পুরান ঢাকার উৎসব-পার্বণ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

শুক্রবার , ১৫ জুন, ২০১৮ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
197

পুরাতন ঢাকা শহরই ছিল আদি ঢাকা শহর। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ধরে জুরাইন থেকে বসিলা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষেই ছিল পুরান ঢাকার পরিসর। সেই পুরান ঢাকার বৈচিত্র্যপূর্ণ অতীত উৎসবপার্বণের বিষয়াদি দৈনিক আজাদীর পাঠকদের অবহিত করতেই লেখাটি লিখেছি। তাদের ভালো লাগলেই আমার পূর্ব অভিজ্ঞতার এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

পুরানো ঢাকার সকল উৎসবপার্বণগুলো ছিল অনিবার্য ভাবেই ধর্মীয় দিবসকে কেন্দ্র করে। এ সমস্ত উৎসব পালিত হতো স্বকীয়তায়। এখনও কিছু কিছু অবশিষ্ট আছে বৈকি। তবে বেশীর ভাগই লুপ্তপ্রায়। মহররম মাসের এক তারিখ থেকে শুরু হতো নানা কর্মকাণ্ড। স্থানীয়রা সন্তানদের মঙ্গলার্থে মানত করে ‘বেহেস্তা’ বানাতো। বেহেস্তারা এই দশ দিন মাছ খাবে না। কারবালার যুদ্ধে হোসেনের পতাকাবাহী সৈনিকের বেশে লালসালু কোমরে পেঁচিয়ে জরিবাদলার ফুলের সাদালালকালো রঙের সুতার বিশেষ সাজ লালসালুর চারদিকে এবং শরীরের উপরের অংশে পেঁচিয়ে হাতে লম্বাটে ত্রিকোণ লালসবুজ জরি লাগানো পতাকা হাতে মহররমের মিছিলে এবং মহরমকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডে তারা অংশ নিতো। আশুরার আগের দিনের সন্ধ্যায় ও শেষ রাতে হোসেনী দালান থেকে মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করতো। সে রাতে স্থানীয় বিভিন্ন এলাকায় গঠিত যুবকদের দল লাঠিখেলা, তলোয়ার খেলাসহ নানা শারীরিক কসরত এবং রকমারী যুদ্ধের খেলা প্রদর্শন করতো সড়কের মোড়ে মোড়ে। স্থানীয় ভাষায় এই সকল দলকে ‘আখাড়া’ বলা হতো। আখাড়ার দলের ঢাক ও ঢোলের শব্দে আমরা ছুটতাম সড়কের মোড়ে। এক দলের খেলা শেষে বাড়ি এসে তন্দ্রাচ্ছন্নতা এলে আবার অপর দলের আগমনের ঢাকঢোলের শব্দে ছুটে যেতাম আখড়া’র দলের যুদ্ধের খেলা দেখতে। সারারাত পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দলের নানান দৃষ্টিনন্দন খেলা উপভোগ করতাম। দূরদূরান্তের আত্মীয় পরিজনেরাও চলে আসতো আখাড়ার টানে।

আশুরার দিন আজিমপুর মোড় থেকে পিলখানা পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে মহররমের মেলা বসতো, যা এখন আর বসে না। মেলায় নাগরদোলা, নানা ধরনের খাবারসহ মাটির তৈরি জীবজানোয়ার, পাখিফল, টিন ও এল্যুমনিয়ামের খেলনা, বাঁশের বাঁশি, ঢোল, খেলনা গাড়ি বিক্রি হতো। খৈবাতাসা, পাতখিরসা, মাসকালাই ডালের বড়া হতে শুরু করে নানান পদের খাবার এবং মেলাকেন্দ্রিক হকের প্রকার দ্রব্যসামগ্রী পাওয়া যেতো। সাদা দুলদুল ঘোড়া আর লাল খুনী ঘোড়া বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকতো তাজিয়া মিছিলে। শিয়া সম্প্রদায়ের যুবকেরা অনেকগুলো ছোট মাপের ছুরি শেকলে বেঁধে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ শব্দ বলেবলে নিজ পিঠে ক্রামগত আঘাত করতো। পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরতো। বয়স্করা হাত দিয়ে বুকে আঘাত করে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ বলে বলে মিছিলে অংশ নিতো। ছোটরা অনেকে এই মিছিল দেখে ভয়ে রীতিমত কান্নাকাটি করতো। হোসেনি দালান থেকে দুপুরের এই তাজিয়া মিছিল এবং ফরাশগঞ্জের বিবি রওজা থেকে বিকেলের ‘পাগলা গওড়া’ নামের দ্রুত ছুটেচলা মিছিল পর্যায়ক্রমে অতিক্রম করতো মেলার পথ। আশুরার দিন বাড়ি বাড়ি খিচুড়ী রান্না করে এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়িতে পৌঁছে দিতো স্থানীয়রা। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টি শরবতও বিতরণ হতো। ঢাকার নবাবেরা মহররম মাসের আশুরাকে কেন্দ্র করে নানা আনুষ্ঠানিকতা এবং আশুরাকেন্দ্রিক সবধরনের কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। নবাবদের কাল গত হলে পর স্থানীয় বিত্তবানেরা নবাবী অনুকরণে আশুরা উদযাপনের কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত রাখতেন।

