পুরুষ কেন ধর্ষণ করে?

মাহমুদ আলম সৈকত

শনিবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
179

পর্ব – দুই

মধুমিতা পাণ্ডের সঙ্গে আলাপচারিতা

ধর্ষণের পিছনে পুরুষের মনস্তাত্বিক প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে সে-বিষয়ে প্রথম কিস্তিতে আমরা সামান্য পড়েছি। সেখানে আমরা মধুমিতা পাণ্ডের কথাও জেনেছি। যিনি ভারতের বিহার রাজ্যের তিহার জেলে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এবং দণ্ডিত ১০০ জন অপরাধীর সঙ্গে কথা বলেছেন। মূলত সাক্ষাৎকার। আজ সেই মধুমিতার পাণ্ডের সঙ্গে ওয়েবজিন হোম গ্রাউন্ড-এর একই বিষয়ক আলাপচারিতার অনুবাদ রইল।

আপনার গবেষণা এবং মাঠ পর্যায়ে কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই। দোষী সাব্যস্ত ধর্ষণকারীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের অনুমতি পাওয়ার জন্য কতটা সময় লেগেছিল এবং তা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

মধুমিতা পাণ্ডে : আপনি যদি কোনো দাপ্তরিক তদন্তের কাজে মাঠে নামেন এবং তা যদি আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে আমার মনে হয় না যে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়। তবে আমি ঠিক কি করতে চাইছি সেটা পুরোপুরি বুঝিয়ে উঠতে একটু সময় তো লাগবেই। আমার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও বাধা পাইনি বটে তবে আমি সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই কাজে নেমেছি কী না সেটা তারা এটি নিশ্চিত করেছিলো। আমি কোনটা করতে পারব আর কোনটা আমার এখতিয়ারের বাইরে, সকল নথি-পত্র এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তা। কারা কর্তৃপক্ষ খুবই সহযোগিতাপূর্ণ ছিল, আমাকে ভালোভাবেই স্বাগত জানায় তারা। এখন একটাই প্রত্যাশা, আমার পরামর্শ বা গবেষণালব্ধ প্রাপ্তিগুলো যেন তারা কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত কয়েদীদের কাছে পৌঁছে দেয়।

আপনি তো কিছু অনুমানকে উপজীব্য করে কাজটায় এগিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় আপনার সেই অনুমান কি বদলেছে?

মধুমিতা পাণ্ডে : আমি ভেবেছিলাম যে এই লোকদের সাথে কথা বলাটা ঝামেলার চূড়ান্ত হবে, তারা আমার সাথে অপরাধমূলক কিছু করে ফেলতে পারে বা অভব্য আচরণ করবে। ভেবেছিলাম যে তাদের গল্পগুলো শুনে আমি হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠব কিন্তু যে কোনো কাজের উদ্দেশ্যটা ঠিকঠাক জানা থাকলে সেটি সহজ হয়। তারা সত্য বলছে কি মিথ্যা বা তাদের অপরাধের সাপেক্ষে প্রমাণ খুঁজে বার করা- কোনোটাই একজন গবেষক হিসাবে আমার কাজ নয়। ওঠা নির্ধারণ করা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার কাজ। আমি তাদের বলা কথাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ অন্বেষণ করতে গিয়েছিলাম। বুঝতে গিয়েছিলাম যে স্বীয় কৃতকার্যের পক্ষে তাদের উপলব্ধিটি কী বা তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে তারা কী মনোভাব পোষণ করে।
আমি অবশ্যই জানাতে চাই যে তারা আমার সাথে শিষ্ট আচরণ করেছে এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যথেষ্ট ধৈর্য্যের সাথে ঠাঁই বসে থেকেছে অথচ সে সময় তাদের বেশ কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়েছে। কয়েদীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তিহার জেল সংশোধনাগার হিসেবে সত্যিই দুর্দান্ত উদাহরণ। ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত উভয় দলের আসামির সঙ্গেই আমি কথা বলেছি এবং সে সময় তারা এমন কিছুই করেনি যাতে আমার অস্বস্তিবোধ হতে পারে।

সাক্ষাৎকার চলাকালীন আপনি কী কদর্য পুরুষতন্ত্র, ধর্ষণ সংস্কৃতি, ধর্ষণের শিকার নারীটির সামাজিক লজ্জা ইত্যাদির বিষয়ে যে সমস্ত পর্যবেক্ষণ তা তাদের সাথে আলোচনা করতে পেরেছিলেন? অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

