পুলিশের অ্যাপে মেলে না কাঙ্ক্ষিত সেবা

তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় মাসের পর মাস

সোহেল মারমা

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ
94

পুলিশের ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’ অ্যাপে সেবা প্রত্যাশীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। আইনি সেবা বা তথ্য পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারো কারো অভিযোগ, মাসের পর মাস কাটলেও জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। আবার তাদের বিষয়ে পুলিশ যেসব জবাব দিচ্ছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তোষজনক নয়। থানা পুলিশের কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও অসেচতনতার কারণে দ্রুত সেবা প্রদানের বদলে উল্টোটি ঘটছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে চলতি মে মাস পর্যন্ত ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’ অ্যাপে যেসব অভিযোগ বা তথ্য জমা পড়েছে সেগুলোর পর্যালোচনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার বিষয় উঠে এসেছে। অথচ দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি সেবা পাওয়া, পুলিশের সেবার মান বৃদ্ধি করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের সনাক্ত করাসহ নানা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে অ্যাপটি তৈরি করেছে পুলিশ। এর পেছনে আরো একটি কারণ হচ্ছে, পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। পর্যালোনায় জানা গেছে, স্মার্টফোনের মাধ্যমে এই অ্যাপে সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণের কাছ থেকে এমনিতেই তুলনামূলক সাড়া কম পাওয়া গেছে। আবার যেসব সেবা প্রত্যাশী সাড়া দিচ্ছে তাদেরকে দেরিতে জবাব দিচ্ছে পুলিশ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জবাব দিতে সময় লাগছে সপ্তাহ বা মাস। কিছু গোপনীয়তার ক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে জবাব এমনভাবে দেওয়া হচ্ছে, ঘুরে-ফিরে তথ্য প্রদানকারীকে থানায় দৌঁড়াতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো সেবা প্রার্থীর অভিযোগের জবাবই দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা। যদিও সংশ্লিষ্ট থানা এলাকা থেকে বিভিন্ন অভিযোগ বা তথ্যের বিষয়ে ওই থানার ওসি, এসি, ডিসিসহ পুলিশের সদর দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তারা একসাথে বিষয়টি মনিটরিং করতে পারেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাপটির মাধ্যমে সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ বা তথ্যের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে অনেক অপরাধের ঘটনা আগেই নির্মূল করা সম্ভব হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার ফারুক উল হক দৈনিক আজাদীকে বলেন, অ্যাপটির মাধ্যমে যেসব অভিযোগ বা তথ্য জমা পড়ছে সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করে থাকি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, থানা না দিলেও নিজেই সেবা প্রত্যাশীদের কাছে সেইসব অভিযোগ বা তথ্যের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সমাধান ফিরতি ম্যাসেজের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া অপরাধের কোনো তথ্য পেলে থানা পুলিশকে তদন্তের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগেরও চেষ্টা করা হয়। অ্যাপটিতে সেবা প্রত্যাশীদের পরিচয়ের বিষয়ে গোপনীয়তার ব্যবস্থা থাকায় অনেকেই আছেন যারা ভুল তথ্য দিচ্ছেন বা অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। যেগুলো পরবর্তীতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে, অ্যাপটির ব্যবহারে পুলিশের মধ্যে এখনো অসচেতনতা রয়েছে জানিয়ে ফারুক উল হক বলেন, অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আছেন যারা জানেনই না অ্যপটিতে তার মোবাইল নম্বরটি নিবন্ধন করা আছে। তিনি অ্যাপটির ব্যবহার বা সেবা প্রদানের বিষয়টি কীভাবে দেবেন? এছাড়া জনসাধারণদের মাঝেও অ্যাপটি ব্যবহারের বিষয়ে ধারণা কম। এসব সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে জানান তিনি।