মহররম মাসে আমরা বাড়তি আনন্দে আত্মহারা হতাম। আশুরার দিন স্থানীয়দের নতুন জামাই শ্বশুর বাড়িতে এসে অর্থ উপঢৌকন পেয়ে শ্যালকশ্যালিকাদের মহররমের মিছিলমেলা দেখাতে নিয়ে যেতো। কিনে দিতো রকমারী খাবার ও খেলনা। এটি ছিল সামাজিক রীতি। মহররমের এই আচারঅনুষ্ঠানের সাথে ধর্মের যে কার্যকর যোগসূত্রতা ছিল তা কিন্তু নয়। এর জৌলুস ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অনুষ্ঠান আজ আর আগের মতো নেই। তাজিয়া মিছিল ও পাগলা গওড়া মিছিল আজও বের হয় তবে তা সে কালের মতো মোটেও নয়। এখন সেটা নিতান্তই দায়সারা গোছের প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

শবেবরাতের উৎসব হতো বাড়িতে বাড়িতে। মসজিদে মসজিদে আলোকসজ্জা এবং মোমবাতি জ্বালানো হতো পাশাপাশি বাড়িতেবাড়িতে ও কবরেমাজারে। আতসবাজি পোড়ানো, বাজি ফাটানো, তারাবাতি জ্বালানো ছিল আবশ্যিক। হালুয়া রুটি তৈরী করে একে অপরের বাড়িতে পাঠানো, বাড়িবাড়িতে আগত ভিক্ষুকদের অর্থ এবং রুটিহালুয়া দেয়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এবং বাড়িতে মিলাদ মাহফিল করা, জামাই বাড়িতে বা জামাই পক্ষ শ্বশুর বাড়িতে শবেবরাত উপলক্ষে বেকারিগুলোতে বানানো বিভিন্ন প্রতীকের বিশাল আকৃতির রুটি ও নানা পদের হালুয়া পাঠানো ছিল আবশ্যিক রেওয়াজ। শ্যালকশ্যালিকাদের জন্য এই দিনে মোমবাতি, আতসবাজি, তারাবাতিসহ নানা ধরনের বাজি উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। মসজিদে মসজিদে বিশেষ নামাজ আদায়, আজিমপুর কবরস্থানে জিয়ারত ও ভিখিরীদের অর্থ দান ছিল ঐতিহ্যের আবশ্যিক অংশ। কিশোরযুবকেরাই আসলে বাজি ফোটাতো। দু’দলে বিভক্ত হয়ে পটকা বাজি দিয়ে একপক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বাজি ফাটিয়ে যুদ্ধযুদ্ধ খেলা খেলতো। কিশোরযুবকেরা নামাজের উছিলায় সারারাত ঘরের বাইরে থাকার অনুমতি পেয়ে দুষ্টুমি করে বেড়াতো। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যেমনি ঘরেমন্দিরেশ্মশানেসমাধিস্থলে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে উদযাপন করে শ্যামা পূজা বা কালী পূজা, ঠিক তারই আদলে পুরাতন ঢাকায় পালিত হতো শবেবরাত। ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান অনেক কিছুই এখন আর আগের মতো নেই। দ্রুততায় সবই একেএকে পাল্টে গেছে।

