পোল্ট্রি শিল্পে কমছে দেশি বিনিয়োগ

আনুষঙ্গিক ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন হ্রাস ।। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অভিযোগে ভোক্তা পর্যায়ে ভীতি

জাহেদুল কবির

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
222

নানাবিধ সমস্যায় পোল্ট্রি শিল্পে দিন দিন বিনিয়োগ কমছে। ব্যবসায় মুনাফা কমে যাওয়া, মুরগির বাচ্চা, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূলত খামারিদের ক্রমাগত লোকসান গুণতে হচ্ছে। লোকসানের ফলে ইতোমধ্যে ছোট ও মাঝারি মানের অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ব্রয়লার মুরগির খামারগুলোতে রোগের প্রতিষেধক হিসেবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়েটিক প্রয়োগের যে অভিযোগ রয়েছে তা নিয়ে জনমনে একধরণের বিভ্রান্তি রয়েছে। এতে বাজারে ব্রয়লার মুরগির চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে যাওয়াও মুরগির দরপতনের অন্যতম কারণ। পক্ষান্তরে প্রতি বছর বছর বাড়ছে মুরগির প্রতিপালন ব্যয়। তবে জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই বছরের তুলনায় পোল্ট্রি শিল্পের অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক নয়। এছাড়া মুরগিকে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়েটিক খাওয়ানো হচ্ছে-একটি মহল এই ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অ্যান্টিবায়েটিক খাওয়ালে মুরগির ওজন বাড়ে না এবং ডিমের উৎপাদনও কমে যায়।
জেলা প্রাণীসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলায় নিবন্ধিত লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে চারশতাধিক। এছাড়া ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে প্রায় চার হাজার। এরমধ্যে অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ৩ হাজারেরও অধিক।
বর্তমানে খামারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ছোট ও মাঝারি মানের খামার বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন খামারিরা। প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাদের দাবি, যে সকল খামারিরা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মুরগি প্রতিপালন করেন, তারা খুব ভালো আছেন। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরিচালিত খামারের মুরগির মাংস ও ডিমের পুষ্টিগুণ অটুট থাকে। অপরদিকে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিও পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগকারী ৭টি বিদেশি কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ৫টি ভারতের, ১টি থাইল্যান্ডের এবং ১টি চীনের। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে ভিএইচ গ্রুপ, গোদরেজ, সগুনা, টাটা এবং অমৃত গ্রুপ। এছাড়া আছে থাইল্যান্ডের সিপি এবং চীনের নিউহোপ। এ সকল কোম্পানি দেশের পোল্ট্রি শিল্পের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারছে না অনেক দেশীয় খামার। ফলে ঝরে পড়ছে ছোট ও মাঝারি মানের খামার। আবার যারা টিকে আছেন, তারাও কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছেন না।
পোল্ট্রি খাত সংশ্লিষ্টদের অভিমত, পোল্ট্রি উৎপাদনে যে খরচ হয় তার ৬৮ শতাংশ খাদ্য খরচ, ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাচ্চা কেনার খরচ, ৫ শতাংশ ওষুধের খরচ, ৪ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি এবং বাকি অন্যান্য খরচ। বর্তমানে এসব খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষত বেড়েছে খাবারের দাম। সারাবিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ ভুট্টার উৎপাদন কমায় দাম বেড়েছে। আবার প্রয়োজনীয় ভুট্টার ৪০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। আমদানিতে শুল্কহারও বেশি। সরকার কৃষি ফসল খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এরমধ্যে বড় ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে শস্য উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ রাসায়নিক সারের উপর। তেমনিভাবে পোল্ট্রিখাতে ব্যবহৃত উপকরণ খাদ্যের উপর ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। তাতে পোল্ট্রি খাদ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে। ব্রয়লার মুরগীর মাংসের বার্ষিক উৎপাদন ২০১৬ সালে ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন, ২০১৭ সালে ৫ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০১৮ সালে ছিল ৫ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০২১ সালে দেশে মুরগির মাংসের চাহিদা হবে প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পোল্ট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারকে এই খাতে প্রণোদনা দিতে হবে। যেমন এখানে খামারিদের যদি বিনামূল্যে ভেকসিন সরবরাহ করা হয় তাহলে তাদের উৎপাদন খরচ কিছুটা কমবে। আবার আরেকটি বিষয় দেখা যায় যে, ডিমের বাজার উঠানামা করে। কিন্তু খাদ্যের দাম সব সময় উর্ধ্বমূখী থাকে। তাই সরকার যদি মনিটরিং করে তাহলে এই খাতে নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে। বিনিয়োগও বাড়বে পোল্ট্রি খাতে।
ফটিকছড়ির খামারি মো. নাসির জানান, গত দুই বছর ধরে মুরগির বাজার দর খুব খারাপ ছিল। এই খাতের অনেক খামারি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এখনো পরিস্থিতি অনূকুলে আসেনি। অনেকে ঋণ নিয়ে খামার করে লোকসানে পড়েছে। সেই লোকসান এখনো কাভার দিতে পারেনি। কারণ প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে মুরগির খাদ্য এবং আনুষাঙ্গিক খরচ বাড়ছে।
জানতে চাইলে নাহার এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (উৎপাদন) মনোজ কুমার চৌহান দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মুরগির প্রতিপালন করে থাকি। মানুষের যেমন রোগ ব্যাধি হয়, মুরগিও তেমনি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে মুরগির চিকিৎসা করে থাকি। ঢালাওভাবে অ্যান্টিবায়েটিক সেবনের যে অভিযোগটি সচরাসচর আসে, সেটি আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অ্যান্টিবায়েটিক সেবনে মুরগির ওজন কমে যায়। এছাড়া এই মুরগি তো আমার-আপনার বাচ্চারা খাবে, আমরা জেনেশুনে এই ক্ষতি করতে পারি না। ছোটো ও মাঝারি কোনো খামারে অ্যান্টিবায়েটিকের ব্যবহার করা হয় কিনা আমার জানা নেই।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের ব্রয়লার খামারের পরিমাণ কমলেও লেয়ার মুরগি খামার কিন্তু এখন দিন দিন বাড়ছে। আসলে গত দুই এক বছর ধরে মুরগির দাম কম থাকার কারণে অনেক খামারি শেডে মুরগির বাচ্চা তোলেনি। এখন কিন্তু কিছু খামারি মুরগির বাচ্চা তুলছেন। বাচ্চার দামও নাগালের মধ্যে আছে। এছাড়া সম্প্রতি ডিমের দাম বাড়ার কারণে লেয়ার মুরগির খামারে বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে ব্রয়লার মুরগিকে অ্যান্টিবায়েটিক দেয়া হচ্ছে-এই ধরণের অপপ্রচার আমরা প্রায় সময় শুনে থাকি। একটা মুরগি এক মাসে এক কেজি ওজনের হয়। এছাড়া কোনো লেয়ার মুরগিকে যদি অ্যান্টিবায়েটিক দেয়া হয়, তবে সেই মুরগির ডিমের উৎপাদন কমে যাবে। তাই কোনো খামারি জেনেশুনে এই ধরণের কাজ তো করবে না।
খামারে অ্যান্টিবায়েটিক প্রয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি অ্যান্ড পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক আখতার উজ জামান দৈনিক আজাদীকে বলেন, সাধারণত কোনো মুরগিকে ৫-৭ দিন অ্যান্টিবায়েটিক দেয়া হলে তা মুরগির শরীরে থেকে যায়। সেই মুরগির মাংস মানবদেহের জন্য ভালো নয়। তাই আমরা হারবাল জাতীয় বিকল্প কিছু ওষুধের কথা বলে থাকি। আর একেবারে না হলে শর্ট কোর্সের প্রিভেন্টিভ অ্যান্টিবায়েটিক দেয়া যায়। তবে অনেক অনেক বড় খামার সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত মুরগি প্রতিপালন করে থাকে। তারা দেশের প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

- Advertistment -