প্রকট হচ্ছে চট্টগ্রামে আবাসন সংকট

সিডিএর বরাদ্দ দেয়া প্লটের দুই তৃতীয়াংশই খালি পড়ে আছে

হাসান আকবর

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ
2868

চট্টগ্রাম মহানগরীতে আবাসন সংকট প্রকট। প্রতিদিনই আসছে মানুষ। বাড়ছে মানুষ। কিন্তু বাড়ছে না আবাসনের সুযোগ সুবিধা। বিগত ৬০ বছরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১২টি আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু দুই তৃতীয়াংশ প্লটই খালি থাকায় সংস্থার জনমুখী উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে গেছে। শত শত খালি প্লট পড়ে আছে এক একটি আবাসিক এলাকায়। অপরদিকে যথাযথ উদ্যোগের অভাবে দুইটি আবাসিক এলাকা প্রায় পরিত্যক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে না এলে চট্টগ্রামে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া কঠিন হতো। ফ্ল্যাট কালচারই চট্টগ্রামের লাখো মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছে।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বিগত ৬০ বছরে সর্বমোট বারোটি আবাসিক এলাকা বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ৫৮টি, ১৯৬৫ সালে করা আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ৩৯১টি, ১৯৭৩ সালে করা চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ৭৫৯টি, ১৯৭৭ সালে করা কর্ণেল হাট সিডিএ আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ১৬৮টি, ১৯৮৪ সালে করা সলিমপুর সিডিএ আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ৯০৪টি, ১৯৯৫ সালে করা কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পে প্লটের সংখ্যা ৫১৭টি, ২০০০ সালে করা চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ১৮০টি, ২০০২ সালে করা চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায়ে প্লটের সংখ্যা ৮২টি, ২০০৬ সালে করা কল্পলোক আবাসিক এলাকায় প্রথম পর্যায়ে প্লটের সংখ্যা ৪২৩টি, ২০০৭ সালে করা কল্পলোক আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩৫৬টি, ২০০৮ সালে করা অনন্যা আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যা ১৪৭৮টি এবং ২০০৯ সালে ষোলশহর পুনর্বাসন এলাকায় সিডিএ ৪৮টি প্লট বরাদ্দ দেয় ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের। গত ৬০ বছরে সিডিএ সর্বমোট ৬৩৬৪টি প্লট বরাদ্দ দিয়েছে।
নগরীর আবাসন সংকট ঘুচাতে সিডিএ প্লট বরাদ্দ দিলেও দুই তৃতীয়াংশ প্লটেই কোন বাড়িঘর নির্মিত হয়নি। একের পর এক প্লট হাতবদল হচ্ছে। মূল্য বাড়ছে। অথচ সিডিএ যেই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্লট বরাদ্দ দিয়েছিল সেটি অর্জিত হয়নি। অপরদিকে অপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়ার ফলে সিডিএর সলিমপুর আবাসিক এলাকা এবং কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা প্রায় পরিত্যক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা সলিমপুর আবাসিক এলাকায় ৯০৪টি প্লট থাকলেও অধিকাংশ প্লটই খালি পড়ে আছে। শহর থেকে দূরে এবং নাগরিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় এখানে কেউ বাড়িঘর নির্মাণে আগ্রহি নয়। অপরদিকে নদীর ওপারের কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। প্লট রয়েছে ৫১৭টি। আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠার দুই যুগ অতিক্রান্ত হলেও একটি বাড়িও এই আবাসিক এলাকায় নির্মিত হয়নি। বাড়িঘর করার কোন পরিবেশই ওই আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেনি। পানি সংকটে পুরো এলাকাটি জঙ্গলের আকার নিয়েছে। কল্পলোক আবাসিক এলাকা এবং অন্যন্যা আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা হয়েছে দশ বছরেরও বেশি আগে। অথচ বাড়ি ঘর নির্মিত হয়নি বললেই চলে। কল্পলোক আবাসিক এলাকায় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বাড়িঘর নির্মাণ শুরু হলেও এখনো শত শত প্লট খালি। সবকিছু মিলে চট্টগ্রামে গড়ে তোলা ১২টি আবাসিক এলাকায় দুই তৃতীয়াংশ প্লটই খালি পড়ে আছে। প্লট বরাদ্দের পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাড়িঘর নির্মাণ করা না হলে প্লট বাতিলের আইন থাকলেও তা কার্যকরের কোন রেকর্ড নেই।
চট্টগ্রামের আবাসন সংকট ঘুচাতে অপর সরকারি সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষও ব্যাপক ভূমিকা রাখার কথা। স্বাধীনতার বহু আগে গঠিত ১৯৫৬ সাল থেকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামে কাজ শুরু করলেও নগরীর আবাসন সংকট ঘুচাতে সংস্থাটি প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই সংস্থা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে মাত্র সাড়ে সাত হাজার প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। ছোট খাটো এবং অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষদের জন্য এসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এদের অধিকাংশ প্লটই স্বল্প আয়ের মানুষের কাছ থেকে টাকাওয়ালারা কিনে নিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। একই সাথে এই সংস্থা ১৭৭১টি ফ্ল্যাটও বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এখনো এসব ফ্ল্যাট ক্রেতাদের হস্তান্তর করা হয়নি। সংস্থার চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিকল্পিত নগরায়নের পাশাপাশি ধানি জমি রক্ষার ক্ষেত্রে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের ভূমিকা রেখে আসছে। চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে উপশহর গড়ে তোলার পাশাপাশি দুইটি স্যাটেলাইট শহরও গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারি দুইটি সংস্থা আবাসনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মন্তব্য করে নগর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নগরীতে প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষ। গড়ে ১০ শতাংশ মানুষ বাড়ছে প্রতি বছর। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি সংস্থা দুইটি আরো বড় পরিসরে ভূমিকা রাখতে পারতো। অথচ তারা করছে না। এতে করে নগরীর আবাসন সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বেসরকারি বিভিন্ন ডেভলপার প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাট নির্মাণ করে নগরীর আবাসন সংকট ঘুচাতে এগিয়ে না আসলে পরিস্থিতি নাজুক হতো বলেও তারা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, আবাসনের সংকট থাকায় নগরীতে বাড়ি ভাড়া অত্যধিক। লাখো মানুষ শুধু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সিডিএর পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিডিএ কোন আবাসিক এলাকা বাস্তবায়নের প্রকল্প গ্রহন করেনি। গত দশ বছরেরও বেশি সময় সিডিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা আবদুচ ছালাম নগরীর রাস্তাঘাট উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিলেও একটি আবাসিক এলাকাও করেননি। প্লট বরাদ্দের বিতর্ক এড়াতেই তিনি আবাসিক এলাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেননি। সিডিএ’র বিদ্যমান আবাসিক এলাকাগুলোতে বরাদ্দ দেয়া প্লটগুলোতে বাড়িঘর নির্মাণে আইনের প্রয়োগ ঘটানো গেলে নগরীর আবাসন সংকট বহুলাংশে ঘুচে যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

x