পুরনো বৈষম্যগুলো আর কত

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
56

একদিকে এই সমাজের পুরুষেরা নারীর অধিকারের কথা বলছেন অন্যদিকে ছেলেকে বিয়ে করানোর সময় নারীকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে একাধিকবার একদল পুরুষের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিস্ফোরিত চোখে দেখছেন তার গায়ের রঙ কেমন- পায়ের রঙ কেমন? দেখছেন মাথার চুল লম্বা কিনা, হাতের আঙ্গুল- হাতের রেখা ঠিক আছে কিনা? দেখছেন পায়ের আঙ্গুল সব মাটিতে লাগে কি না?

সচেতনতাই আনন্দ আনে। আত্মশক্তি বাড়ায়। পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সাহস তৈরি করে। আর অসচেতনতা মানুষকে রাখে অন্ধকারের মধ্যে। রাখে ভয়ের মধ্যে। কিন্তু জানার পরও, সচেতন হওয়ার পরও যদি শিক্ষিত পুরুষ নারী নিগ্রহের মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলে তবে সেই শিক্ষিতকে কী বলা যায়? অথচ প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকা খুললে আমরা দেখি- শহরের আনাচে-কানাচে স্কুলছাত্রীর প্রতি ইভটিজিংসহ নানা ধরনের যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। ভাবতে ঘৃণা বোধ করি- এই ইতরদৌড়ে শিক্ষিত-অশিক্ষিত-অল্প শিক্ষিত-মূর্খ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে আছে বলে। তীব্র বেদনা অনুভব করি এই ভেবে যে অশিক্ষিত শ্রেণির কথা বাদই দিলাম কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষা লাভের পরও শহরের মানুষেরা (!) প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নারীর প্রতি কীভাবে সহিংস হয়ে উঠতে পারে? এধরনের অসুস্থ মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছেই। আমার আজকের লেখা নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের কয়েকটি বৈষম্যমূলক ও অন্যায় আক্রমণকে ঘিরেই।
কনে দেখার নামে: একদিকে এই সমাজের পুরুষেরা নারীর অধিকারের কথা বলছেন অন্যদিকে ছেলেকে বিয়ে করানোর সময় নারীকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে একাধিকবার একদল পুরুষের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিস্ফোরিত চোখে দেখছেন তার গায়ের রঙ কেমন- পায়ের রঙ কেমন? দেখছেন মাথার চুল লম্বা কিনা, হাতের আঙ্গুল- হাতের রেখা ঠিক আছে কিনা? দেখছেন পায়ের আঙ্গুল সব মাটিতে লাগে কি না? কখনো আবার গান গাইতে বলছেন, হেঁটে দেখাতে বলছেন, কিংবা কীভাবে বিয়ের পর হবু স্বামীর বাড়িতে কেনা দাসের মতো বাড়ির মুরব্বিদের সেবা করবে- তাও অগ্রিম জেনে নিচ্ছেন। এমনকি কখনো-কখনো এমন প্রশ্ন করছেন যা আবার নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে মধ্যযুগকেও হার মানায়। আর এভাবেই বিয়ের আগে নারীকে পণ্যের মতো বাজিয়ে দেখছে পুরুষতন্ত্র। অত:পর উপহারের নামে বিশাল অংকের যৌতুক হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বিয়ে নামক ‘সওদা’ সম্পন্ন করা হচ্ছে। শহরের চেয়ে গ্রামের এ চিত্র আরও করুণ। জীবন চলার পরতে-পরতে লিঙ্গ-বৈষম্যের বলি হওয়া নারী দিনদিন স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিচ্ছে এ পরিস্থিতিকে।
যৌতুকের শিকার নারী: প্রেমে সাড়া না দিলে কিংবা কোনো কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে বান্ধবীর মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে দিয়ে মুখ বিকৃত করে দেয়া আজকাল অপরাধীদের কাছে মামুলি ব্যাপার হয়ে উঠছে। যথেষ্ট যৌতুক নিয়ে বিয়ের পরও বাড়তি যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী রাজি না হলে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। মাঝেমাঝে ভাবি- রাজা রামমোহন রায় যে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলার নতুন জাগরণ ঘটিয়েছিলেন, সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের দিনেও কি তবে ছদ্মবেশে সেই সতীদাহ প্রথাই জারি রয়েছে?
মর্যাদাহীন নারী: ঘরের বাইরে, মিছিলে-মিটিংয়ে, টেলিভিশনে, টক-শোতে, পত্র-পত্রিকায় যতোই নারীর স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, নারী শিক্ষা বা নারীর মুক্তি নিয়ে কথা বলা হচ্ছে; নারীকে জীবন্ত দেবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে; কিন্তু ঘরের কোণে অনাদরে-অবহেলায়-উপেক্ষায় নারীকে মর্যাদাহীন করে রাখা হচ্ছে। এরচেয়ে বড় অসভ্যতা আর কী হতে পারে? কিন্তু এই অসভ্যতার সাথেই যেনো আমাদের সখ্য হয়ে গেছে। নারী ধর্ষিত হলেই সবার আগে তারই দোষ খোঁজা- এই পরিস্থিতিরই অনিবার্য পরিণতি বলে আমি মনে করি।
গতানুগতিক নারী’!: দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সংস্কৃতিও অনেকটা একইরকম। এখানে একজন আদর্শ নারীর তুলনা সবসময়েই করা হয়ে থাকে সীতা বা সতীর সঙ্গে। ‘সতী নারীর পতি’ বা এই ঘরানার বহু সিনেমা ও নাটক বাংলা ভাষা-ভাষি অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে। যেখানে দেখানো হয়েছে আদর্শ নারী বলতে সেই নারীকেই বোঝায়- যাঁরা ঘরে থাকবেন, কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাসা বা বাড়ির সব কাজ করে সবার পরে ঘুমুতে যাবেন। শরীর কিংবা মন খারাপ থাকলেও নারীকে এখানে সবসময় মুখে হাসি ধরে রাখতে হবে। নিজে সব কাজ করলেও খাওয়া-দাওয়ার পর্বটা সারতে হয় নারীকে সবার পরে। একই সাথে নারীকে পরিবারের সকল সদস্যের যত্ন ও সম্মানের প্রতি নিয়মিত নজর রাখতে হবে এবং বিদ্যমান সামাজিক কাঠামো ও (কু) সংস্কার মেনে চলতে হবে। যতোই শিক্ষিত হোক না কেনো স্বামীর পরিবারের প্রথা অনুযায়ী নারীকে চলতে হবে। অন্যায় বললেও মুরব্বিদের মুখের উপর চোখে চোখ রেখে কথা বলা যাবে না। সংসারে দ্বিগুণ শ্রম দিলেও তাঁদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার উপর তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়া হবে না। সন্তানের যত্নের প্রশ্নে যতো ভালো চাকরিই হোক না কেনো নারীকে তা ছেড়ে দিতে হবে। পুরুষ কিছু না করলেও তার কথাই আইন হবে সংসারে- এবং এটাই নিয়ম। নারীকে তা মেনে চলতে হবে।
নারীর প্রতি এসব বৈষম্য আর কত? কে দেবে উত্তর?

x