নগর পুলিশের আইসিটি বিভাগ দেখভালকারী গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবু বক্কর আজাদীকে বলেন, হেল্পলাইন অ্যাপসহ পুলিশের ফেসবুক পেজ ও অনলাইনে অন্যান্য মাধ্যমে যেসব অভিযোগ বা তথ্য জমা পড়ে সেগুলো ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করে ডিবি পুলিশ। প্রতি সপ্তাহে এসব তথ্য কমিশনার স্যারকে দেখানো হচ্ছে। সেখান থেকে পরে অভিযোগ বা তথ্যগুলোর বিষয়ে তদন্ত করার জন্য বিভিন্ন থানায় পাঠানো হচ্ছে। এসব কাজ নিয়মিত করছে আইসিটি বিভাগ। তবে, বিডি পুলিশ হেল্পলাইন অ্যাপটির কার্যক্রমে এখনো ভালোভাবে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন কাজে ব্যস্ততার কারণে হয়তো পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের তাৎক্ষণিক জবাব দিতে পারেন না।
অ্যাপটিতে পাওয়া কয়েকটি অভিযোগ : গত বছরের সেপ্টেম্বরে খুলশী থানায় একজন অভিযোগ করেন, তিনি একটি অভিযোগ কয়েকবার দিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগটির বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি কিংবা অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জবাব পাননি। এর পরিবর্তে বিডি পুলিশ হেল্পলাইনের সদরদপ্তরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জবাব দেন। এ সময় তারা ওসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু তার জবাব পাওয়া যায়নি ওসির পক্ষ থেকে।
গত বছরের ৩ নভেম্বর হাটহাজারী থানার পোস্টে একজন ভুক্তভোগী তার মোবাইল ডিভাইস চুরির অভিযোগ করেন। ওই ডিভাইসে তার প্রাইভেসি রক্ষিত ছিল জানিয়ে সেটা উদ্ধারের বিষয়ে থানায় জিডি করার জন্য কত টাকার প্রয়োজন হবে জানতে চান।
ওই অভিযোগের জবাব দিতে হাটহাজারী থানা পুলিশ পাঁচ মাস সময় নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি চলতি বছর ১৩ মে জবাব দিয়েছেন। ওসি তার জবাবে বলেন, জিডি কিংবা অভিযোগে কোনো টাকার প্রয়োজন হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বছর ১১ নভেম্বর বন্দর থানায় একজন সেবাপ্রার্থী ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পুলিশ ক্লিয়াসেন্স সার্টিফিকেটের জন্য কোথায় যেতে হবে এবং কী ধরনের কাগজপত্র লাগবে তা জানতে চান। প্রায় এক মাসের মাথায় ওসি ওই আবেদনকারীকে বিআরটিএতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ওসির ওই পোস্টের পরদিন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি ক্রাইম এনালাইসিস থেকে ওসির উদ্দেশে বলা হয়, সেবাপ্রার্থী পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকে বিআরটিএতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ সময় এডিশনাল আইজি ওসিকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন। এর পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তর থেকে অ্যাপটির সার্বিক বিষয় মনিটরিং করা হচ্ছে বলে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এর জবাবে ওসি বলেন, উনি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পোস্টটি করেছিলেন।
গত বছর ৯ ডিসেম্বর বন্দর থানায় একজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তার এলাকায় মাদক ব্যবসা বেশি হচ্ছে। প্রায় এক মাস পর বন্দর থানার ওসির পক্ষ থেকে উত্তর আসে থানায় এসে যোগাযোগের জন্য।
গত ১২ জানুয়ারি ডবলমুরিং থানা সিএমপি নামে একটি পোস্টে সরাইপাড়া ওয়ার্ডের ঝর্ণাপাড়া এলাকার একজন বাড়ির মালিক তার এক ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। ওই ভাড়াটিয়া বাসা ভাড়া না দেওয়ার পাশাপাশি বাসায় এসে হুমকিও দিচ্ছেন। অন্য ভাড়াটিয়াদের মারধর করে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। মহিলাদের গায়ে হাত তুলছেন। বাড়ির মালিকদের পুরুষ সদস্যরা সবাই প্রবাসে থাকায় এসবের প্রতিকার চেয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।
