাছাড়া এদেশে সুশাসনের ঘাটতির কারণে ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স ও টিকাদারি পাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু বিশেষ শ্রেণির উদ্যোক্তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তারা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না।
এসব বক্তব্য সুবিবেচনায় এনে বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিবেশে আরো গতি আনতে হবে। সার্বিকভাবে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। ভবিষ্যতে যে উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি কেমন-তা দেখতে হবে। দেশে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি সৃষ্টি করতে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের উন্নয়ন রাষ্ট্র থেকে উদ্যোক্তা রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। এ জন্য প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো তৈরির বিকল্প নেই বলে অর্থনীতিবিদরা অভিমত প্রদান করেছেন। ই-কমার্স, ডিজিটাল অর্থনীতির মতো নতুন অর্থনীতির যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেই অনুযায়ী উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে।

x