প্রতিবিম্ব

সাজিয়া আফরিন

শুক্রবার , ২ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:০২ পূর্বাহ্ণ
69

শূন্য দৃষ্টিতে মীরা তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মহিলাটার দিকে, সেই দৃষ্টিতে কোন প্রশ্ন নেই, কারও প্রশ্নের উত্তর নেই,আছে কেবল হাহাকার। সামনে দাঁড়ানো মহিলা অনেক কিছু বলে যাচ্ছে, কেঁদে চলেছে অবিরত তবে মীরার কানে কিছু ঢুকছে না।তার চোখ মহিলার পাশে দাঁড়ানো পাঁচ বছরের বাচ্চাটার দিকে। হাতের ইশারায় মহিলাকে চুপ করতে বললো সে,সামনে বসার সিট দেখিয়ে বসতে বলে তাকালো পাশে দাঁড়ানো পিয়নের দিকে।
: কী ব্যাপার বদরুল? কী সমস্যা?
: ম্যাডাম, আপনি তো জানেন লাভলু হঠাৎ করেই মারা গেল। এখন ছোট বাচ্চা নিয়ে বিপদে পড়ে গেছে ওর বউ।
: আমার কাছে কী?
: আপনার কথা তো বড় স্যার শুনবেন, আপনি একটু যদি বলে দিতেন!
সরাসরি মহিলার দিকে তাকালো মীরা —
: নাম কী?
: ম্যাডাম আমি লুৎফা। আমি লাভলুর বউ, উনি যে হঠাৎ এমনে যাবে গা আমরা বুঝি নাই। উনি চাকরি করতেন,আবার টুকটাক ব্যবসাও ছিলো, তাই কখনো আমাগোরে কিছু ভাবতে হয় নাই। এখন আমি তো বুঝি না এইসব, আমি এই বাচ্চা লইয়া যামু কই!
: তো কী চান?
: আমি ওর চাকরিটা করতে চাই ম্যাডাম। আপনি যদি ব্যবস্থা কইরা দিতেন আর অফিস থেকে নাকি তার পরিবাররে নগদ টেকা দিবো, সেইটা যদি আমি পাইতাম, তাইলে মাইয়াডার ভবিষ্যতের জন্য ভালা হইতো।
: আমি দেখি কী করা যায়। আপনার নাম্বারটা দিয়ে যাবেন।
বদরুল, আমার ভীষণ মাথা ধরেছে। আমাকে পরে সব মনে করিয়ে দিও বিস্তারিত। ঠিক আছে??
বদরুল মীরার সাথে অনেক বছর কাজ করছে,তার কোন কথার কী অর্থ তা জলদি বুঝে যায়। চটজলদি সে লুৎফাকে বললো —
: ভাবী আসেন আসেন, ম্যাডাম পরে সব দেখবেন,এখন ওনার শরীরটা ভালো লাগছে না।
সত্যিই মীরার শরীরটা ভালো নেই। বেশ ক’দিন ধরে কাজের এতো চাপ ও নিতে পারছে না। সপ্তাহখানেক আগে অফিসে বসেই জানতে পারলো তাদের একজন অফিস পিয়ন লাভলু লিভারের রোগে মারা গিয়েছে। বউ আর ছোট একটা বাচ্চাও আছে। তখন থেকেই মনটা একটু অস্থির হয়ে ছিলো। আজ অফিসেই তার জন্য মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করেছে মীরা জানে। মৃত্যু বড় অমোঘ সত্য,তবে মীরা যতদূর সম্ভব এড়িয়ে যায় এর সাথে ঘটা করে করা যতো আয়োজন, এসবে তার অস্থিরতা বাড়ে। মানসিক সকল চাপ থেকে দূরে থাকার জন্যই মীরা সমস্ত এড়িয়ে চলে।
আজ যখন লুৎফা এসে ওর সামনে দাঁড়ালো সে রীতিমত থতমত খেয়ে গিয়েছিলো, মীরা জানে না একজন তরুণী সদ্য বিধবাকে কী বলে সান্ত্বনা দিতে হয়! কতো কাজ সে একা হাতে সামলায় এখন — কতো দায়িত্ব, কতশত কথা প্রতিদিন তার কাজের জন্য বলে যেতে হয়। কিন্তু সদ্য বিধবাকে দেওয়ার মতো কোন সান্ত্বনা বাক্য তার কাছে নেই, স্মৃতি হাতড়েও কোন বাক্য কিংবা ছোট একটি শব্দও খুঁজে পেলো না যা তাকে তিনবছর আগে সান্ত্বনা দিতে পেরেছিলো।বরং সে অন্যদের দৃষ্টিতে করুণা দেখেছে, কটাক্ষ দেখেছে,কোথাও সান্ত্বনা পায়নি। চোখেমুখে কেমন এক অদ্ভুত চাহনি দেখতো অন্যদের, “ইস্‌ এতো অল্প বয়সে বিধবা হলো,কোথায় যাবে, কী করবে! ইস্‌ ছোট বাচ্চা নিয়ে মনে হয় পানিতে পড়েছে। কী যে করবে!”
