পৃথিবীর কান্না

অনিক শুভ

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ
15

কান্নার শব্দে টুবাইর ঘুম ভেঙে গেলো। এমন শব্দ ও প্রায় রোজই শুনে। তবে আজ শব্দটা অনেক নিষ্ঠুর ভাবে কানে বাজছে। এই করুণ আর্তনাদে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল টুবাই। বাইরে প্রকৃতির স্পর্শে এলে মনটা ভালো হয়ে যায় ওর। প্রকৃতির সঙ্গে প্রেমটা ছোটবেলা থেকেই। উত্তাল সাগরের নোনাজল যখন আছড়ে পড়ে, ঝিরিঝিরি বাতাসে তৈরি হয় সফেদ ফেনা। যা রৌদ্রময় আলোর ঝলকানিতে মুক্তোর দানার মতোই চিকচিক করে। সে মাতাল করা দৃশ্য অবচেতন মনটাকে নিমেষেই ভালো করে দেয়।
টুবাই বাইরে এসে দেখলো উঠানের এক কোনে ডিম্বাকৃতির এক বস্তু। ওখান থেকে মনে হয় এমন শব্দ ভেসে আসছে। ধীর পায়ে বস্তুটির দিকে এগিয়ে গেলো টুবাই। উঠান হতে কুড়িয়ে নিলো একটি কঞ্চি। কঞ্চিটি দিয়ে যেই বস্তুটিকে নাড়িয়ে দিলো, সাথে সাথে কান্নার শব্দ থেমে গেলো। শব্দ থেমে যাওয়াতে টুবাই খুব অবাক হয়ে বলল, “কে তুমি?”
বস্তুটি চটজলদি উত্তর দিলো “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”
হুম পাচ্ছি। তুমি কাঁদছ কেনো? এত কষ্ট কেনো তোমার?
তোমাদের আচরণে কাঁদছি।
আমাদের আচরণে! কে তুমি?
আমি… আমি তোমাদেরই পৃথিবী।
পৃথিবী!
হ্যাঁ… আমি পৃথিবী।
আমরা কি এমন করেছি তোমার সাথে? যার জন্য তুমি আজ এতো দুঃখী?
কি করনি তোমরা? তোমরা মানুষের জন্যই আমার বুকে এসিড বৃষ্টি হয়। আর তাতে সমগ্র প্রাণীকূল ভয়ংকর দুর্গতিতে পরে। তোমাদের কর্মকাণ্ডে বাতাসে যখন গ্যাস ও ধূলিকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে বায়ু দুষিত হয়; জলাশয়ে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ও বিভিন্ন প্রাণীর মলমুত্র ফেলে পানি দুষিত করো; বর্জ্য, এসিড, রাসায়নিক দ্রব্য, খাল, বিল ও নদীর পানির সাথে ফসলি জমির সাথে ছেড়ে মাটি দুষিত করো; অযথা মাইক বাজিয়ে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে, বাস-ট্রাক, রেলগাড়ি, লঞ্চ- স্টিমারের হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে শব্দ দূষণ করো? তখন আমার খুব কষ্ট হয়। আর আমার এই কষ্ট, এই আর্তনাদ একমাত্র তুমিই শুনতে পাচ্ছো।
পৃথিবীর এমন কথা শুনে কান্নাস্বরে টুবাই বলল,
হুম। ঠিক বলেছো। মানুষের জন্যই আজ তোমার এবস্থা। আমাদের অসতর্কতার জন্য, সবকিছুর অপব্যবহারের জন্য তোমাকে এমন পরিস্থিতিতে পরতে হলো।তোমার কিছু হলে , আমরাও নির্মূল হয়ে যাবো তোমার বুক থেকে। আমরা এতদিন নির্বিচারে বননিধন করে, প্রাণী শিকার করে জীবস্তরের ফুড চেইন নষ্ট করেছি। যার ফলে পুরো ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য বিলিনের মুখে। এখন যে করে হোক একটা উপায় বের করতে হবে। পৃথিবী তোমাকে বাঁচাতে হবে। সকল প্রাণীকূলকে বাঁচতে হবে।
পৃথিবীর সাথে টুবাইর অনেক অভিসন্ধি হলো। কিন্তু পরিকল্পনা সঠিক হলো না। পরে তারা সিদ্ধান্ত নিলো আগে এক এক করে সকল মানুষকে পৃথিবীর এই দুর্গতির কথা বুঝাবে যে পৃথিবী না থাকলে তারাও থাকবেনা। তারপর একত্রিত হয়ে সকলে যাবে বৃক্ষরাজের কাছে।
সবাই একত্রিত হয়ে যখন বৃক্ষরাজের কাছে গেলো, দেখলো বৃক্ষরাজ নিজেও শুকিয়ে নিস্তেজ হয়ে আছেন। পৃথিবী বিনয়ের সাথে বৃক্ষরাজ কে বললেন, “বৃক্ষরাজ আমরা সকলে কেন আপনার কাছে এসেছি আপনিতো আন্দাজ করতে পারছেন। আমার কষ্টের কথাতো জানেন। আমাকে বাঁচাতে হলে আপনাকে কিছু একটা করতে হবে। নাহয় পুরো জৈববৈচিত্র্য থেকে শুরু করে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। দয়া করে আপনি ওদের জন্য হলেও কিছু করুন।”