মধুমিতা পাণ্ডে : সাধারণভাবে বলতে গেলে, বহুধাবিস্তৃত গবেষণা ধর্ষণের অনুঘটক নানা বিভিন্ন প্রেরণা যেমন জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, পরিস্থিতিগত/ অপরাধমূলক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটগুলোকে সামনে রেখেই এগিয়েছে। আমি আমার কাজের মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুসন্ধান করেছি এবং প্রচলিত লিঙ্গ বৈষম্যের ভূমিকাকে আলোকপাত করে যেসব বিষয় যেমন শ্রমের অভ্যন্তরীণ বিভাগ, নারীত্বের সাংস্কৃতিক আদিরূপ এবং ‘পুরুষ’ অহংয়ের বিষাক্ত থাবা ইত্যাদির বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি।
ধর্ষণ একটি জটিল মনোবিকৃত অপরাধ হিসাবে ‘কেন পুরুষরা ধর্ষণ করে’ এর কোনও উত্তর নাই। সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রায় প্রতিটি বর্ণনাই অনন্য এবং অত্যন্ত উদ্দেশ্যমূলক- কেউ গণধর্ষণে জড়িত ছিলো, কেউ তাদের শিকারকে আগে থেকেই চিনত কিংবা কেউ কেউ সম্পূর্ণ অপরিচিত নারীকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণকারীদেরও বিভিন্ন ধরন রয়েছে, তবে সংঘটিত অপরাধের প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমি যাদের সাথে কথা বলেছি তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই সাধারণ যে অনুভূতিটি ছিল তা হলো অধিকারের অনুভূতি যা আমাদের সমাজে পুরুষ অধিকারের দিকেই ইঙ্গিত করে। এর বাইরে মারাত্মক যে প্রবণতাটি লক্ষ্য করেছি সেটি হলে- ‘সম্মতি’ বিষয়ে ধর্ষণকারীদের ন্যূনতম বোঝাপড়া অর্থাৎ নারীর সাথে সঙ্গম যে সম্মতিক্রমে হতে হয়, এটি যে জবরদস্তি মিটিয়ে নেবার বিষয় নয়, তেমন বোধই ধর্ষকদের নাই।
যে দোষী সাব্যস্ত ধর্ষণকারীদের সাথে আমি কথা বলেছি, তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত এবং গ্রামীণ পরিমণ্ডলের। তার মানে এই নয় যে ধর্ষণ কেবল অশিক্ষিত এবং গ্রামীণ পশ্চাদপদ পুরুষদের দ্বারাই সংঘটিত হয়। শহুরে শিক্ষিত এবং ধনী পুরুষের পটভূমিকায় এতটি স্বতসিদ্ধ ব্যাপার ঘটে। তারা বিচার ব্যবস্থার নানা ফাঁক-ফোকর খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি আইনী সহায়তা পেয়ে আদালতের বাইরে ন্যায়বিচার থেকে রেহাই পায়। সমপ্রতি হলিউডের বিভিন্ন যৌন হয়রানির অভিযোগে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে ধনী ও প্রভাবশালীরা বহু বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের চুপ করিয়ে রেখেছিল এবং তাদের অপরাধকে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তবে হ্যাঁ, এই কথার পরেও, বলা যায় যে নগরায়ণ পদ্ধতি পুরুষের বহুবছরের অহংবোধে গড়া এই মানসিকতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে এবং অবশ্যই শিক্ষার সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই জাতীয় অপরাধের প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে। আমার এই উক্তিকে কেউ সিদ্ধান্ত বলে মনে করবেন না বলেই ধারণা করি।
সামগ্রিকভাবে, আমি মনে করি আমার কাজ থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে বোধোদয়ে উপনীত হই তা হলো এ-র পুনরাবৃত্তি যা যৌন সহিংসতা ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। কারণ ধর্ষণ হলো চরম ঘৃণিত এবং চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ যা ঘটার আগে সমাজে আরও আরও কিছু ঘটে চলে যেসব আমরা আমলে নিই না বা সেসবের তীব্র সমালোচনা করি না। যাই হোক, এই চরম সহিংসতাগুলি ঘটে থাকে কারণ আমরা ধারাবাহিকতার অন্যপ্রান্ত যেমন প্রাত্যহিক ইভটিজিং, যৌনাশ্রয়ী রসিকতা, নারীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষার প্রয়োগ, যৌন হয়রানির মতো বিষয়গুলি উপেক্ষা করি – যেসব আমাদের কাছে হুমকিস্বরূপ গৃহিত হয় না বা গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে, আমাদের দৃষ্টি ফেরানো উচিৎ এমন ‘কম হুমকি’ স্বরূপ বিষয়গুলোতে কারণ এসবই শেষ পর্যন্ত চরম সহিংসতার দিকে পরিচালিত করে বা এর প্রতি সহনশীল মনোভাব গড়ে তোলে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের দেশের (ভারতের) কাঠামোগত সামাজিক পরিবর্তনের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত যা আমাদের দেশের পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে অপ্রতিসম শক্তির সম্পর্ককে সম্বোধন করে।

আপনি কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন এবং আপনার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে দোষী সাব্যস্ত ধর্ষণকারীদের জন্য কি কি চ্যালেঞ্জ কাজ করছিলো বলে মনে করেন?