ইস ইস, মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক চুক চুক শব্দ বের হতো। এক দল মহিলা একসাথে আসতো মীরাকে দেখতে,এসে ভীষণ গম্ভীর মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো তো থাকতোই। শরবত খেত, চা, বিস্কিট যা দেওয়া হতো তাই বেশ গম্ভীরভাবে খেতে থাকতো আর মীরার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গল্প শুনতে চাইতো– তার বিধবা হওয়ার গল্প। কারো মাথায় একবারের জন্যও আসতো না এ মেয়েটা কী চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে, তার দরকার একাকী কিছু সময় নিজের মতো কাটানো। তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বিধবা হওয়ার কাহিনী বের করার কোন কারণ নেই, কষ্টটা কমাতে না পারুক, বাড়িয়ে দেওয়ার তো কোনই অর্থ নেই। কে বুঝাবে এসব বুদ্ধিহীন মহিলাদের! মীরা কেন চিৎকার করে কাঁদছে না,কেন নাকে তখনও নাকফুল পরে আছে,গায়ে কেন সাদা কাপড় জড়ায়নি তা নিয়েও কতো ফিসফাস! যতোই সে খবর পাঠাতো শরীর খারাপ,দেখা করতে পারবে না কারো সাথে,তখনও তারা পিছু হটবার মানুষ ছিলো না,সোজা এসে শোওয়ার ঘরে ঢুকে গপ্পো জুড়ে দিতো। মীরার এই দুর্বিষহ সময়টাকে আরো দুর্বিষহ করে তুলতে না পারলে, তাকে না দেখে গেলে যেন স্বর্গ হাত ফসকে যাবে এমন অবস্থা! এদের মধ্যে কেউ একজন তো মীরার খুব কাছে ঘেঁষে বলেই ফেলেছিলো
: আসো মা, তোমার নাকফুলটা খুলে দেই।
অবাক বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিলো মীরা ঐ মহিলার দিকে। নাকফুল, চুড়ি বিধবাদের জন্য নয় এসব তথ্য তাদের কে দিয়েছে! ধর্মগ্রন্থের কোথায় বিধবাদের পরিধেয় নিয়ে লেখা আছে আলাদা করে তা জিগ্যেস করার বড্ড ইচ্ছে জাগছিলো মীরার তখন। বিধবারা যেন আলাদা এক জাত, তারা পুরোপুরি মানুষ না, এরচেয়ে কিছু কম।
সদ্য বিধবা তরুণী অনেকটা চিড়িয়াখানায় রাখা বিরল প্রজাতির কোন পশুর মতো, যাকে দেখতে আসতে হয়,বড় চমকপ্রদ ব্যাপার যেন একটা!
