প্রতারণা, পরোক্ষে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৭ জুলাই, ২০১৮ at ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ
32

বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও।’ হেমকণ্ঠ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের কলির শিরোনামে মোহছেনা ঝর্ণার লেখাটি (নারী পাতার গত সংখ্যায়) পড়ে মন খারাপ হয়েছে অনেকের। প্রতারণার এমন অজস্র কাহিনী বুকে চেপে মুখ বুঁজে সংসার করে যাওয়া নিরূপায় নারীর সংখ্যাও আমাদের প্রচুর রয়েছে। জীবনের পরতে পরতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন আমাদের বিশেষ এক শ্রেণির নারী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী স্বামীর স্ত্রী হবার কারণে শুধু নয়, স্বামীর পাঠানো টাকায় সংসার চালাতে গিয়ে এদের যে কি পরিমাণ লড়াই করতে হয়, কত ধরনের বিড়ম্বনা, বিপর্যস্ততা ও প্রতারণার শিকার হতে হয়, মুখ বুঁজে কত কী যে মেনে নিতে হয় বা সয়ে যেতে হয় সে শুধু তিনি বা তাঁরাই জানেন। না, শুধু তাঁরা নন, জানেন নিবেদিতপ্রাণ কিছু সমাজকর্মী নারী এবং দরদী নারী চিকিৎসকদের কেউ কেউ। মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে সংবাদ হবার মতো কোনও ঘটনা এদের কারও সংসারে ঘটে গেলে পত্রিকার পাতায় সে ঘটনার নানামুখী, নানাস্তরিক বিশ্লেষণ দেখে এঁরা নিজেরাই চমকে ওঠেন। প্রতারণার এমন জালে জড়িয়ে ছিলেন তিনি নিজে? হতবিহ্বল এই নারীর তখন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। তিনি ভেবে পান না আপন বলে কার কাছে যাবেন বা সাহায্য চাইবেন।

সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে (কতই বা বয়স সে মেয়েটির!) দেশে রেখে প্রবাসী স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান। দু’চার বছরে দু’একবার এসে তাকে সন্তানবতী করে তিনি নিশ্চিন্ত থাকেন। তাঁর পাঠানো টাকায় সুরক্ষিত ফ্ল্যাট বাড়িতে স্ত্রী সন্তানদের মানুষ করছেন ভেবে ধীরে ধীরে তাঁর নিশ্চিন্ততা বাড়ে। তখন ঘন ঘন এসে টাকা নষ্ট করার চিন্তা বাতিল করেন তিনি। তারপর বরাবরের মতো যখন দেশে ফেরেন তখন স্ত্রীকে বা সংসারকে দেবার মতো তাঁর আর কিছুই থাকে না। অনেকে ফেরেন অসুস্থ হয়ে। অনেকে এতকাল ধরে পাঠানো টাকার হিসেব না পেয়ে বা স্বজনদের বিশ্বাসঘাতকার স্বরূপ মেনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রীকে তখন নতুন করে অন্য ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

