প্রকৃত নেতৃত্বের বিকাশে নিতে হবে রাজনৈতিক উদ্যোগ

শুক্রবার , ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
21

আজকাল পাড়ায় পাড়ায় সৃষ্টি হয়েছে ‘বড় ভাই’। তাঁরা মূলত গ্যাং লিডার হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবস্থান নিয়ে তাঁরা বিস্তার করেন তাঁদের সাম্রাজ্য। এলাকায় খুন, জখম, অপহরণসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে তাঁরা সক্রিয়। বন্দুকযুদ্ধে সাইফুলের মৃত্যুর ঘটনার সংবাদের ফলোআপে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে গত ১৩ই এপ্রিল দৈনিক আজাদীতে। ‘আতঙ্কে আত্মগোপনে শতাধিক বড় ভাই’ শীর্ষক এই সংবাদে বলা হয়, ‘গ্যাং লিডার’ ও ‘বড় ভাই’ কালচারের খারাপ ফল হিসেবে প্রতিনিয়ত ঘটছে মারামারি ও খুন-খারাবি। নগরীর পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে এসব বড় ভাইয়ের দাপট। রাজনৈতিক নেতার ছায়ায় থেকে তারা এক প্রকার বেপরোয়া। বাকলিয়া থানা এলাকায় কথিত ‘বড় ভাই’ মোহাম্মদ সাইফুলের বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে নগরীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শতাধিক ‘বড় ভাই’। আতঙ্কে অধিকাংশ গা ঢাকা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। এ ধরনের ‘বড় ভাই’ প্রবণ বাকলিয়ার ডিসি রোড, দেওয়ান বাজার, খালপাড়, বগারবিল, রসুলবাগ, রাহাত্তারপুল, কালামিয়া বাজার ও রাজাখালির মতো এলাকা সাইফুলের মৃত্যুর ঘটনায় শুনশান। প্রভাব রয়েছে নগরীর অন্য খানেও। পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে গত ৯ এপ্রিল কল্পলোক আবাসিক এলাকায় মারা যাওয়া যুবলীগের কর্মী মোহাম্মদ সাইফুল বাকলিয়া থানার খালপাড় এলাকার বাসিন্দা। তিন দিন আগে এ এলাকায় মোহাম্মদ লোকমান হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন সাইফুল। লোকমান বড় ভাই কালচারের বলী।
রাজনীতিবিজ্ঞানীরা বলেন, রাজনৈতিক নেতা হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে বর্তমান সময়ে এমনকি নিকট অতীতেও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক নেতা কম চোখে পড়ে। অতীতে বিশেষ করে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও মোটাদাগে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন পর্যন্ত নেতা তৈরির একটি প্রক্রিয়া আমাদের সামনে ছিল। বর্তমানে বড় বড় রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার রাজনৈতিক অতীত রয়েছে। নিজেদের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শুরু থেকে ছাত্ররাজনীতি ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াই ছিল সংস্কৃতি। এমন প্রক্রিয়া ছিল স্বাভাবিক। তাদের প্রজ্ঞা ও ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা ছিল সঠিক পথ। সময়ের আবর্তে এর অনুপস্থিতিতে আমাদের রাজনীতিতে শূন্যতা হয়তো তৈরি হয়নি ঠিক কিন্তু গুণগত মানের শূন্যতা অবশ্যই রয়েছে। আমরা নিত্যনতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব পেয়ে আসছি এবং ভবিষ্যতেও পাব। স্বাধীনতা-পূর্ব ও পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত এ ধরনের রাজনৈতিক চালিকাশক্তি সক্রিয় ছিল। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার ফলে অনেকে আদর্শ ও চেতনা বিসর্জন দিয়ে অন্য দলে যোগ দিলেও এ কথা সত্য যে তাঁরাও একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নতুন রাজনৈতিক দল সৃষ্টি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং আদর্শ ও চেতনার মিল-অমিলের জন্য নতুন দল তৈরি হয়।
রাজনীতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম, তাই রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির শুরু থেকেই। রাজনীতির গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যায় তার প্রতি মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে। রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় কার্যত রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা, নেতৃত্ব কলুষিত হয়ে গেলে রাজনীতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিবর্তে মানুষের ভাগ্যে নেমে আসে অবধারিত দুর্যোগ। এ নেতৃত্ব তৈরি হয় সমাজের শেকড় স্তর থেকে। গ্রাম পাড়া বা মহল্লা কিংবা কলেজ থেকে। এখানে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে, বিস্তার লাভ করে, অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, পরবর্তী সময়ে তা জাতীয় নেতৃত্বে প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা এখন স্থানীয় নেতার পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করছি ‘বড় ভাই’।
লালসা ও বিলাসিতার জন্য জাতির সর্বনাশ করার মতো প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক প্রত্যেক সমাজে থাকে। ঐ ধরনের লোকেরা হীনম্মন্যতাবোধ ও অহংবোধের প্রভাবে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা, সম্পদ ও মর্যাদা পেতে চায়। ক্ষমতার অপব্যবহার তখনই যখন কারো প্রত্যাশা নোংরা হয়ে যায়। দুষ্টচক্র, বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারক লোকেরাই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজের মধ্যে দুর্নীতি ডেকে আনে।
তবে আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, বর্তমান সরকার দুর্নীতির মূলোৎপাটনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সমাজের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে ইতোমধ্যে তাঁরা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব যেন আমাদের সমাজে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃত নেতৃত্বের বিকাশে নিতে হবে রাজনৈতিক উদ্যোগ।

x