মুসলিমঅধ্যুষিত ইরাকে শবেবরাতের অভিজ্ঞতা এখানে স্মরণ করছি। শুরুতে আমার কর্মস্থল ছিল উত্তর ইরাকের কিরকুকে। সেখানেই প্রথম শবেবরাত পালন করেছিলাম। সরকারি ছুটি ছিল না। এদিনকে কেন্দ্র করে সেদেশে কোন আচারঅনুষ্ঠান দেখি নি। আরবীভাষী ইরাকী ও কুর্দিভাষী কুর্দিদের এই দিনটির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা তো রীতিমতো অবাক। দিনটি পালন তো দূরের কথা এর তাৎপর্য সম্পর্কেও ওরা অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আমাদের দেশের কিছু প্রবাসী কর্মজীবী মানুষ স্থানীয় এক মসজিদে মাগরিবএশার নামাজ আদায়ের পরও বিশেষ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ ছেড়ে নাযাবার কারণে মসজিদের কেয়ারটেকার তাদেরকে মসজিদ ত্যাগের বারংবার তাগিদ দিয়ে ব্যর্থ হয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে নামাজরত সবাইকে গ্রেফতার করে থানা হাজতে নিয়ে যায়। প্রবাসীদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেলে দূতাবাসের লোক ছুটে এসে পুলিশকে নানাভাবে বুঝিয়ে নামাজিদেরকে হাজত থেকে মুক্ত করে। আমাদের দেশের অধিক পবিত্র এই শবেবরাতের রাতকে বাগদাদসহ ইরাকের সর্বত্রে অন্য দিনগুলো থেকে কোনভাবেই পৃথক মনে হয় নি। ইরাকের শহরগুলোতে নাইটক্লাব, ক্যাসিনো, বার সবই খোলা দেখেছি, এই রাতে। ন্যূনতম ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে সেটা তো কল্পনারও অতীত।

সেকালে রোজার মাসের শুরুতেই পুরানো ঢাকার চেহারা বদলে যেতো। স্থানীয় ছোটবড় সকল হোটেলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত থাকতো কাপড়ের পর্দা টানানো, এখনও তা একই কায়দায় করে থাকে। দুপুরের পরপরই সড়কের পাশে ইফতার বানানোর হিড়িক পড়ে যেত। বিক্রি হতো রকমারী ইফতার। চক বাজারের ইফতারী পূর্বের ধারাবাহিকতায় আজও টিকে আছে। তবে মানের ক্ষেত্রে ধস নেমেছে, সবই এখন নিম্নমানের। আকর্ষণীয় সেই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ হতে বিভিন্ন নামের আকর্ষণে এখনও দূরদূরান্ত থেকে অনেকে ইফতারী কিনতে আসে। বিক্রিও হয় দেদার। তবে আগের কারিগরও নেই, স্বাদ ও মান পড়ে গেছে।

পুরানো ঢাকার ইফতার অতীতে যেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল আজও তেমনি আছে। ফলমূলমিষ্টি থেকে শুরু করে তেলেভাজা নানান পদের ইফতারের সাথে মুড়িভর্তা ছিল আবশ্যিক। পিঁয়াজু, ঘুঘনি, সুতা কাবাব, ফুলুরী, সর্ষে তেল মাখিয়ে মুড়ি মিশিয়ে বানানো মুড়িভর্তা আজও অতীতের ইফতারের ন্যায় আজও নিয়মিত মেন্যু হিসেবে স্থানীয়দের কাছে সমান জনপ্রিয়। মুড়িভর্তা ছাড়া ইফতার এরা ভাবতেই পারে না। ইফতারের সময়ে এখনও সাইরেন বাজে। অতীতে প্রতি রাতে তিন দফায় পর্যায়ক্রমে মসজিদ থেকে সাইরেন বাজানো হতো, এখনো হয়। এছাড়া রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর জন্য কিছু লোক উর্দু ভাষায় সুর করে করে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকতো। এরকম মানুষ এখনও আছে তবে সংখ্যায় কমেছে। ঈদের দিন ওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে অতীতের ন্যায় আজও বকশিস আদায় করে।

ঈদের পূর্বদিনকে স্থানীয়রা চাঁনরাত নামে অভিহিত করতো, এখনও করে। নতুন জামাই চাঁনরাতে শ্বশুর বাড়ি এসে সালাম করে সেলামী নিয়ে যেতো। রোজায় জামাইপক্ষ হতে যেমন কনেপক্ষ থেকেও তেমনি অঢেল ও রকমারী ইফতার বিনিময় হতো; এখনও হয়ে থাকে। নতুন জামাইবাড়িতে পাঠানো হতো ঈদ উপলক্ষে ঘিমোরগ, পোলাওর চাল, সেমাই, চিনিসহ বিভিন্ন কাঁচা খাদ্য; সেপ্রথা আজও আছে। আর্থিক অবস্থার হেরফেরে পরিমাণটা কমবেশী হয়ে থাকে এই যা।