এবং একটা জটিল প্রশ্ন সকলের জানার চরম আগ্রহ থাকে, যখনই বিধবা দেখতে যায় তখন — এখন সে কোথায় থাকবে! বাপের বাড়ি না শ্বশুর বাড়ি? আর শ্বশুরবাড়ি থাকলে তার কোন কাছাকাছি বয়সের দেবর কী আছে যে তাকে এবং তার সন্তানকে আশ্রয় দিতে পারে! কেউ কখনো এটা ভাবতেই পারে না দেবর মানে ভাইও হতে পারে। কেউ ভাবতেই পারে না একা একজন নারী দারুণভাবে জীবন কাটাতে পারে,কোন পুরুষের সাহায্য ছাড়াই।
বাপের বাড়ি গেলে যদি আরেকটা বিয়ে হয়ে যায় তখন আগের ঘরের বাচ্চাটা কার সাথে থাকবে! দাদার বাড়ি? নাকি নানার বাড়ি? এসব অদ্ভুত, ভিত্তিহীন এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্নের বোঝা কতগুলো কপর্দকশূন্য মহিলারা মাথায় করে ঘুরে বেড়ায় এবং জায়গা কিংবা অবস্থা কিচ্ছু না বুঝে অন্যকে কষ্ট দিয়ে করেও ফেলে।
এখনও মীরার স্মৃতিতে দগদগে ঘায়ের মতো হয়ে আছে — বৈধব্যের তখন মাত্র তিনদিন, মামী গোত্রীয় একজন এলেন, খুব তার মায়া, ভীষণ কষ্ট যেন পাচ্ছেন মনে। মীরাকে জড়িয়ে ধরে কয়েক দফা কাঁদলেন!! এরপর শরবত বিস্কিট খেয়ে গলা নামিয়ে মীরাকে জিগ্যেস করলো “তোমার জামাই মরার আগে কিছু বলে গেছে?”
ততোদিনে মীরা শিখে গিয়েছে চুপ করে থাকা, ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকা। কোন কথার উত্তর দিতেই মন চাইতো না তার, সে কেবল চেয়ে চেয়ে কিছু মানুষরূপী অদ্ভুত প্রাণী দেখতো, যাদের বুদ্ধি বিবেচনা খুব নিম্ন পর্যায়ের।
“না মানে ইয়ে তোমার বয়স তো কম, সে মরার আগে তোমাকে আবার বিয়ে টিয়ে বসার কথা বলে যায়নি?”
এতো উজবুক মানুষ কিভাবে হয় তা ভেবে মীরা আরও অবাক। মানুষ বাস্তবজীবনকে কিভাবে সিনেমা বানিয়ে ফেলে, সিনেমার সাথে মিলিয়ে ফেলে! অবাক ব্যাপার, মানুষ আসলে কী আশা করে? কেউ মারা যাবে,সাথে সাথে তার আশেপাশের লোকজন হিন্দি সিরিয়ালের মতো সাদা স্টাইলিশ ড্রেস পরে ঘুরতে থাকবে,কারো স্বামী মারা গেলে কষ্ট দুঃখ পরে পাবে, আগে বউ এর রঙ্গিন শাড়ি খুলে সাদা শাড়ি পরাটা দায়িত্ব।নাকফুল, চুড়ি সব কাঁদতে কাঁদতে খুলবে,অসহায় মুখ করে চিৎকার করে করে কাঁদতে থাকবে। যে গিয়েছে তার সাথে এই মহিলাও তার সমস্ত ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে দিবেন এমন এক ভাব। আর মারা যাওয়ার আগে অবশ্যই দেবদাসের মতো নায়িকার কোলে মাথা রেখে তার পরবর্তী জীবনের সুখ কামনা করে যাবে।বাহ্‌ দারুণ তো!! ঐ যে এককালে সতীদাহের যে প্রথা ছিলো, তারই আধুনিক রূপ আর কী! — মীরা মনে মনে ভাবে আর হাসে।
মীরার হঠাৎ শরীরটা খুব খারাপ লাগছিলো, সে উঠে রেস্ট রুমে গেল।বের হওয়ার সময় বদরুলকে বললো লুৎফাকে তিনদিন পর আসতে বলতে।বদরুল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
অনেক অনেক স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আজ মীরা,বোবা কান্নাগুলো তার চোখ থেকে জল হয়েও গড়িয়ে আর পড়ে না এখন। তবে মাথার ভেতর সারাক্ষণ ঘুণপোকার মতো তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। চোখমুখে পানি দিয়ে এলো সে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবে। হঠাৎ মোবাইল স্ক্রিনে প্রিয়মুখটা, মুখে লম্বা হাসি টেনে ভিডিও কলটা ধরলো জলদি জলদি।
— মামণি, তুমি বড় দুষ্টু হয়েছ। সকালে টিফিন আজও করোনি। আমি স্কুল থেকে ফিরে শুনলাম কিচ্ছু না খেয়ে বের হয়েছ। কেন? বলো?
