পুত্র সন্তানের মায়েদের কাছে খোলা চিঠি

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ
566

আমার এই চিঠিটা শুধুমাত্র ছেলে সন্তানের মায়েদের কাছে লেখা। যাদের সন্তানের বয়স শূন্য থেকে বারো, তেরো, চৌদ্দ…
যদিও টঘওঈঊঋ, ডঐঙ মতে আঠারো বছর পর্যন্ত সন্তানকে শিশু বলা যায়। তবে একজন মা এবং চিকিৎসক হিসেবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো বারো তেরো বছরেই একজন মানব শিশুর মানসিক গড়ন তৈরি হয়ে যায়।
মানব সন্তান হচ্ছে একতাল নরম মাটির দলার মতো। এই দলাটা মায়ের হাতেই প্রথমে পড়ে। মা যেমন ইচ্ছে তেমন সাইজ এন্ড শেপ দিতে পারে । জন্ম থেকে বারো তেরো বছর বয়স পর্যন্ত তাকে যা যা শেখানো, শোনানো, জানানো এবং দেখানো হয় তার প্রভাব সারাজীবন সন্তানের উপরে থেকে যায়। ঐটাই তার বেসিক হিউম্যান ক্রাইটেরিয়া।
তবে শুধু মা না, সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। যে পরিবারে সন্তান মা’কে অপমানিত হতে দেখে সেই পরিবারের সন্তানেরা মাকে সহ পৃথিবীর কোন নারীকেই সম্মান করতে শেখে না। আবার যে পরিবারের সন্তানেরা মা বাবার মধ্যে ব্যালেন্স সম্পর্ক দেখে বেড়ে ওঠে তারা নিজের জীবনে আসা সব মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে শেখে। আর যারা সিঙ্গেল প্যারেন্ট তাদেরকেও চেষ্টা করতে হবে কেন সংসার হলো না তা না ভেবে, সারাক্ষণ সেসব প্যাঁচাল না পেরে সন্তানকে একটা ংড়ঁহফ ভধসরষু বহারৎড়হসবহঃ দেবার। জরুরি না যে পরিবার তিনজনেই হতে হবে। দুজন সদস্যতেও দুর্দান্ত পরিবার হতে পারে। বিশ্বাস নাহলে আমার বাসায় নিমন্ত্রণ রইলো। এসে দেখে যাবেন।
মনে রাখবেন পৃথিবীর কোনো সন্তানই রোজ বাবা-মায়ের ঝগড়াঝাঁটি দেখতে পছন্দ করে না। তার থেকে অনেক বেটার অপশন হচ্ছে সন্তানকে সুস্থ পরিবেশ দেয়া। আর এর কোনটাই যদি আপনি করতে না পারেন তো প্লিজ বাচ্চা আনবেন না পৃথিবীতে।
সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার আগে প্রায় ৩৬ থেকে ৪২ সপ্তাহ মায়ের জরায়ুতে থাকে। মায়ের শরীরে একবিন্দু রক্ত থেকে একটু একটু করে মানুষের আকৃতি ধারণ করে তার শরীরটা। এই সময়ে মায়ের চিন্তা ধারণা, ভাবনাচিন্তা, আচার আচরন প্রভাব ফেলে সন্তানের উপর। তার মানে মায়ের পেটে থাকতেই সন্তানের মানসিক বিকাশ শুরু হয়ে যায়। আর এখানেই মায়ের মূল্য অমূল্য হয়ে ওঠে।
অনেক রোগী বলেন তিনি যখন কোরআন তেলোয়াত করেন বা পূজা করেন পেটের সন্তান একদম শান্ত থাকে। অনেকে বলেন অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে পেটের ভেতরের সন্তান কিক করে পেটে। যখন গান শোনেন সন্তান রিদমিক কিক করে ইত্যাদি। তারমানে জন্মের আগের থেকেই মায়ের সাথে সন্তানের কানেকশন তৈরি হয়ে যায়। মা-ই হচ্ছেন একজন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। এবং মা-ই একমাত্র মানুষ যে একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘসময় থাকেন। হিসেব নিকেশ না করেই যার সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই সন্তান লালন পালনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। বাবার থেকেও অনেক বেশী। সন্তান সুসন্তান হবে, না রেপিষ্ট হবে, না খুনি হবে তাও অনেকটাই নির্ভর করে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ, পরিবার তথা মায়ের উপর।
আজকাল রেপ করা এবং রেপ শেষে হত্যা করার মতো ভয়ংকর কাজগুলো এদেশে ডালভাত হয়ে গেছে। মূল কারণ অবশ্যই আইনের শাসন না থাকা।
দেখুন, আমাদের এই অসভ্য অসুস্থ সমাজ সব সময়ই রেপ ভিক্টিমেরই দোষ খোঁজে। পোশাকে, চলাফেরাতে সমস্যা ছিল এসব বলে। যুগ যুগ ধরে এই সমাজ মেয়েদেরকে ছোট দেখাতেই অভ্যস্ত। রেপ করল যে রেপিস্ট তাকে ঘেন্না না করে, তাকে পাপী না করে এই সমাজ নির্যাতিত মেয়েটির পোশাকের দোষ বের করে। নয় মাসের ডায়াপার পরা শিশুটির পোশাকও কি রেপ করতে প্রভাবিত করতে পারে, বলুন ?
