প্রতিবার বাড়ে আকার বাস্তবায়ন হয় কম

চসিকের বাজেট

মোরশেদ তালুকদার

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
60

বিদায়ী অর্থ বছরে (২০১৭২০১৮) প্রস্তাবিত বাজেটের মাত্র ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। শুধু বিদায়ী অর্থ বছরে নয়, এর পূর্বের অর্থ বছরগুলোতেও বাজেট বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক। তবু চলতি অর্থ বছরে (২০১৮২০১৯) বাজেটের আকার বাড়িয়েছে সংস্থাটি। গত অর্থ বছরের চেয়ে এবার বাজেটের আকার বেড়েছে ৯৭ কোটি ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

গতকাল চলতি বছরের জন্য ২ হাজার ৪শ ২৫ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন মেয়র। এ বাজেট ছিল সিটি মেয়রের মেয়াদকালের চতুর্থ বাজেট। এর আগে গত ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তিনি ২০১৫২০১৬ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। যার মাত্র ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি নিজ মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণা করেছিলেন ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর। যার মাত্র ২৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। তৃতীয় বাজেট ঘোষণা করেন ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই। সেটিও বাস্তবায়ন হয় নি। এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসী আকার বৃদ্ধির চেয়েও বাজেট বাস্তবায়নে অধিক জোর দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।

প্রতিবার বাজেটের আকার বাড়ে। বাস্তবায়ন হয় না। তাই এবারের বাজেটও বাস্তবায়ন হবে কী না সেটা নিয়েও আছে সংশয়। অবশ্য বাজেট বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি মনে করেন, ‘বাজেটে প্রকল্প ভিত্তিক বরাদ্দ আছে। নির্বাচনী বছর হওয়ায় অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনাও আছে। এছড়া নিজস্ব অর্থ প্রাপ্তির খাতগুলো নিয়ে আশাবাদী তিনি। নিজস্ব অর্থ প্রাপ্তির প্রধান খাত তিন ধরনের কর আদায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরাও যোগাযোগ করেছি। আর ব্যক্তিগত খাতের বকেয়া কর আদায়ে আমি উদ্যোগ নিয়ে ফলও পেয়েছি। আশাকরি কর আদায় বাড়বে।’

প্রকল্পে মনোযোগ বাজেটের উল্লেখযোগ্য দিক:

এবারের বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে প্রকল্প ভিত্তিক বরাদ্দ রাখা। অতীতে প্রকল্পের চেয়েও ‘থোক’ খাতে বরাদ্দ প্রত্যাশা করে বাজেট প্রণয়ন করা হতো। এবার সেখান থেকে সরে আসেন মেয়র। মনোযোগ দেন প্রকল্পের ভিত্তিতে উন্নয়ন করা। সাথে থোক বরাদ্দও আছে। বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার আয় প্রত্যাশা সংস্থাটির।

প্রকল্পের মধ্যে ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তাসমূহের উন্নয়ন এবং নালা, প্রতিরোধ দেয়াল, ব্রিজ, কালভার্ট এর নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের বিপরীতে ২৫০ কোটি টাকা, বিএমডিএফ এর অর্থায়নে ফইল্যাতলী, ফিরিঙ্গিবাজার ও বঙিরহাট কাঁচাবাজার এবং দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ড অফিসের খালি জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণে ৫০ কোটি টাকা, জাইকা প্রস্তাবিত প্রকল্পে ২০০ কোটি টাকা, সিটি গভর্নেন্স প্রজেক্টে ৩০ কোটি টাকা, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের বিপরীতে ১০৫ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা আলোকায়ন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ শীর্ষক প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং বাস ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে ২০০ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন নিবাস নির্মাণ প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ব্রিজসমূহের উন্নয়নসহ আধুনিক যানযন্ত্রপাতি ও সড়ক আলোকয়ন প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা, নগর ভবন নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা, বহাদ্দারহাট থেকে বারৈপাড়া পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা এবং অন্যান্যে প্রকল্পের বিপরীতে আরো ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।

তবু সংশয় :

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গত আট অর্থ বছরের বাজেট বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০১১২০১২ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছিল। একইভাবে ২০১২২০১৩ অর্থ বছরে ৪৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, ২০১৩২০১৪ অর্থ বছরে ৪৫ শতাংশ, ২০১৪২০১৫ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০১৫২০১৬ অর্থ বছরে পূরণ হয়েছে ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১১২০১২ অর্থ বছরে প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৯১৫ কোটি ১৫ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা। যা সংশোধিত বাজেটে অনুমোদন হয়েছিল ৩৬০ কোটি ২৩ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকায়। ২০১১২০১২ অর্থ বছরে নগর উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ৪৪৬ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা। কিন্তু এ খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১০৯ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা।

২০১২২০১৩ অর্থ বছরে ৯৬০ কোটি ৫২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধিত বাজেট হিসেবে মাত্র ৪২৫ কোটি ৫২ লক্ষ ২ হাজার টাকায় অনুমোদন পায়। ২০১৩২০১৪ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ১১শ ৬ কোটি ৩০ লক্ষ হাজার টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়িত হয়েছিল ৪৯৮ কোটি ৩৫ লক্ষ হাজার টাকা। ২০১৪২০১৫ অর্থ বছরে পূর্বের বছরের চেয়েও ৮৯ কোটি ২১ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা বেশি রেখে ঘোষণা করা হয়েছিল ১ হাজার ১শ ৯৫ কোটি ৯১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বাজেট। অথচ অর্থ বছর শেষে বাস্তবায়ন হয়েছিল মাত্র ৪ শ ৩২ কোটি ১৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। তবু ২০১৫২০১৬ অর্থ বছরে ২০১৪২০১৫ অর্থ বছরের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৪৩৬ কোটি ৮৬ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা বেশি রাখা হয়েছিল। ২০১৫২০১৬ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ১৬শ ৩২ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৫৯২ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা। ২০১৬২০১৭ অর্থ বছরে ২ হাজার ২শ ২৫ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল। অথচ বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৬শ ৬২ কোটি ৬৬ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা। ২০১৭২০১৮ অর্থ বছরের বাজেটের আকার ছিল ২ হাজার ৩২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে বাস্তবায়িত হয়েছে ৮৮৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। গত ৮ অর্থ বছরের বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবারের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় থেকে যাচ্ছে।

নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে :

প্রতি বছরই খরচ বাড়ছে চসিকের। তার বিপরীতে নিজস্ব অর্থ প্রাপ্তির অবস্থা হতাশাব্যাঞ্জক। গত কয়েকটি অর্থ বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২০১৭২০১৮ অর্থ বছরে সংস্থাটির নিজস্ব খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪৩ কোটি ৯৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এবার এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ৫৪২ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৬২০১৭ অর্থ বছরে নগর উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয় ২৫৭ কোটি ৬৪ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা। অথচ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় হয় ৩০৬ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে বেতন ভাতা ও পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হয় ২১৫ কোটি ৭১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। যদিও ২০১৬২০১৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নগর উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ১১শ ২১ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। একইভাবে ২০১৫২০১৬ অর্থ বছরেও পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সর্বোচ্চ ২৯৪ কোটি ২৫ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। অথচ নগর উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়েছিল ১৭৩ কোটি ৯১ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা।

x