এলাকায় ও মহল্লায় রোজায় গানের দল তৈরী করতো স্থানীয় যুবকেরা। ‘কাসিদা’ নামে খ্যাত এই গানের দলগুলো রাতে এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে উর্দু গান কোরাসে গেয়ে টাকা তুলতো। এখন এদের তেমন দেখা যায় না। ২৭ রোজার রাতে স্থানীয় মসজিদগুলোতে মুসুল্লীদের ভিড় উপচে পড়তো। এ দিনের বিশেষ নামাজ আদায় শেষে শুকনো কাঁঠাল পাতার তৈরি করা ‘দাওনা’ নামক বিশেষ ধরনের পাত্রে বিরিয়ানী বিতরণ করা হতো। মসজিদেআসা মুসুল্লীদের জন্য এবং একইভাবে প্রতিটি বাড়ির মহিলাদের জন্যও বিরিয়ানী পাঠানো হতো স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক যুবকদের দ্বারা।

চাঁনরাত মানেই পুরানো ঢাকার যুবকদের জন্য সংযম ও পবিত্রতার ইতি। এশার নামাজের পর রাস্তায় রাস্তায় স্থানীয় কিছু যুবকের মদ্যপানে মাতলামীখিস্তিতে চাঁনরাতের চেহারা হতো ভয়ঙ্কর। রাতে তারা কেউ বাসায় ফিরতো না, এদিক সেদিক পড়ে থাকতো। কাকভোরে বাসায় ফিরে নতুন জামাকাপড় পরে ঈদের নামাজে অংশ নিতো। ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, কিশোরকিশোরিরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করে সেলামী নেবার হিড়িক পড়ে যেতো। রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়া, চক বাজারের ঈদের মেলা দেখতে যাওয়া এবং নানান ধরনের খেলনাবাঁশি টুকিটাকি কিনে আনা ছিল কিশোর ও কৈশোরউত্তীর্ণদের ঈদ পালন।

দুপুরের পর বুড়িগঙ্গার পাকা সিঁড়ি ঘাটগুলোতে বসে স্থানীয় যুবকেরা তাস খেলতো। অনেকে দল বেঁধে রূপমহল, নাগরমহল, মুকুল, মানসী, তাজমহল, শাবিস্তান, লায়ন, স্টার, মুন, সিনেমা হলের দিকে ছুটতো লাহোরে নির্মিত ঈদেমুক্তিপাওয়া উর্দু ছবি দেখতে। সাবিহাসন্তোষ, মোহাম্মদ আলীজেবা, ওয়াহিদ মুরাদরানী, নীলো এসব পাকিস্তানী তারকারা ছিল স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয়। ঈদের দিনেও মাতালদের মাতলামী যত্রতত্র দেখা যেতো। রিকশাঘোড়াগাড়িতে করে দল বেঁধে দূরের আত্মীয় বাড়ি, হাইকোর্টস্থ বর্তমানের জাতীয় ঈদগাহ’র বিশাল স্থান জুড়ে ছিল ঢাকার চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানা দেখতে যাওয়া, এসব ছিল অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের বিনোদন।

ঈদের কেনাকাটার জন্য ছিল সদরঘাট, চকবাজার, ইসলামপুর আর নিউ মার্কেট। বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট ছিল বায়তুল মোকাররম মার্কেট। মার্কেটের সিংহভাগ দোকানের মালিক ছিল অবাঙালিরা। দূরত্বের কারণে পুরানো ঢাকার মানুষ সাধারণত বায়তুল মোকাররম মার্কেটে কেনাকাটা করতে যেতো না। কেনা সেমাইর প্রচলন সে আমলে ঢাকায় ছিল না; হাতেঘুরানো কলে ঈদের আগে বাড়িতে বাড়িতে সেমাই তৈরী হতো। রোদে শুকিয়ে হালকা আঁচে ভেজে সেসব তুলে রাখা হতো ঈদের অপেক্ষায়। ঈদের দিন ঘিচিনি, জর্দা রং দিয়ে রান্না করা হতো সেই সেমাই।

ঈদের দিন বিকেলে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো বুড়িগঙ্গার পারে ও পাকা ঘরের ছাদে। তখন একতলা বাড়িই ছিল সর্বাধিক। ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল যুৎসই, যেটা আজ আর সম্ভব নয়। চারদিকে তিনচারপাঁচছয় তলার ছড়াছড়িতে বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো বন্ধ হয়ে গেছে। একতলার ছাদ বেশী থাকায় সবাই একতলার ছাদে ঘুড়ি ওড়াতো, তাতে একটা সামঞ্জস্য থাকতো। উপরনীচ ছিল না। ঘুড়ি ওড়াতে আর ধরতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও প্রায় ঘটতো। মনে পড়ে, পাকিস্তান টিভি চালু হবার পর যাদের বাড়িতে টিভি ছিল সন্ধ্যার পর সবাই সেবাড়িতে টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে ভীড় করতো। এই টিভি দেখার মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটতো ঈদআনন্দের।