আসলে সেক্স আর রেপ কিন্তু এক বিষয় না। সেক্স খুব স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল নিড। সুস্থ স্বাভাবিক সব মানুষেরই সেক্স, সেক্সুয়াল আর্জ থাকার কথা। কিন্তু রেপ তারাই করে যারা মানসিকভাবে অসুস্থ, বিকৃত রুচির এবং পর্ণো এডিকটেড, নিজে ছোটবেলায় এবিউজের শিকার হয়েছে, নেশা, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট, নতুন কিছু এক্সপিরিয়েন্স করার তাগিদ ইত্যাদি বহু কারণ আছে রেপের পেছনে। যথাযথ মানসিক চিকিৎসা এবং ফলোআপ, রিহ্যাবিলিটেশন, আইনের প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এদেরকে সুস্থ করা সম্ভব।
আজকাল ক্ষমতার দাপট দেখাতেও মানুষ রেপ করছে ! কারণ এরা সমাজ আইন কিচ্ছুর পরোয়া করে না, জানে বিচার হবে না। যা ইচ্ছা তাই করা যাবে।
এই রাষ্ট্রও কিছুতেই নিজের ব্যর্থতা অস্বীকার করতে পারে না এত এত রেপ ঘটার। রাষ্ট্র, সরকার, আইন প্রণয়নকারী সংস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এদেশের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে ষাট বছরের বৃদ্ধা নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
দেখুন, একজন রেপিষ্টের মা নিশ্চয়ই আমরা কেউ হতে চাইব না। পাবলিক হেলথে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করায় আমি ঢ়ৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব থিওরিতে বিশ্বাসী। বর্তমান সময়ে ঘটা ঘটনাগুলো যেন ভবিষ্যতে রিপিট না ঘটে সেজন্য এখন যারা আমরা মা তাদের অনেক কিছু করার আছে বলে আমার প্রবল বিশ্বাস। একদম ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। এর কোন শর্টকাট নেই। শুধু মুখে বলে না নিজেকে করে দেখাতে হবে যে মা বড়দের সম্মান করে, মা ভুল করলে স্বীকার করে, মা মিথ্যা বলে না, মা সরি বলে ইত্যাদি ।
ছোট থেকেই সন্তানকে শেখাবেন মানুষ তথা নারীকে সম্মান করতে হবে। সন্তান আকাশ থেকে টুপ করে পরে নাই, ডাস্টবিন থেকে, হাসপাতাল থেকে তাকে আমরা তুলে আনিনি। এসব রূপকথা আমাদের শিশুবেলায় চলতো। এখন অচল। বাচ্চারা এখন যথেষ্ট স্মার্ট। মায়েদেরকেও হতে হবে ফধসহ ংসধৎঃ.
মায়ের শরীরের ভেতরে সে ছিল। এই কথাটা বলে দেখুন। সন্তানের অটোমেটিক কান্নামাখা চোখ আপনি দেখতে পাবেন। সন্তান তখন প্রশ্ন করবে – মা, ও মা তোমার কষ্ট হতো না? আমার আহু জিজ্ঞেস করেছিল মা তুমি হাঁটতে কেমন করে এত বড় টামি নিয়ে ? হিসু করতে কষ্ট হতো না তোমার? ডাক্তার তোমার পেটটা কেটে ফেলল বলে ভ্যাঁ করে এই সেদিনও কাঁদল আমার তেরো বছরের ছেলেটা। আমার ছেলে জানে পিরিয়ড কোন নোংরা বিষয় না। পৃথিবীতে মানুষ জন্মানোর প্রসিডিউরের প্রধান অংশই হচ্ছে পিরিয়ড। যা মেয়েদের শরীরে হয়। মেয়েরা স্পেশাল।
পিরিয়ড শুধুই একটা ফিজিওলোজিক্যাল কন্ডিশন।
আরো কত প্রশ্ন আমার সন্তানের। কনডম কি ? স্পার্ম, সিমেন থেকে মাস্টারবেশন হয়ে লাভ লেটার সব শব্দগুলোই আসে তার কানে। স্কুলের বন্ধু, টিভি, ইন্টারনেট থেকে। সন্তানকে গ্যাজেট ব্যবহার করতে দিলে ঘরের এমন স্থানে দিন যেন চলাফেরার পথে আপনি লক্ষ করতে পারেন। গ্যাজেট এখন লেখাপড়ার জন্যই লাগে। তাই গ্যাজেট দিবেন না এ কথা আমি বলব না। তবে অবশ্যই নিয়মিত চেক করবেন।