মধুমিতা পাণ্ডে : পদ্ধতি হলো গুণগত মৌলিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ। আমি সেমি স্ট্রাকচার্ড আর ওপেন এন্ডেড প্রশ্নমালা ব্যবহার করেছি। অংশগ্রহণকারীরা দুটি প্রশ্নপত্রও পূরণ করেছিলেন: নারীদের প্রতি পুরুষের মনোভাব এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে পুরুষতত্ত্বের ধারণা।

সাক্ষাৎকার পর্বে নারী হিসাবে নিজের লৈঙ্গিক পরিচয়টি কীভাবে প্রভাব ফেলেছে?

সাধারণত যখন নারীরা পুরুষদের সাক্ষাৎকার নেন, তখন কেউ কেউ লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধাজনক অবস্থানের কথা বলে থাকেন। আমি আগেই জানতে পেরেছিলাম যে পুরুষবন্দীরা পুরুষ সাক্ষাৎকার গ্রহীতাদের তুলনায় নারী সাক্ষাৎকারকারীদের প্রতি সহনশীল। মানে তারা পুরুষদের চাইতে নারীদের সঙ্গেই খোলাসা হয়ে কথা বলেন বেশি এবং আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম পাইনি। অভিযুক্ত বেশিরভাগ পুরুষই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার চলাকালে কৃতকার্যের চুকা ঢেঁকুর তুলতেই পছন্দ করতো। তবে এ-ও মাথায় রাখতে হবে যে সাক্ষাৎকার চলাকালে তারা তাদের অনুভূতিগুলোও ব্যক্ত করেছিলো, তারা নিজেদের স্ব-চিত্র সহানুভূতিশীল হিসেবে আঁকতে চেয়েছে, আবেগতাড়িত হয়েছে। আমি তাদের জবানিতে কোনও চটকদার বা অনুপযুক্ত মন্তব্য বসিয়ে দিইনি। যদিও মাঝে মাঝে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় যেমন- সঙ্গম (বা বলপূর্বক যৌনমিলন) এবং বিকৃত যৌনতার সাথে তাদের জড়িত থাকার কথা প্রসঙ্গে, তাদের দৃশ্যত অস্বস্তি বোধ করতে দেখেছি।

আপনার মতে ভারতে ধর্ষণের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বড় অনুঘটকগুলো কী কী?

মধুমিতা পাণ্ডে : এদেশে ধর্ষণের পটভূমি বৈচিত্র্যপূর্ণ কারণ এখানে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি বেশ বিচিত্র। এমতন অনুঘটকের নাম কয়টা বলবো? জনসংখ্যা এখানে মৌন নয়। এইদেশের যৌন অপরাধের সর্বজনীন ছাঁচকে বোঝা সাগর সেঁচে মুক্তা খুঁজে আনার মতোই ব্যাপার।
আলোচনার খাতিরেই বলি, যদি প্রধান কয়েকটি অনুঘটকের কথা বলতে বলা হয়, আমি বলব- আমাদের সমাজের খুব গভীরে প্রোত্থিত পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ, নারীত্বের সনাতন ধারণা, নারী সম্মান, লিঙ্গ বৈষম্য এবং যৌন আদর্শ ইত্যাদি। আমার মনে আছে, ‘নির্ভয়া’ কাণ্ডের পর বিবিসি’র তৈরি একটি তথ্যচিত্রে (ইণ্ডিয়াজ ডটার) সেই মামলার আইনজীবী একই কথা বলেছিলেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার ছিল যখন তথ্যচিত্রটিতে দেখি যে এক ধর্ষণকারীর তরুণ স্ত্রী যার সিঁথিতে গাঢ় সিঁদুর আর কপালে টিপ (মানে আদর্শ ভারতীয় বধূ), বলছে – ‘আমি কি ভারতীয় নারী নই? আমার কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই?’ স্বামীর মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে তার জবানী ‘একজন নারী তার স্বামী দ্বারা সুরক্ষিত। যদি স্বামীই মারা যায় তবে কে তাকে রক্ষা করবে এবং আমি কার জন্য বেঁচে থাকবো?’। ভারতে এমন ধারণা পোষণ করার মতো নারী বিরল নয়। বিশেষত গ্রামীণ পরিমণ্ডলে, স্বামীর উপর নির্ভরতা মূলত ব্যক্তি আত্ম-পরিচয়ের অনুপস্থিতিকেই তুলে ধরে। এসব বিষয়ে নারীদেরকে শিক্ষিত করে তোলা এবং ক্ষমতায়নের পাশাপাশি পুরুষের তীব্র অহংবোধের যে সংস্কৃতি তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় যেতে হবে এবং একই সময়ে পুরুষকে পুরুষতন্ত্র বিষয়ে স্বাস্থ্যকর ধারণা বিকাশে সহায়তা দিতে হবে।
আমি আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই, ধর্ষণ বন্ধে সর্বাত্মক সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য নিয়মিত কাঠামোগত পরিবর্তন করা উচিত যা প’লে প’লে গড়ে ওঠা নারীবিদ্বেষী মনোভাব এবং আচরণগুলিকে নির্দেশিত করে।