মোহছেনা ঝর্ণা ওর গল্পের (গল্প নয়) উপজাতি মেয়েটির পরিণতির কথা খুলে বলেননি বা বলতে চাননি। ষে গল্পের সূত্র ধরে যার গল্প শোনাতে যাচ্ছি তার গল্প আমি জেনেছি মাত্র সেদিন; তার জীবনাবসানের পরে। কলেজ জীবনে আমাদের সহপাঠী প্রাণচঞ্চল সে মেয়েটির নামটি আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছিলাম কিন্তু তাকে আমরা কেউ ভুলিনি। কলেজ বার্ষিকীতে তার কবিতা পড়ে তাকে সুফিয়া কামাল খেতাব দিয়েছিল কেউ কেউ। দেখতে ভারি মিষ্টি মেয়েটি যথার্থই মেধাবী ছিল। তার আকস্মিক বিয়ে এবং পড়াশোনায় ছেদ পড়াতে ‘মজনু’ বনে যাওয়া একজনকে নিয়ে যথেষ্ট মজা করেছে অনেকে, অনেকদিন। জীবনের নিয়মে জীবন বয়ে গেছে। সবাই আমরা সবকিছু ভুলেই গিয়েছিলাম। ও যখন গল্প হয়ে এল, জানলাম পরপর তিনটি মেয়ে হবার পর ওর প্রবাসী স্বামী ওকে জানিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করে। একে পিতৃহীন, তাতে ছোট ভাইটিকে মানুষ করার দায়িত্ব ছিল ওর উপর। মেয়েদের নিয়ে ওর সংসারের শিকড়ও তখন যথেষ্ট শক্ত। আবাসিক এলাকায় চমৎকার ফ্ল্যাটে সুন্দর দিন কাটছিল রুবী (সত্য নাম নয়) এবং ওর মেয়েদের। কলেজ জীবনে দু’একটি চিঠি আদানপ্রদান করা সেই মজনু হঠাৎ দেখার সুবাদে ভালো বন্ধু হয়ে ওর সংসারের ভালো মন্দের সঙ্গে কিভাবে যে জড়িয়ে গেছে রুবী নিজেও তা বুঝে উঠতে পারেনি। অল্পশিক্ষিত আপন মামার চেয়ে উচ্চ শিক্ষিত এ মামা ওর মেয়েদের মন জয় করে নিয়েছিল। ওদের লেখাপড়ার বিষয়ে, ওদের কোচিংটিউশনির দিনগুলিতে মামার যথেষ্ট অবদানের প্রতি ওদের কৃতজ্ঞতাও ছিল। পিতা ও পিতার দ্বিতীয় সংসারের প্রতি ওদের সহনশীল হতে শেখানোতে এ মামার ভূমিকা ওরা ভালোভাবেই মেনে নিয়েছিল। একটা সময়ে দেশে ফিরে আসা পিতা ও তাঁর দ্বিতীয় সংসারের সঙ্গে মেয়েদের সুন্দর সম্পর্কের জন্য রুবী নিজেও বন্ধুর প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ ছিল।

সবকিছু চলছিল ঠিকঠাক। রুবীর সংসারের মসৃণ উপরিতলে কোনও ফাঁকফোঁকর ছিল না। কিন্তু কোনও সম্পর্ক যখন গোপন করার মতো কোনও গোপন সম্পর্কের আওতায় চলে যায় তখন নিজের সংসারের ছন্দটি কীভাবে বিপর্যস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সে ক্ষতি কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করে তা বুঝতে রুবীর সময় লেগেছে প্রচুর। ততদিনে মেয়েরা যার যার সংসারে ডালপালা ছড়িয়ে শক্ত হয়ে বসেছে। পিতাই এখন ওদের যথার্থ অভিভাবক বা একমাত্রও বটে। আপন মামা বা পাতানো মামা কারও প্রতি ওরা আর কৃতজ্ঞ নয়। মাকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দেখে মা ছাড়া সে দৃষ্টির অর্থ বোঝার সাধ্য আর কারও নেই।

রুবী এখন একা। নিঃসঙ্গ। ভাই বা বন্ধু কেউ আর রুবীর খোঁজ নেয় না। অথচ কারও সঙ্গে কোনও মনোমালিন্য হয়েছে এমনও নয়। ভাইটি এখন বরং দুলাভাইয়ের সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠব্যবসাপাতির কারণে। বড় মেয়ের বিয়ের সময় বন্ধুর প্রতি রুবীর অনুরোধ ছিল বিয়েতে না আসার। আত্মীয়স্বজন বিষয়টা কে কিভাবে নেবে তা নিয়ে মেয়েরাই মাকে সাবধান করেছিল। সেই থেকে এতটা নিখোঁজ বা নিশ্চুপ হয়ে যাবার কোন কারণ ছিল না। তবু সময়ের নিয়মে যা হবার তাই হয়। একটা সময়ে রুবী টের পেল তার হাতে সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। ভাইএর কাছে ওর পাওনা টাকার অঙ্কটা খুব ছোট নয়। তাছাড়া ভাই এখন বেশ সচ্ছল। ফ্ল্যাটটার বেশ ভারি সংস্কার কাজ জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরনো এক বান্ধবী অংশীদার হতে চায় ভাড়ার বিনিময়ে। স্বামী হারিয়ে সেও একা। ওর পুত্রপুত্রবধূ আলাদা থাকতে ইচ্ছুক। কিন্তু বাড়ি সংস্কারের আগে কিছু করার জো নেই।