রীতিমত জেরার মুখে মীরা, কী উত্তর দিবে তার ছয় বছর বয়সী মায়ের চেয়েও কড়া এই ছোট্ট মা’টাকে জলদি ভাবতে লাগলো
— মামণি তাড়াহুড়োতে ছিলাম বাচ্চা। ইমারজেন্সি রোগী ছিলো হাসপাতালে, খুব জলদি জলদি আসতে হলো।
— নো। এটা ঠিক না মামণি। তুমি একদম নিজের যত্ন নাও না, তবে কিভাবে আমারটা নিবে,কিভাবে দাদুমণিরটা নিবে? আর ধরো আমরা নিজেরাই আমাদের ম্যানেজ করবো কিন্তু বল এমন হলে কিভাবে তুমি রোগীদের যত্নটা নিবে? তুমি দুষ্টু হয়ে যাচ্ছ মা। দাদুমণিও তাই বলে।
— হু,তা আমি জানি। তুমি আর তোমার দাদু সারাক্ষণ এমনটাই ভাবো আমাকে নিয়ে,আমি তো বেশি পচা।
— একদম ইমোশনাল কথা বলবে না, আমি না খেয়ে এত সময় থাকলে তোমার ভালো লাগবে? তোমার যেমন কষ্ট হয় আমার জন্য,দাদুরও হয় তোমার জন্য। বুঝেছ?
— জি মা, বুঝেছি। সরি। আর করবো না।
— তোমার শরীর কি মা বেশি খারাপ? কোন কিছু সমস্যা?
— না তো মামণি, কেন বল তো!!
— মুখ চোখ কেমন যেন কষ্ট কষ্ট লাগছে। তুমি কিছু খেয়ে নাও আর জলদি ঘরে ফিরবে আজ। ওকে?
— জি মা,ওকে। বাই মামণি।
এই তো তার প্রজাপতি জীবন,মীরার এই জীবনে হাজারো রঙ ছড়ায় তার গায়ে লেগে থাকা, জীবন জুড়ে উড়তে থাকা প্রজাপতি, তার মেয়ে টায়রা। তিতলীর মতোই উড়ে বেড়ায় সে মীরার বাগানে, সকল কষ্ট সে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে এই মুখটা যখন চোখের সামনে থাকে। নিজের মনেই একটু হাসলো মীরা, নিজেকে এখন সে বড্ড ভালোবাসে। কী ভীষণ সাহসের সাথে সে ঐ সময়টা পার করেছে,কারো কাছে সাহায্যের জন্য যায়নি,কারো সাহায্যের প্রয়োজনও বোধ করেনি।সমাজের এক শ্রেণির লোক যখন অত্যন্ত মায়া দেখিয়ে পাশে এসে দাঁড়াতো, মীরা দারুণভাবে তাদের নিজের জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছে।একমাত্র যোগ্যতা আর আত্মসম্মান ছাড়া কোন অবলম্বন তার কখনোই ছিলো না আর এ দু’টো নিয়েই সে আজ “মীরা”।
লুৎফাকে দেখে কিছুটা সময়ের জন্য সে থমকে গিয়েছিলো, চেয়ারের ওপাশে সে নিজেকেই যেন দেখছিল, অসহায় অবলম্বনহীন একজন সদ্য বিধবা,সমাজ তাকে সবসময় যেমন দেখতে চেয়েছে কিন্তু না,মীরা কখনো অবলম্বনহীন হয়ে থাকেনি,অসহায়ত্ব দেখিয়ে কারো কাছে সাহায্যও চায়নি, যা এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য যথেষ্টই হতাশার ব্যাপার। পুরুষতন্ত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দারুণ এক সফল পথচলা সে তৈরি করেছে। এই পথচলায় তার সঙ্গী ছিলো তার এই ছোট্ট টায়রা আর তার নিজের স্বত্তা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ, যে মানুষটা সব সময় তার উপর নিখাদ ভরসা করেছে,তার শাশুড়ি — পুরুষতন্ত্রকে যিনি পায়ে মাড়িয়েছেন নির্দ্বিধায়, শক্তভাবে যিনি মীরার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, শাশুড়ি হয়ে না, দাঁড়িয়েছিলেন কখনো তার মা হয়ে, কখনো মেয়ে, আবার কখনো সই হয়ে।
যার কাছে গিয়ে মীরা যখন বলেছিলো
— মা আমি কার বাড়িতে থাকি? বাপের বাড়ি না শ্বশুরবাড়ি? সবাই জানতে চায়,কী বলবো?