কোরবানীর ঈদ মূলত বিত্তবানদের আনন্দ উৎসব। সাধারণ মানুষের জন্য তা কখনো আনন্দের ছিল না। আজও নয়। কোরবানীর গরু কেনার ক্ষেত্রে আকার ও দামের একটা প্রতিযোগিতা ছিল, এখনও আছে। কে কত দামে কয়টি ও কত বড় গরু কিনেছে এ নিয়ে ছিল ঠাণ্ডা লড়াই। স্থানীয় আদি ঢাকাবাসী বিত্তবানেরা অনেকগুলো গরু কোরবানী দিতো। একটি গরু একা কোরবানী দেবার মতো মধ্যবিত্ত মানুষের তখন অভাব ছিল। আর স্থানীয়দের মধ্যে ভাগে কোরবানী দেবার কোনো রেওয়াজ অতীতের ন্যায় আজও নেই। স্থানীয়রা গরুর পায়ের হাঁটু থেকে নীচের অংশ ফেলে দিতো বুড়িগঙ্গা নদীতে। হাড় দিয়ে নেহারী খাবার প্রচলন তখন স্থানীয়দের মধ্যে ছিল না। ভারতের বিহার প্রদেশের বিহারিদের মাধ্যমেই পরবর্তীতে নেহারীর প্রচলন ঘটে। রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাট, গাবতলী, রমনা রেসকোর্স ময়দানে, হোসনী দালান সংলগ্ন মাঠে গরুর হাট বসতো। মীর কাদিমের সাদা গাভীর আকর্ষণকদর স্থানীয়দের কাছে পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি রয়েছে।

বাররবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে পুরানো ঢাকার প্রায় সবগুলো মসজিদে খাবার উৎসব বসতো। স্থানীয়দের চাঁদার টাকায় এবং বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তায় মসজিদেমসজিদে শিরনির আয়োজন করা হতো। একটি মসজিদে পনেরোবিশটি গরু আগের দিন বিকেলে জবাই করে সারারাত রান্না করে সকাল থেকে স্থানীয় পুরুষদের মসজিদে বসিয়ে খাওয়ানো হতো। পোলাও ও বুটের ডালের সঙ্গে গরুর মাংসের ভোজ মসজিদে লাইন করে বসে মাটির সানকিতে সবাই খেতো। মসজিদের মূল ফটকে স্থানীয়দের দেখে দেখে ভেতরে ঢোকানো হতো। অস্থানীয়দের জন্য ঢোকার সুযোগ ছিল না। কামরাঙ্গীর চরের প্রচুর মানুষ খাবারের জন্য ভীড় করতো, কিন্তু তাদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হতো। তারপরও প্রতিবারই তারা আসতো। কারো ভাগ্যে জুটতো, কারো ভাগ্যে জুটতো না। এখন অবশ্য বসেখাওয়ানোর বিশাল আয়োজনটা সবখানে নেই। দু’একটি এলাকার মসজিদেই কেবল চালু রয়েছে।

ধর্মীয় উৎসবপার্বণ ছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে বিয়ে, সুন্নতে খাৎনা, মেয়ের কান ফোঁড়ানী, আকিকা উপলক্ষে হতো সামাজিক অনুষ্ঠান। বিয়ের আগের দিন লগন অনুষ্ঠান হতো যা এখনকার গায়ে হলুদ নামে খ্যাত। কনে পক্ষের মেহমানদের জন্য আয়োজন করা হতো দুপুরে আর বর পক্ষের জন্য রাতে। ব্যান্ডপার্টি সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে বরসহ বরযাত্রী আসতো। দূরত্ব বেশী হলে ঘোড়াগাড়ি কিংবা রিকশায়। বর সাধারণত মসজিদে বসতো এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা মসজিদে সম্পন্ন করে তবেই কনের বাড়িতে যেতো।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে দাওয়াতিদের বাসায় রাতভর বানানো পরোটা ও মাংসের তরকারী টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পাঠানো হতো। যারা অনুষ্ঠানে কোন কারণে আসবে না তারা নাস্তা গ্রহণ করতোনা, যারা আসবে তারাই কেবল গ্রহণ করতো। নাস্তা নাপাঠালে আমন্ত্রিতরা অপমানবোধে দাওয়াতে আসতো না। দুপুরেই অনুষ্ঠান হতো বিধায় অনুষ্ঠানে আগতদের জন্য রাস্তায় টাকা সমেত আয়োজকদের পক্ষের কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। রিকশায় ও ঘোড়ার গাড়ি করে অতিথি আসার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়েথাকা ব্যক্তিটি গাড়ি ভাড়া চুকিয়ে মেহমানদের সাদরে গ্রহণ করতো। সব ধরনের অনুষ্ঠানেই আগত অতিথিদের গাড়ি ভাড়া আয়োজককে বহনের সামাজিক রীতি চালু ছিল। তবে যাবার বেলায় ভাড়া দেবার কিন্তু ব্যবস্থা ছিল না।

