প্রতিদিন দুঃসংবাদ এসে ডানা ঝাপটায় আমাদের চারপাশে!

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
33

যে-কোনো সমাজে কিছু অসঙ্গতি থাকে, মানুষের প্রতি মানুষের অসাদাচরণ থাকে। খুন খারাবি থাকে। সেটা যদি মাত্রাতিরিক্ত ঘটে, সেটাই যদি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তখন সমাজ আর সমাজ থাকে না, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না। রাষ্ট্র সমাজ-সভ্যতার ফসল। নাগরিকদের সুশৃঙ্খল জীবনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যই হচ্ছে নাগরিকদের আইনি কাঠামোর মধ্যে রেখে তাদের যাপিত জীবনকে সুরক্ষা দেওয়া। প্রতিদিন যে হারে নতুন নতুন মাত্রায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তাতে সরকারের কোনো দায় আছে বলে মনে হয় না নাগরিকদের প্রতি। অপরাধ বেড়ে যায় তখন যখন অপরাধীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়।
প্রতিদিন দুঃসংবাদ এসে ডানা ঝাপটায় আমাদের চারপাশে। আমরা কোনভাবেই নান্দনিক কোনো বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করতে পারছি না। ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর হতে চলেছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ। ছাত্র নামধারী কিছু দুষ্কৃতকারী বারবার বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষক গবেষককে লাঞ্ছিত করে শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করেছে কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই ছাত্র নামধারীরা আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেছে বরাবরই। অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদকে যেভাবে লাঞ্ছিত করা হলো হয়তো আর একটু সুযোগ পেলেই উনাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারত এই দুর্বৃত্তের দল। এই উদ্দেশ্যেই তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। নারী ধর্ষিত হওয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা সত্য কথা তাই বলে এই কথা কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ স্যার লিফটে চারজন ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটিসি) ঘটনায় আমরা হতবাক বৈকি! সাহিত্যের ক্লাসে নর-নারীর সম্পর্ক আসতেই পারে তাই বলে সেটা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কীভাবে হয়, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষককে এভাবে হেনেস্থা করার দায় এড়াবে কীভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন? ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে শ্রদ্ধার ছিল। শিক্ষকরা যেমন ছাত্রদের আলোকিত করতেন ভালবাসতেন, ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সম্মানের চোখে দেখতেন সবসময় কিন্তু এখন সব সম্পর্কের মত এই সম্পর্কও নষ্ট হয়েছে। আমরা শিক্ষকদের সম্মান করতে ভুলে গেছি। আবার পাশাপাশি এমন খবরও আমাদের হতবাক করে দেয় মাদ্রাসার অধ্যক্ষের ভয়ঙ্কর শিকার ১২টি শিশু। এছাড়া মিজমিজি অঙফোর্ড হাইস্কুলের শিক্ষক আরিফুলের বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিও দেখিয়ে তাদের মায়েদেরও ফাঁদে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ফেনীর নুসরাত প্রতিবাদ করেছিল বলেই অধ্যক্ষ সিরাজ তাঁকে আর বাঁচতে দেয়নি। তার সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে তাকে পুড়িয়ে মেরেছে।
কয়েকদিন আগে রিফাত নামক একটা ছেলেকে প্রকাশ্যে দিবালোকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে শত মানুষের সামনে। যারা এই হত্যায় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় ছিল তারা কম বেশি সবাই কলেজের ছাত্র। শিক্ষা যেখানে জাতীয় মেরুদণ্ড গড়ার প্রাথমিক শর্ত সেখানে নীতি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের স্থান দখল করে নিচ্ছে পাশবিকতা ও স্বেচ্ছাচারিতা। এর প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রকট হয়ে উঠছে। সৃষ্টি হচ্ছে গভীর ক্ষত। শিক্ষার সাথে নৈতিকতাও কাঙ্ক্ষিত পথে পরিচালিত করতে না পারলে জাতির উন্নয়নের সঠিক নিশানা পাওয়া অসম্ভব। বর্তমান সমাজে এমন কিছু নতুন উপাদানের সম্পৃক্ততা ঘটেছে যে কারণে জৈবিকতায় আদিমত্তা ফিরে আসছে। সামাজিক অপরাধগুলো মাত্রা অতিক্রম করতে চলেছে। দেশে ভয়াবহ ব্যাধির মত দানা বাঁধছে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় আর নীতি নির্ধারক মহলের অবহেলা ও নজরদারির অভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার ব্যক্তিদের প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কার্যকর বিচার ব্যবস্থার অভাবে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আমরা ক্রমক্ষয়িষ্ণু ভঙ্গুর অবক্ষয়গ্রস্ত ও অসুস্থ সমাজে বসবাস করছি। অসভ্যতা নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার ঘেরাটোপে এ সমাজ বন্দী। যারা সমাজ কলুষিত করছে তাদের এখনই রুখে দেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দেশের তরুণ সমাজ। আজকের তরুণেরাই আগামী দিনে দেশের কাণ্ডারী। পৃথিবীর যে কোনো দেশকে বদলে দিতে প্রয়োজন দক্ষ ও সুশিক্ষিত তরুণ সমাজ। কিন্তু আমাদের এই তরুণ প্রজন্মের নৈতিকতার অবক্ষয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ সমাজ বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের ফাঁদে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য গ্রহণ, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই বিদ্বেষসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
চারিদিকের এই অবস্থা থেকে মানুষের মনে ক্ষোভ এবং হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। মাদ্রাসাগুলোতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত। এসব মাদ্রাসাগুলোতে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধরনের জঘন্য অপরাধ কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আশা করছি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

x