ভাই এর কাছে টাকা চাইতে গিয়ে রুবী স্তম্ভিত। বোনঅন্ত প্রাণ যে ভাইটি বোনকে মাতৃমর্যাদায় শ্রদ্ধা করে গেছে প্রতি মুহূর্তে আজ তার মুখের ভাষা এবং শরীরি ভাষা দুইই দুর্বোধ্য ঠেকলো রুবীর কাছে। টাকা দেওয়া দূরের কথা উল্টো ভাই এর পাওনা গন্ডা চুকিয়ে দেবার ধমক এলো জোরগলায়। দিনের পর দিন অন্তহীন খোঁজাখুঁজি করে শান্ত, অনুগত যে মেয়েটিকে ভাইয়ের জন্য পছন্দ করে এনেছে সেও স্বামীর সঙ্গে গলা মেলায়। অতি প্রিয় তার সেই ছোট্ট ভাইটি আজ অভিভাবকত্বের সুরে বোনের চরিত্র নিয়ে কথা বলছে। তাতেও আপত্তি ছিল না রুবীর। কিন্তু এই সূত্রে যে গল্প সে শোনালো তাতে রুবীর মুখে আর কোনও কথা এলো না। রুবীর মেয়েদের বিয়ে উপলক্ষে ওদের পাতানো মামার বা ওদের মায়ের প্রেমিকের বিশাল অঙ্কের ‘টাকার খাঁই’ নাকি মেটাতে হয়েছিল এই ভাইকে। এও সম্ভব? মোবাইলে রুবীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ ছবি দেখিয়ে এবং এ ছবি বরপক্ষের হাতে তুলে দিয়ে মেয়েদের বিয়ে ভন্ডুল করার পরিকল্পনা ছিল বোনের প্রেমিকের। রুবীর কানে এসব কথা না যাওয়ার ব্যবস্থাও সে করেছিল। বদমাইশটা তার প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল। খুনীদের সঙ্গে করে নিয়ে এসে তাকে চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। নিজের প্রাণের ভয়ে, ভাগ্নিদের সুখের সংসারে আগুন লাগার ভয়ে ভাই এতদিন মুখ খোলেনি। বোনের মনের কষ্টও নাকি তার বিবেচনায় ছিল। কিন্তু আজ যখন সুযোগ এল, বোন নিজেই এসেছে তার কাছে তখন সুদেআসলে বোন নিজেই ভাইএর দেনা শোধ করে দিক। ফ্ল্যাটটা তার নামে লিখে দিলেও চলে। বোনের বাকি জীবনের দায়িত্ব না নেবার মতো অমানুষ সে নয়। তবে বোন বাড়াবাড়ি করলে সেও বসে থাকার পাত্র নয়।

রুবীর সে দুর্দিনে যে বান্ধবী পাশে দাঁড়িয়েছিল, ওর সঙ্গে, ওর ফ্ল্যাটে থেকেছে, বান্ধবীকে মনের জোর যুগিয়েছে ঘটনাচক্রে তার মুখ থেকে শোনা কথাগুলোই আমাদের আজকের গল্প। রুবীর মতো নরম মনের মেয়েরা শেষ পর্যন্ত যা করে রুবী তাই করেছিল।

x