অনুষ্ঠান যার যার বাড়িতেই হতো। বাড়িতে স্থানসংকুলান না হলে আত্মীয়পড়শীদের বাড়ি ছিল। বাড়ির ছাদে ও গাছে মাইক বাজতো। মাইকবিহীন বিয়ে স্থানীয়দের ক্ষেত্রে ভাবাই যেতো না, তেমন বিয়েকে বোবা বিয়ে বলে উপহাস করা হতো। মাইকে বাজতো জনপ্রিয় হিন্দি ও উর্দু গান। স্থানীয়দের মধ্যে বাংলা গানের তেমন চল ছিল না। মোহাম্মদ রফি, সায়গল, শামসাদ বেগম, লতা, মুকেশ, নুরজাহান, মেহেদী হাসান প্রমুখ শিল্পীদের জনপ্রিয় গানের তোপে বিয়ে বাড়িতে কারো কথা কারো শোনার উপায়ই থাকতো না। বাড়ির ফটকে কলা গাছের এবং মূল সড়কের গলির মুখে কাপড়ের গেট বানানো, ত্রিকোণ রঙিন কাগজ কেটে দড়িতে লাগিয়ে গলিজুড়ে এপাশওপাশ বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া দুটোই ছিল রেওয়াজ। সব ধরনের অনুষ্ঠানের তিনচারপাঁচ দিন আগে ভাড়ায় আনা ঢোল বাজিয়ে মহিলারা গানবাজনা করতেন। সে গানগুলোও বাংলা নয় ছিল উর্দুহিন্দিতে। কমিউিনিটি সেন্টার তখন ছিল না। সাদা পোলাও আর গরুর মাংসের আলুতরকারির একমাত্র প্রচলন ছিল। তবে যারা সে সব খেতো না তাদের জন্য ছিল খাসির মাংসের ব্যবস্থা। মুরগির রোস্টরেজালার প্রচলন ছিল না। ফিরনীর মতো দেখতে তবে পাতলা, যাকে স্থানীয়রা ‘সেরবেরেন’ বলতো, তা খাবারের শেষে পরিবেশন করা হতো। পুরুষদের বিভিন্ন ব্রান্ডের সিগারেটপান আর মহিলাদের জন্য পান দেওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। সুন্নতে খাৎনা, আকিকা ও মেয়ের কান ফোঁড়ানী অনুষ্ঠানও ঘটা করে করা হতো। যার সুন্নতে খাৎনা তাকে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে শহর ঘুরানো হতো। প্রতিটি অনুষ্ঠানে আশপাশের মানুষের জীবন শব্দদূষণে ত্রাহি অবস্থা হলেও এ নিয়ে কেউ বাদপ্রতিবাদ করতো না। মাইকের শব্দে আশপাশের এলাকায় বিয়ের এবং অপরাপর অনুষ্ঠানের সংবাদ জানান হয়ে যেতো। এ সকল অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সব বয়সী স্থানীয়রা রঙ খেলতো, রঙেরঙে সয়লাব হয়ে যেতে ঘরবাড়িআঙ্গিনা ও আশপাশ। রঙ খেলাকে কেন্দ্র করে আনন্দ যেমন দেখা যেতো, পাশাপাশি ঘটতো নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও।

দিন বদলেছে। শিক্ষার প্রসার পুরান ঢাকার স্থানীয়দের মধ্যেও প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে। তাই পুরান ঢাকার আদি উৎসবসংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক উৎসবপার্বণই আর আগের মতো নেই। বদলে গেছে যুগ পরিবর্তনে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

x