প্রতিবন্ধীদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে

সোমবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
25

আজ আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- সাম্য ও অভিন্ন যাত্রায় প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধিতার শিকার। আর বাংলাদেশের ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রতিবন্ধী। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বৈষম্য, দয়া-দাক্ষিণ্য, করুণা ও অনুকম্পার ওপর ভর করে জীবন নির্বাহ করে। তবে আমাদের দেশে ২০০৭ সাল থেকে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ (সিআরপিডি) গৃহীত হওয়ার পর রাষ্ট্র ও সমাজে এ সম্পর্কে ধারণার ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। ওই সনদের আলোকে ২০১৩ সালের ১৬ জুলাই জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই বিলটি ৩ অক্টোবর পাস হয়। আর প্রতিবন্ধীদের কর্মদক্ষ করে তুলতে ও পুনর্বাসনে নানা প্রকল্প নেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অটিস্টিক এবং প্রতিবন্ধীরা সমাজের মূল স্রোতে মিশে যেন সুস্থভাবে বাঁচতে পারে সে লক্ষ্যেই কাজ করছে সরকার। প্রতিবন্ধীদের প্রতি দায়িত্ব যেমন তাদের অভিভাবকদের রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রেরও রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদানের জন্য প্রতিটি উপজেলায় ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র’ চালু করা- সেই উদ্যোগেরই একটি। অটিস্টিকসহ সমাজের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এ মর্যাদা ভোগের সমান অধিকার রাখেন। অটিজম কোনো ব্যাধি নয়, এটা জন্মগত একটি অসুবিধা। প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের সেবা প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় ৭৩টি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার বা ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র’ চালু রয়েছে। এ সব কেন্দ্রের সঙ্গে একটি করে অটিজম কর্ণারও চালু করা হয়েছে। এ কার্যক্রম উপজেলা পর্যন্ত সমপ্রসারিত করা হবে। প্রতিবন্ধিতা মানববৈচিত্র্যের একটি অংশ। তাদের প্রতি অবজ্ঞা করার সময় শেষ হয়েছে। তাদের অধিকার এবং মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রতিটি মানুষেরই জন্মগতভাবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাই তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন, ২০১৩ নামে দুটি আইন পাস হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। এ ফাউন্ডেশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ ফাউন্ডেশনকে ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন অধিদফতর’-এ রূপান্তর করা হয়েছে। এই কার্যক্রম উপজেলা পর্যন্ত সমপ্রসারণ করা হবে। প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে একটি করে প্রতিবন্ধী কর্মজীবী পুরুষ ও মহিলা হোস্টেল, অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও অটিস্টিক স্কুল চালু করা হয়েছে। ফাউন্ডেশন থেকে ইশারা ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া অটিস্টিক শিশুর মায়েদের জন্য প্রাত্যহিক লালন-পালনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শ্রবণ, বুদ্ধি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়কে মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য আবাসিক সুবিধা রাখা হয়েছে। দেশের ৫৫টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের মাধ্যমে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কোন সঠিক পরিসংখ্যান ছিল না। এ জন্য ২০১৩ সাল থেকে সরকার সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বিশেষ সুবিধা হিসেবে তাদের কিছু ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করা হয়েছে।
তবু বলবো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে। অনেক পরিবারে তাদের দেখা হচ্ছে বোঝা হিসেবে। বোঝা হিসেবে না দেখে প্রতিবন্ধীদের জনসম্পদে রূপ দিতে হবে। আর সকল ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। সাম্য ও অভিন্ন যাত্রায় প্রতিবন্ধী মানুষকে সমানভাবে মর্যাদার আসনে উন্নীত করতে হবে।

x