ওই অভিযোগের সতেরো দিন পর ২৯ জানুয়ারি, ডিসি (পশ্চিম) সিএমপি থেকে উত্তর আসে আপনাকে সাহায্য করার জন্য আপনার সাথে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। এ সময় ডিসি পশ্চিমের মোবাইল নম্বর অ্যাপে দেওয়া হয়।
৫ মার্চ আকবর শাহ থানায় এক ব্যক্তির ছবি দিয়ে একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়, এলাকায় তিনি মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছেন। কোমলমতি ছেলেদের টাকা হাতিয়ে নিয়ে মাদক ব্যবসা করাটাই তার কাজ। তিনি হত্যা মামলারও আসামি। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদনটিতে বলা হয়েছিল।
এক মাসের মাথায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসির পরিবর্তে ওই তথ্যের জবাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জোনের ডিসি (পশ্চিম)। এ সময় ডিসি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন।
৪ এপ্রিল ডবলমুরিং থানায় আরো একটি অভিযোগে জমা পড়ে। ওই অভিযোগে একটি পরিবারকে মোবাইলে কল করে নানা হুমকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে ওই ভুক্তভোগী ও তার ছেলেমেয়েরা নিরাপদ মনে করছেন না বলে এর প্রতিকার চান।
এ ঘটনায়ও ওসির পরিবর্তে প্রায় এক মাস পর ডিসি (পশ্চিম) ওই অভিযোগের জবাব দেন। এসময় তিনি ফিরতি ম্যাসেজে ওসি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তা জানান বলে উল্লেখ করেছেন। পরে আরেকটি পোস্টে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে ভুক্তভোগীর উদ্দেশ্যে ম্যাসেজ দিয়ে সমস্যার সমাধান না পেলে মোবাইল নম্বরটিতে যোগাযোগের জন্য বলেন।
২১ এপ্রিল হালিশহর থানায় নামে একজন ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা চেয়ে পোস্টে বলেছেন, এক ছেলে তার নামে আজেবাজে পোস্ট করছেন। এছাড়া তিনি হ্যাকিং করেন। তিনি অনেকের আইডি হ্যাক করেছেন। আমি অনেক টেনশনে আছি। ওই অভিযোগকারী ছেলেটির ফেসবুকের আইডি উল্লেখ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আবেদন করেন।
এ অভিযোগের এগারো দিন পর হালিশহর থানার ওসির পক্ষ থেকে উত্তর আসে, অভিযোগকারীকে পুলিশ স্টেশনে এসে বিস্তারিত বলার জন্য। এ সময় ওসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে অ্যাপটিতে বলেন।
এছাড়া নগরীর কয়েকটি থানায় কোনো কোনো অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা উত্তর না দিয়ে তাদের বদলে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, তথ্য প্রযুক্তির যুগে হাতে থাকা স্মার্টফোনেই পুরো দুনিয়াটা ঘুরছে। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত সেবা দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাপ সংস্করণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পুলিশ ২০১৬ সালে ১৩ অক্টোবর অ্যাপভিত্তিক পুলিশ সেবা কার্যক্রম বিডি পুলিশ হেল্পলাইন শুরু করে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে এই অ্যাপ ব্যবহার করে কোনো অভিযোগ করা হলে অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট ওসি, জোনাল এসি, উপ-কমিশনার (ডিসি), পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছবে। একইভাবে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার (এসপি), উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ সদরদপ্তর পর্যন্ত অভিযোগ যাবে। এতে যেকোনো তথ্য বা অভিযোগের বিষয়ে অভিযোগকারী ও পুলিশের শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি তদারকি করতে পারছেন। এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না সেটিও এই অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে। ফলে অভিযোগকারী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযোগের ব্যবস্থা সম্পর্কেও জানতে পারছেন।
অ্যাপটি ব্যবহার করে অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে যে কেউ তথ্য জানাতে পারবেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো ছবি, ভিডিও ও অডিও পাঠাতে পারেন সেবা প্রত্যাশীরা। বেনামে অথবা নির্দিষ্ট নাম ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারেন সেবা প্রত্যাশীরা।

x