প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার বন্ধ সময়ে জেলেদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে

সোমবার , ৬ মে, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
76

উৎপাদন বাড়াতে ২০১৫ সাল থেকে প্রজনন মৌসুমে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে সরকার। এতদিন পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এবার থেকে সব ধরনের নৌযানকে এর আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সব ধরনের নৌযান নিষেধাজ্ঞার আওতায় এলে বঙ্গোপসাগরে মাছ উৎপাদন বাড়বে। সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর পার্ট ১১ রোলস ৫৫ (২) বির ক্ষমতাবলে সরকার প্রজনন মৌসুমে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১৫ সালে এ নিষেধাজ্ঞা জারির সময় সব নৌযানকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়। তবে শুরুতে সমুদ্রে মৎস্য আহরণকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। দেশে এ ধরনের ২৪৮টি বাণিজ্যিক জাহাজের মৎস্য আহরণের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮০টি জাহাজ নিয়মিত সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত। নিষেধাজ্ঞার সময়ে এসব জাহাজ সমুদ্রে মাছ ও চিংড়ির মতো খোলসযুক্ত জলজ প্রাণি শিকার করতে পারে না। তবে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযান এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকায় সমুদ্রে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, সাধারণত বাণিজ্যিক জাহাজ প্রতিবার সমুদ্র যাত্রায় গড়ে ১৩ থেকে ১৫ দিন ও স্টিল বডির জাহাজ সর্বোচ্চ ৩০ দিন মৎস্য আহরণের অনুমোদন পায়। অন্যদিকে যান্ত্রিক নৌযান সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মৎস্য আহরণের লাইসেন্স নিলেও সমুদ্র যাত্রার জন্য অনুমতি নিতে হয় না। আবার অযান্ত্রিক নৌযানকে লাইসেন্সও নিতে হয় না। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার সময় যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযান প্রজনন মৌসুমে মৎস্য আহরণ করে আসছে। এ কারণে অনেক সময় সামুদ্রিক রেণু পোনাসহ অপরিপক্ব মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ে। এতে জেলেরা সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে সামুদ্রিক আহরণ কমে আসছে। তাই এবার সারাদেশের ৩২ হাজার ৮৫৯টি যান্ত্রিক নৌযান ও ৩৪ হাজার ৮১০টি অযান্ত্রিক নৌযানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এই তথ্য সম্বলিত খবরটি প্রকাশিত হয়।
কয়েক বছর ধরে মাছের প্রজনন মৌসুমে সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে দেশে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এবারও আগামী ২৩ মে থেকে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তবে এবারের কর্মসূচি আগের মতো হুবহু নয়, কিছুটা আলাদা। এতদিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল শুধু বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর, এখন থেকে যান্ত্রিক, অযান্ত্রিক সব ধরনের নৌযানকে এর আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এতে বঙ্গোপসাগরে মাছ উৎপাদন আরো বাড়বে। কারণ নিষেধাজ্ঞার সময়ে এতদিন কেবল অনুমোদিত ২৪৮টি বাণিজ্যিক জাহাজই সমুদ্রে মাছ ও চিংড়ির মতো খোলসযুক্ত জলজ প্রাণি শিকার করতে পারতো না। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক অন্য সব নৌযান আলোচ্য কর্মসূচির আওতায় ছিল না, ফলে সমুদ্রে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন নানাভাবে বিঘ্নিত হয়ে আসছিল, যার কারণে প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করা যায় নি। সব ধরনের নৌযানকে এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত উদ্যোগে এর ব্যতিক্রম হবে বলে আশা করা যেতে পারে। কিন্তু আলোচ্য কর্মসূচির সফলতা বহুলাংশ নির্ভর করছে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ নজরদারির ওপর। এজন্য কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, বিজিবি, এমন কি র‌্যাবের বিশেষ সক্রিয়তা ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। আবার কেবল নজরদারি থাকলেও হবে না, জেলেদের আর্থিক দীনতারও সুষ্ঠু সুরাহা অত্যাবশ্যক। দেখা যায় সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও নিম্ন আয়ের নৌযান শ্রমিক ও জেলেদের তা খুবই কষ্টসাধ্য। কাজেই নিষেধাজ্ঞার সময়ে দরিদ্র জেলেদের পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা ও বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। অন্যথা নিষেধাজ্ঞা ফলপ্রসূ হবে না। সেই বিবেচনায় কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি এদিকেও সরকারের মনোযোগ জরুরি।
ইতিবাচক কথা হলো, নৌযান মালিকেরা এরই মধ্যে তাদের শ্রমিক ও জেলেদের নিষেধাজ্ঞার সময় মাসিক ভিত্তিতে চাল কিংবা আর্থিক সুবিধা প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের প্রস্তাব এখনো বিবেচনাধীন আছে। এক্ষেত্রে ত্বরিত দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। গরিব ও দুস্থ জেলেদের তালিকা করে তাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে জেলেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আলোচ্য কর্মসূচিতে সমর্থন জোগাবেন। কর্মসূচির সরকারি প্রণোদনার ক্ষেত্রে প্রায়শই নয় ছয় করতে দেখা যায়। যার প্রাপ্য তিনি পান না, ফলে প্রকৃত যাদের প্রয়োজন তারা বঞ্চিত হন। জেলেদের প্রণোদনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সমুদ্রে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরো একটি ব্যাপার প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। সেটি হলো, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে দেশের জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মায়ানমারের জেলেরা অনেক সময় গোপনে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে নির্বিচারে মাছ শিকার করে নিয়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বহির্দেশের জেলেদের মাছ চুরির কারণে এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। কাজেই মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাড়াতে এই দুই দেশের অর্থাৎ মায়ানমার ও ভারতের জেলেদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে হবে। এটা শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্যও জরুরি। মায়ানমার ও ভারতের জেলেদের তৎপরতা ঠেকাতে হলে সার্বক্ষণিক সমুদ্র টহলদারি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

x