প্রতিদিন বসে হাস্য-রসের আড্ডা

মুন্সেফ আদালত পাড়ার হাসানের হোটেল

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ৬ মে, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
700

রাউজানের সত্তরোর্ধ বয়সী মৌলভী নুরুল হাসান। সহজ সরল নিরলস ক্লান্তিহীন একজন মানুষ। তিনি রাউজান উপজেলা মুন্সেফ আদালতের সামনে ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘরে বসে বিক্রি করেন চা, নাস্তা আর দুপুরের ভাত। তার দোকানে খাবার মেন্যুতে প্রতিদিন থাকে চা বিস্কুট, চনামুড়ি হালুয়া। ভাতের সাথে মাছ, ডাল, সবজি, ডিম আর মুরগির মাংস। আদালতের মালিকানায় থাকা ভূমিতে নুরুল হাসান এই দোকানটি করছেন প্রায় দুই দশক ধরে। আদালতকে দিতে হয় সামান্য কিছু ভাড়া। স্থানীয়দের কাছে এটি আদালত ক্যান্টিন। তবে দোকানির দেয়া নাম হাসান হোটেল। সকালে ভাত তরকারি ও হালুয়া, চনা তৈরি করে নিয়ে আসেন আদালতের অদূরে থাকা নিজ বাড়ি থেকে। সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে তার এই দোকানটি। এই দোকানে যারা খেতে আসেন তাদের বেশিরভাগ আদালত সংশ্লিষ্ট লোকজন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঘরের রান্না করা খাবার পাওয়ায় আদালতের সকলেই এই দোকানে খাবার খেয়ে থাকেন। এছাড়া খেতে আসা প্রায় লোকজন দোকানে বসে সময় কাটান দোকানিকে নিয়ে হাস্যরসে। খেতে আসা লোকজনরা কোনো না কোনো ইস্যুতে খুঁত খুঁজে বের করে আক্রমণাত্মক কথা বলেন দোকানি নুরুল হাসানকে রাগাতে। বৃদ্ধ এই দোকানি কখনো হাসিমুখে আবার কখনো রাগতস্বরে তাদের এসব কথার জবাব দেন। বেশি উত্যক্ত করার চেষ্টা করা হলে হাত জোড় করে বলেন “অ-বাজি অল, আঁর ভুল হই গেঁইয়ি তোরার কাছে মাফ চাই, তোয়ারা-আর নমাইত্তু”। স্থানীয়দের মতে এই দোকানি খুবই ভাল মানুষ। সকলেই তাকে অন্তর থেকে ভালবাসেন। মজা করতে নানা কথা বলে তাকে উত্তেজিত করে মজা পায়। মুখে সাদা ধবধবে সাদা দাড়ি আর মাথায় টুপি পরে হাসান আলী দোকানের একাজ ওকাজ নিয়ে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকেন। দোকানে কেউ প্রবেশ করলেই সামনে গিয়ে বলেন “আঁর বাজিরে কি দিতাম” ভাত দেয়ার প্রস্তাব পেলেই গরম পানি আর খালি প্লেট সামনে দিয়ে সবিনয়ে বলেন “তরকারি কি দিয়ুম অঁবাজি”। খাবার শেষ হলে আবার সামনে এসে দাঁড়ান সাবান ও টিস্যু নিয়ে। তার হিসাব কষে বুঝে নেন খানার টাকা। সযত্নে টাকাগুলো রাখেন পরনের লুঙ্গির খোঁচায়।
তার বয়স, শরীর স্বাস্থ্য দেখে অনুমান করা যায় এই দোকানটিই বৃদ্ধ নুরুল হাসানের বেঁচে থাকার জীবনী শক্তি। তিনি একাই সামলান দোকানটি। সব খাবার নিজের হাতে পরিবেশন করেন, গ্লাস, থালা বাটি ধোয়া মোছার কাজও করেন নিজের হাতে। দোকানে তার সহযোগিতায় ভাগিনা পরিচয়ে একজনকে রাখা হলেও প্রায় সব কাজই করেন নুরুল হাসান। ‘প্রতিদিন দুপুরে খাবার খেতে আসা লোকজনের মতে বৃদ্ধ দোকানি একজন মাটির মানুষ। এই বয়সেও তিনি কর্মের মাধ্যমে মনমননে উজ্জীবিত আছেন। তাদের মতে এই দোকানের খাবার খুবই তৃপ্তিদায়ক, পরিবেশ সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রাউজানের নামি-দামি হোটেলগুলোতে খেয়ে এই দোকানের তৃপ্তি পাওয়া যায় না বলে সাধারণ খদ্দরদের অভিমত।
জানা যায় গত প্রায় বছর খানেক আগে বৃদ্ধ এই দোকানি পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিল। একারণে প্রায় এক মাস দোকানটি বন্ধ ছিল। আদালতের আসা যাওয়ায় থাকা লোকজন জানায় ওই সময় আমরা সবাই তাকে খুব মিস করেছি। তখন মনে হয়েছিল আদালত এলাকাটি থেকে হাসি মসকরা হারিয়ে গেছে। দোকানের মালিক নুরুল হাসান তার সম্পর্কে বলেন এই দোকানের মাধ্যমে আমি মানুষের সেবা করি, লাভ লোকসানের কথা চিন্তা করি না। বাজার থেকে জিনিষপত্র কিনে ঘরে যায়। আমার স্ত্রী রান্না করে রাখলে সেগুলো দোকানে এনে বিক্রি করি। চেষ্টা করি সবার সাথে হাসি খুশিতে থেকে চলে যেতে। সাংসারিক জীবন সম্পর্কে বলেন আমার ৩ পুত্র সন্তান। একজন প্রবাসী, একজন চট্টগ্রাম নগরীতে প্রেসের দোকানে কাজ করেন। আরেকজন রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। কর্ম জীবনে আমি চাষাবাদের কাজ করেছিলাম। পরে এই দোকানে এসে মানুষের সেবায় মনোনিবেশ করেছি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সবার ভালোবাসায় থাকতে চাই। বৃদ্ধ হাসান রাউজান পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত রুহুল আমীনের পুত্র।

x