পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা

ডিসেম্বরে প্রজ্ঞাপন, মিশ্র প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ
178

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মজুরি এখনকার চেয়ে ৫১ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দেওয়ার পর সেই হারে বেতন পাচ্ছিলেন শ্রমিকরা। এবার শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি করেছিলেন। এর বিপরীতে পোশাক শিল্প মালিকরা প্রস্তাব করেন ৬ হাজার ৩৬০ টাকা। গবেষণা সংস্থা সিপিডি ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার টাকা করার পক্ষে মত জানিয়েছিল। খবর বিডিনিউজের।

ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকার ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠন। ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তারা। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক শ্রমিক নেতারা মজুরি বোর্ডের ঘোষণা মেনে নিয়েছেন। ১৬ হাজার টাকা মজুরি দাবি আদায় না হওয়ার জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর অনৈক্যকে দায়ী করেছেন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্মূল্যায়নে পাঁচ বছর পর গত জানুয়ারিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের পর বোর্ডের সদস্যরা দফায় দফায় বৈঠক করেন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার তোপখানা সড়কে মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে সর্বশেষ বৈঠক হয়। এরপর মজুরি বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন মজুরি কাঠামোর ঘোষণা দেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। ঘোষণা অনুযায়ী, পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হবে ৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে বেসিক ৪ হাজার ১০০ টাকা; বাড়ি ভাড়া ২০৫০ টাকা; চিকিৎসা ভাতা ৬০০ টাকা; যাতায়াত ভাতা ৩৫০ টাকা; খাদ্য ভাতা ৯০০ টাকা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপাতত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হলো। অন্যান্য শ্রমিকদের বেতনকাঠামো পরে ঘোষণা করা হবে।’ আগামী ডিসেম্বরে প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে নতুন বেতন কার্যকর হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পরে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য কামাল উদ্দিন, বোর্ডে মালিকদের প্রতিনিধি বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, শ্রমিকদের প্রতিনিধি শ্রমিক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূইয়া।

আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মন্টুও সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন। নতুন মজুরি কাঠামো মালিকশ্রমিক উভয় পক্ষ মেনে নেবে বলে প্রতিমন্ত্রী চুন্নু আশা প্রকাশ করলেও এই মধ্যে আপত্তি এসেছে বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। বিকাল ৩টায় মজুরি বোর্ড যখন তোপখানার কার্যালয়ে সভা করছিল, তখনই ভবনের নিচে বিক্ষোভ করছিল গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, শ্রমিক সংহতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সাড়ে ৪টার দিকে সভা শেষ করে যখন মজুরি বোর্ডের সদস্যরা সচিবালয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বিক্ষুব্ধ কয়েকশ’ জন স্লোগান দিচ্ছিলেন– ‘১৬ হাজার টাকার কমে ন্যূনতম মজুরি মানব না’।

শ্রমিকমালিক মিশ্র প্রতিক্রিয়া :

বাংলানিউজ জানায় : সর্বনিম্ন আট হাজার টাকা রেখে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ঘোষণা করায় শ্রমিকমালিক উভয়পক্ষের মধ্যেই দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শ্রমিক নেতারা এ মজুরি প্রত্যাখান করেছেন আর মালিক পক্ষ বলছে, মজুরি বাড়াতে হলে কর কমানোর পাশাপাশি প্রণোদনা দিতে হবে কারখানায়।

এ নিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সমন্বয়ক আবুল হোসাইন বাংলানিউজকে বলেন, এখন সব জিনিসের দাম বেড়েছে। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। তাই আমাদের দাবি ছিল ১৬০০ টাকা নূন্যতম মজুরি। সেখানে তার অর্ধেক করা হয়েছে কোন যুক্তিতে সেটা জানি না। এতে শ্রমিক অসন্তোষ আরও বাড়বে। গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, আট হাজার টাকা সর্বনিম্ন মজুরি আমরা প্রত্যাখান করছি। কোনো শ্রমিকের কাছে এই ঘোষণা গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের আন্দোলন চলবে যতোক্ষণ না পর্যন্ত ১৬ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরির ঘোষণা আসবে। এদিকে, আবার এ মজুরি নিয়ে মালিক পক্ষের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের যুক্তি এখন গার্মেন্টসের অবস্থা বেশি ভালো না। ঘোষিত মজুরি অনেক বেশি হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, এখন গার্মেন্টসের অবস্থা তেমন ভালো না। বায়াররা টাকা দিলে আমি শ্রমিককে দেবো। কিন্তু বায়াররা এখন টাকা দেয় না। আমাদের জন্য ছয় হাজার ৩০০ টাকাই সঠিক ছিল। না হলে বেতনের অভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তারপরও সরকার যেটা করেছে এতে শ্রমিকের চুপ থাকা উচিত। শ্রমিককে নিয়েই আমাদের ব্যবস্যা। শ্রমিক বাঁচলে কারখানা বাঁচবে। আমরা শ্রমিককে বাঁচাতে চাই, আবার নিজেরাও বাঁচতে চাই। অতিরিক্ত কিছু করা হলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এঙপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য সেলিম উসমান বলেন, সরকার যে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে এতে আমাদের কর কমাতে হবে, প্রণোদনা দিতে হবে। এমনিতেই আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এই অবস্থায় অনেক বেশি চাপিয়ে দিলে আমরা চলতে পারবো না। সরকার সুবিধা দিলে আমরা মেনে নেবো।

তিনি বলেন, শ্রমিক নেতারা যদি এ বেতন না মানেন আমরাও মানবো না। এখনও সময় আছে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবো। সব বিষয়ে জানাবো তাকে।

x