বৃক্ষরাজ মাথা নিচু করে পৃথিবীকে বলল, “পৃথিবী, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার কিছু করার নেই। যা করার সব মানুষ করতে পারতো। ওরা ইচ্ছে করলে আপনাকে অনেক সুন্দর রেখে নিজেরাই শান্তিতে বাস করতে পারতো। কিন্তু ওরা সেটা করেনি। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের সকলের এ অবস্থা।” বৃক্ষরাজের এমন কথা শুনে সকলে সকল মানুষ এক সাথে বলল, “বৃক্ষরাজ… আমরা দুঃখিত। আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমরা আর এমন ভুল করবোনা। এমন কিছু করবোনা যাতে আমাদের জন্য পৃথিবী দূষিত হয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যায়। আমরা এখন বুঝতে পারছি পৃথিবীর কিছু হলে আমরাও জীবিত থাকবোনা… …
টুবাই সকলকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বৃক্ষরাজকে বললেন, “দুনিয়ার সকল রোগের ওষুধ আপনার কাছে রয়েছে। আপনি বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন ত্যাগের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেন। আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক বৃক্ষ দশ জন মানুষের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন। আপনারা বাতাস থেকে ষাট পাউন্ডের অধিক বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, শত শত টন কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুর দূষণ রোধ ও তাপদাহ দুপুরে প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসে প্রায় একশত গ্যালন পানি নির্গত করে পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখেন। শব্দ দূষণেও আপনার জবাব নেই…
টুবাইর কথা শেষ না হতেই বৃক্ষরাজ বললেন, “এসব করতে পারলে কি হবে? মানুষই তো আমাদের কেটে কেটে আজ পৃথিবীর এ অবস্থা করলো।”
টুবাই আবার বলল, “আমরা ভুল করেছি। তাই আজ প্রায়শ্চিত্ত করার সময় এসেছে। আমরা আর আপনাদের কাটবোনা। বন উজাড় করবোনা। দয়া করে আপনি কোন উপায় বলুন যাতে আমরা সকলে বাঁচতে পারি।”
বৃক্ষরাজ অনেক ভেবে বললেন, “উপায় একটা আছে।”
সবাই একসাথে জানতে চাইলো, “কি এমন উপায়?”
মানুষকে গাছ লাগাতে হবে। এই পৃথিবীর সকল বসতবাড়ির প্রাঙ্গনে গাছ লাগাতে হবে। স্থল ভাগের যেখানে যায়গা থাকবে, সুযোগ থাকবে সেখানে রোপন করতে হবে গাছ। তবেই আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবো। বৃক্ষরাজের এমন প্রস্তাবে সকলে একমত হল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ অন্তত একটি করে গাছের চারা রোপন ও পরিচর্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো। চারা রোপনের পর ক্রমান্বয়ে বৃক্ষ তার কার্যকলাপ শুরু করে দিলো। ধীরে ধীরে দূষণ কমে শুরু করলো। পৃথিবীর কল্যাণ হতে লাগলো।
সবাই বৃক্ষরাজকে কৃতজ্ঞতা জানালো তার মহানুভবতার জন্য। কিন্তু বৃক্ষরাজ বললেন, “পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখতে হলে আমার পাশাপাশি তোমরা মানুষেরও অনেক করণীয় রয়েছে। তোমাদের নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ করতে হবে। যানবাহনে সীসামুক্ত ও সিএনজি ব্যবহার করতে হবে। বর্জ্য খাল, বিল, নদীতে না ফেলে শোধন করতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”
মাথা নত করে সকল মানুষ বৃক্ষরাজের কথায় সম্মতি জানিয়ে প্রতিজ্ঞা করলো তারা সব নিয়মকানুন পালন করে চলবে। পৃথিবীকে সুস্থ রাখবে। আর বেশি বেশি গাছ লাগাবে।

x