দোষী সাব্যস্ত ধর্ষণকারীদের মধ্যে অপরাধবোধ বা অনুশোচনা বোধ কাজ করে কি? বা নারীদের প্রতি তাদের মনোভাবের কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?

মধুমিতা পাণ্ডে : সবাই যে তাদের কৃত অপরাধের জন্য দায় স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করেছে তেমন নয়। তবে এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে:
ক) অনুশোচনা এবং ক্ষমা চাওয়ার জন্য ধর্ষককে প্রথমেই বুঝতে হবে যে সে যা করেছে তা ভুল। আর যেহেতু আমার গবেষণার নমুনা হিসেবে পুরুষরাই প্রধান সুতরাং তাদের কৃতকর্মটিকে ‘ভুল’ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারেনি (এদের অনেকেই ‘সম্মতি’ বলতে কী বোঝায় তা জানে না) এবং কাজটি তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো কিছু আছে বলে প্রতীয়মানও হয় না। অনেকেই স্রেফ দাবী জানিয়েছে যে- আমরা দোষী নই।
খ) অনুশোচনা বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। সাক্ষাৎকারে কিছু পুরুষ খোলামেলাভাবে বলেছে যে তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করছে এবং অন্যরা বলেছে যে তারা চায় না তাদের বোন বা কন্যার সাথে কেউ একই কাজ করুক। আর এই উপলব্ধি এটাই তুলে ধরে যে কিছু স্তরে তারা বুঝতে পেরেছিল তারা যা করেছে তা ভুল।

আপনি কি মনে করেন আমাদের কারাগারগুলো এরূপ অপরাধীদের সংশোধনাগার হিসেবে উপযুক্ত স্থান?

মধুমিতা পাণ্ডে : সব কারাগার তো আমি দেখিনি, সম্ভবও নয়। তবে বন্দীদের পুনর্বাসনের জন্য বিহারের তিহার কারাগার কিছু দুর্দান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। আমার মতে সেই ব্যবস্থায় যা অনুপস্থিত রয়েছে তা হলো কৌশলগতভাবে সংশোধিত পুনর্বাসন কর্মসূচি যা যৌন অপরাধীদের বিকৃত চিন্তাধারাকে পরিবর্তনের দিকে পরিচালিত করে।
পশ্চিমা বিশ্বের এগুলোকে সেক্স অফেন্ডার ট্রিটমেন্ট প্রোগ্রামস (এসওটিপি) বলা হয়। আমি অবশ্য ট্রিটমেন্ট বা চিকিৎসা শব্দের ভক্ত নই, তাই ব্যক্তিগতভাবে ভারতে একটি যৌন অপরাধী পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেখতে চাই। যেখানে ধর্ষণ বিষয়ক গল্পগুলি ছড়িয়ে দিয়ে পুরুষের মগজে জেঁকে বসা বেতালকে ঝেড়ে ফেলার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমের পরিচালনা করা যেতে পারে। সেখানে নারীদের প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন, সম্মতির কাঠামো, নারীর আত্ম উপলব্ধি, যৌন শিক্ষা ইত্যাদি থাকবে। বর্তমানে এ-জাতীয় কর্মসূচির জন্য একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজ করছি। প্রতিশোধের ক্ষেত্রে আমি সংস্কারমূলক ন্যায়বিচারকে সমর্থন করি এবং মনে করি না যে কঠোর শাস্তির বিধানই এই অপরাধ রোধের একমাত্র জবাব।

আপনার আগামীর পরিকল্পনা? ভারতে কি আর কোনও প্রকল্প গ্রহণ করছেন?

মধুমিতা পাণ্ডে : বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে একযোগে এগুচ্ছি। তবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমার গবেষণাগুলি আমার একাডেমিক জার্নালে প্রকাশ করা এবং তারপর উক্ত গবেষণাটি ভারতের অন্যান্য কারাগারে প্রসারিত করা। এর বাইরে ভারতে আধুনিক দাসত্বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমাদের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রকল্পের কাজে যুক্ত আছি।

সূত্র : https://homegrownd.co.in

x