নতুন কোন শব্দ পেলেই আমার ছেলে তা তার াড়পধনঁষধৎু ফরধৎু তে লিখে রাখে। পরে মাকে জিজ্ঞেস করে। চার পাঁচ বছর বয়স থেকে এটা তাকে অভ্যাস করিয়েছি। আমি চেয়েছি সমস্ত নতুন শব্দের অর্থ আমার সন্তান আমার কাছ থেকেই জানুক, স্কুলের বন্ধু, বড়ভাই, আত্মীয় বা চলার পথে ক্যানভাসারের থেকে না। আমি চেষ্টা করি সময় নিয়ে তার সব কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে, সব প্রশ্নের সত্য উত্তর দিতে তার বয়সোপোযোগী করে। আমার রোগীদের, হাসপাতালের গল্প, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, বন্ধু থেকে সবকিছুই আমি শেয়ার করি তার সাথে।
আমি আমার ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করিনি। লেখাপড়াও বাদ রাখিনি। সংসারটাও একহাতেই করছি। সন্তানের মা এবং বাবা, কখনোবা ভাই বোন এবং অবশ্যই বেষ্ট ফ্রেন্ড হয়ে দারুণ উপভোগ করে পালন করছি প্যারেন্টহুড। জানি না ভবিষ্যতে কি হবে। তবে আমি কনফিডেন্ট আমার সন্তান বিশাল জজ ব্যারিস্টার, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে না পারলেও একজন মানবিক মানুষ হবে ইনশাআল্লাহ। ওর স্কুল, ক্যারাটে ক্লাস, আমাদের আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী থেকে পরিচিত সবাইও এটা বলেন।
প্যারেন্টিং কোন জন্মগত বিষয় না। এটাও শিখতে হয়। যদিও আমাদের সমাজে এর প্রচলন নাই। লোকে ভাবে স্পার্ম আর ওভাম মিললেই বাবা মা হয়ে গেলাম।
মা হবার ঘটনাটা একটু একটু করে বয়সের সাথে মানিয়ে সন্তানকে বললে দেখবেন সন্তান পৃথিবীর তাবৎ মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করছে। আমি একদিন ঘুমানোর সময় দেখলাম আমার ছেলে আমার পায়ের নীচে একটা বালিস দিয়ে দিচ্ছে। সিজারের পর থেকে পায়ের নীচে বালিস না নিয়ে ঘুমালে কষ্ট হয় আমার। এ কথা জানার পর থেকে আমার আহ্‌ নাফের মায়ের কাফ মাসেলের নীচে বালিশ দিতে মিস হয় না কখনোই।
কন্যা সন্তানের মায়েদেরকে বলব – দেশের বর্তমান সময়ে কোন শিশুই নিরাপদ না। তারপরও কন্যা সন্তানের মা বাবাদের দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই। সন্তানকে ছোট থেকেই গুড টাচ ব্যাড টাচ চেনান। শেয়ারিং হোক বাচ্চার সাথে। সেলফ ডিফেন্স শেখান। জুডো, ক্যারাটের ক্লাশে ভর্তি করে দিন। আল্লাহ না করুক কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে বাচ্চাকে ব্লেইম করবেন না। বরং দ্রুত ডাক্তার/ কাউন্সিলরের কাছে নিবেন। এটা যে শুধুই একটা দুর্ঘটনা হাত পা কেটে যাবার মতো বিষয় সেটা বোঝাবেন। বাবু কিছুতেই দায়ী বা দোষী না এর জন্য। বরং যে মানুষটা এই নোংরা কাজটা করেছে সেই খারাপ। সৃষ্টিকর্তা তাকে পাপ দিবে বলুন। আইনের শাসন না পেলেও আইনের দ্বারস্থ হবেন। লুকানোর চেষ্টা করবেন না। তাতে সন্তানের মনে আরো খারাপ প্রভাব পড়বে।
সবশেষে ছেলে সন্তানের মায়েদেরকে বলব – ছেলে সন্তানের মা বলে গর্ববোধ করার বা নিশ্চিত হবার কিছু নেই। নিজের ছেলে সন্তানটি যেন ভবিষ্যতে রেপিস্ট না হয় সেজন্য তাকে তৈরি করুন। রেপ ভিক্টিম আর তার বাবা-মা দুর্ঘটনার শিকার মাত্র। তারা দোষী বা পাপী না। আর আমরা পুত্র সন্তানের মায়েরা হব রেপিস্টের মতো জঘন্য অপরাধের অপরাধীর মা, জন্মদাত্রী।
—ইতি,
এই সমাজের একজন পুত্র সন্তানের আতঙ্কিত মা।

x