দু’দিন পর তিনি সন্ধ্যায় নামায পড়ে এসে মীরার বিছানায় ওর পাশে বসে বললেন
— চলো একটা নতুন বাসা ভাড়া নেই, যেটা তোমার হবে। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে থাকবে, আমাদের নিয়ে, চলো।
পোশাকেআশাকে কতো আধুনিক মানুষ সে দেখেছে, কিন্তু ভাবনার আধুনিকতায় এই মহিলাকে পেছনে ফেলবে কে! চিরচারিত ভাবনার এ সমাজে তারা তিনজন বড্ড ভালো আছে নিজেদের তৈরি করা জগতে।
শুয়ে শুয়ে আবোল তাবোল অনেককিছু ভাবছিলো মীরা। মনজুরের কথাও অগোছালো ভাবে ভাবনায় আসতে লাগলো, হঠাৎ করেই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা অনর্থক সময়ে মোড় নিলো, লাল বেগুনী রঙে মেতে থাকা জীবনটা কিভাবে ধূসর হয়ে গেল! একটা ফোন এলো মোবাইলে আর চারিদিকটা ছারখার হয়ে গেলো।
— ভাবী, ভাবী মনজুরের গাড়ি এঙিডেন্ট করেছে নতুন ব্রিজের কাছে।আপনারা জলদি মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে আসেন।
রাকিবের ফোন পেয়ে কিভাবে কেমন করে মীরা পৌঁছালো মেডিকেলে তার মনে নেই। কেবল মনে আছে মনজুরের সেই রক্তমাখা নাক, মাথা, কেটে যাওয়া গাল। সে ছুঁয়ে দেখলো মনজুরের হাত, সেই মায়াময় হাত কেমন নিথর! ব্রিজের ওপাড়ে সপ্তাহে তিনদিন চেম্বার করতো মনজুর,সবসময়ই এতে আপত্তি ছিলো মীরার, কিন্তু রোগীদের কাছে বেশ পরিচিতি থাকায় সেই চেম্বারটা ছাড়তে পারছিলো না ও। আজ লোকাল গাড়ি আর ট্রাক মুখোমুখি, মনজুর প্রচণ্ডভাবে আহত। ডাক্তার হয়ে না বুঝার কিছু ছিলো না মনজুরকে দেখে সেই দেহে প্রাণ আর খুব বেশি সময়ের জন্য থাকবে না, কিন্তু এরপরও মানুষ তো বাঁচে আশায়। সেই আশাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিভতে দেয়নি মীরা। মনজুরকে দ্রুত ভেন্টিলেশনে নেওয়া হলো, কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার সকল আধুনিক ব্যবস্থাই নেওয়া হলো কিন্তু যন্ত্রপাতি ছাড়া সে যে পারবে না অল্প সময়ও টিকে থাকতে তাও বুঝতে ডাক্তারদের সময় বেশি লাগেনি। মীরা হাসপাতালের বারান্দায় মাঝ রাত্তিরে দাঁড়িয়েছিল,একদম একা। সে বারান্দা থেকে আকাশ দেখা যায়,এত্ত বড় এক আকাশ, এত্ত বড় একটা পৃথিবী, পুরো এক পৃথিবীজুড়ে তার আপন,একান্ত নিজস্ব বলতে যা তা হলো মনজুর, এর বাইরে আর তো কেউ নেই। মনজুরকে যে ফিরে আসতেই হবে কেবল মীরার জন্য,এমন একা করে দিয়ে মনজুর কক্ষণো তাকে ছেড়ে যাবে না।যেদিন মীরা মনজুরকে পছন্দ করে বাবা মায়ের অসম্মতিতে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেই থেকেই তো তার এক পুরো পৃথিবীটা মনজুর হয়ে ছিলো। আজ কেমন বড্ড অদ্ভুত লাগছে, এক মনজুরকে চিনতে চিনতে জগতের কিছুই চেনা হলো না। ওকে ছাড়া একদিনও তো কাটাতে হয়নি আট বছরে, এমন কি টায়রা হওয়ার পরও মনজুরের প্রতি ভালোবাসা কিংবা মায়ার কোন হেরফের কক্ষণো হয়নি। সবাই খুব হাসতো ওদের দুজনকে নিয়ে, বিয়ের এতোবছর পরও, এমনকি বাচ্চা কোলে আসার পরও এত্ত প্রেম!!
ঠাণ্ডা লাগছিলো মীরার, বারান্দার এক কোণে চুপসে গেল সে শীতে।
ভাবনাগুলো বড় বেহায়া, না চাইলেও কড়া নেড়ে দিয়ে যায় ভুলভাল দরজায়।নিচে অফিসে চলে যাবে, এখানে একা থাকলে এসব কথাই মনে পড়বে। কাজের মাঝে থাকলেই ভালো। বিছানা থেকে উঠে চোখ মুছে মুখ ধুয়ে নিচে চলে গেল মীরা,আজ জলদি বাসায় ফিরতে হবে, রোগী দেখা শেষ করে অফিসিয়াল মিটিং কয়েকটা শেষ করেই রওয়ানা দিবে, টায়রার সাথে আজ বেড়াতে যেতে হবে। যতোই কাজের মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রাখুক, মাথা থেকে লুৎফা আর ওর বাচ্চা মেয়েটার চেহারা যাচ্ছে না। আহারে, লুৎফা মেয়েটাকে কতো কী সহ্য করতে হবে,একা মেয়ের এ সমাজে টিকে থাকা ভয়াবহ কষ্টের।গত তিন বছরে সে খুব কঠিন সত্য জেনেছে একজন মহিলার জন্য সবচাইতে অমানবিক গালি হলো “বিধবা”।বিধবা একটা অদ্ভুত শব্দ; যাকে এ সমাজ একটা তামাশা হিসেবে দেখে, গালি হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষ ভুলে যায় সধবা আর বিধবা হওয়ার আগে সে নারীর আলাদা একটা পরিচয় আছে, সে তার নিজস্ব একজন,সে মানুষ,তার যোগ্যতা দিয়ে তাকে পরিমাপ করা যায়,নাকি তার বৈবাহিক অবস্থা দিয়ে!
লুৎফা চাকরি শুরু করার পর থেকে বড় যন্ত্রণা করে, প্রায় শুক্রবারেই সে হাতে বানানো নাস্তা নিয়ে সেই ভোরে হাজির হয়। টায়রার দাদুমণির সাথে তার ভীষণ ভাব, বাসায় এসেই সে দারুণভাবে এ বাসারই মানুষ হয়ে যায়, কাজকর্ম করতে থাকে, ঘরদোর পরিষ্কার করতে থাকে। সেই একটা দিন মীরা একটু দেরিতে বিছানা ছাড়ে,সে হাই তুলতে তুলতে বাইরের রুমে এসেই লুৎফাকে দেখে, বকাও দেয় —
: এই মেয়ে এই একটা দিন রেস্ট করতে পারো না? গুটুর গুটুর করো কেন সারাদিন?
টায়রার দাদু হাসতে হাসতে বলে —
: আমিও তো বলি ওকে রেস্ট করতে, কিন্তু ও দুনিয়ার কাজ বের করে করতে থাকে।
: খালাম্মা আপনাগোরে দেখলেই রেস পাই আমি।
লুৎফার সোজাসাপটা জবাব। এরপর আর বলার কিছু থাকে না।
মাস দুয়েক হয় চাকরি করছে লুৎফা। আজ সে মীরার জন্য একটা উপহার নিয়ে আসছে, দিতে লজ্জা লাগছে কিন্তু সে অবশ্যই দিবে।তার নিজের বেতনের টাকা দিয়ে কেনা। গত দু’মাস ধরে মাইশার খরচ মীরাই চালায়, নিজের মেয়ের থেকে কোন অংশে কম কিছুতে করে না। এই মীরা ম্যাডামরে তার খুব আপন আপন লাগে এখন, রাগী অনেক বাইরে থেকে দেখা যায়, কিন্তু মনটা খুব ভালো। আপা ডাকতে মন চাইতো তার, এখন ঘরে মীরাকে আপাই ডাকে। ম্যাডাম নিজেই বলছে “ঘরে আমাকে ম্যাডাম ম্যাডাম করবা না তো লুৎফা,আপা ডেকো।” ধমক দিয়ে কথা বলা মীরা আপার একটা আজব স্বভাব কিন্তু মন ভর্তি তার মায়া।
ছুটির দিন বিকেলে আজ তেমন কাজ না থাকায় ছাদের বাগানে চা নিয়ে বসেছিলো মীরা, একটু দূরে মাইশা আর টায়রা খেলছে। লুৎফাকে দেখে মীরা এখন স্বস্তি পায়, ওর চোখে মুখে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক দেখা যায়,দেখতে ভালো লাগে।
: লুৎফা, কেমন লাগছে নতুন চাকরি? তুমি করতে পারছো? গ্রাম থেকে শহরে এসে থাকতে সমস্যা হচ্ছে না? বাচ্চাটাও তো ছোট, সব তাল সামলাতে পারছো?
: আমি পারতেছি করতে চাকরি। আপনি তো আরও বেশি কষ্ট করতে পারতেছেন, আমি কেন পারুম না আপা?
: পারবে না কেন? অবশ্যই পারবে,তবে কী জানো যতোটা ভাবছ সহজ ততোটা না কিন্তু। তোমাকে একটা কথা বলি লুৎফা,এ সমাজ যে কতো নোংরা! এই যে এখন যারা তোমাকে সাহায্য করতে উঠে পড়ে লেগেছে, এতকিছুর আড়ালে কতো যে নোংরা চেহারা আছে, তাদের নোংরা ভাবনা আছে তা কিন্তু অল্পদিনেই টের পাবা। প্রতিটা কদম খুব সাবধানে ফেলতে হবে।
তবে তোমার বয়স কম, বুদ্ধি দেওয়ার লোকের কিন্তু অভাব হবে না। বলবে তোমাকে জীবন নতুনভাবে শুরু করতে, স্বপ্নও দেখাবে। তুমি তোমার মতো করে চিন্তা করবে, নতুন জীবন শুরুর জন্য পুরুষ লাগে না পাশে লুৎফা।
: ম্যাডাম, আগে তো পুরুষমানুষ আছিলো পাশে, কিন্তু তা তো নতুন কোনমতেই আছিলো না। প্রায় সপ্তাহে বাড়িত যাইতো, রাইতে তার ইচ্ছা মিটাইতো,আবার তার মায় আমার নামে কথা লাগাইলে আগপিছ না ভাইব্যা মাইরও দিতো। নতুন জীবন তো আমার শুরু হইয়া গেছে আপা, তা আপনার হাত ধইরাই।
: নতুন জীবন অবশ্যই শুরু হয়েছে তোমার,সাথে মাইশারও। কিন্তু তা আমার হাত ধরে না। কেউ কাউকে হাত ধরিয়ে কিছু করাতে পারে না। তোমার সাহস না থাকলে কিচ্ছু হতো না।
আর তুমি মাইশার মা হয়ে ওকে আদর যত্ন দাও। আমি যেমন টায়রার বাবা, তেমন মাইশারও বাবা হয়েই থাকবো। ওদের কোন কষ্ট ছুঁতে যেন না পারে তা আমি একদম খেয়াল রাখবো। তুমি সাহস আর বিশ্বাস রাখবা শুধু, হেরে যেও না।
: না আপা, বিশ্বাস আছে। অখন আমি জানি আমি কী করতে পারি! আমার সাহস কদ্দূর অখন জানছি আপা।
মীরা হেসে ফেললো, প্রশান্তির হাসি। এই তো মীরা লুৎফার ভেতর আলো দেখতে পাচ্ছে, রঙধনু দেখতে পাচ্ছে আর এটাই তো সে চেয়েছিলো। সামাজিক অবস্থান থেকে শ্রেণিবিভেদ থাকলেও মীরা তো জানে কোথায় তার সাথে লুৎফার মিল! লুৎফার জিতে যাওয়া মানে কেন মীরারও জিতে যাওয়া! কোথায় তারা দু’জন একই সুতোয় বাঁধা! সাহস আর উদ্যোমের মাঝে আলো বিরাজ করে, আলোর এই ঝরণাধারা অবিরত থাকুক, ছড়িয়ে যাক দিগ্বিদিক।

x