পুতুল দ্বীপের গল্প

আরিফ রায়হান

বুধবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
28

‘আইল্যান্ড অব ডলস’ বা ‘পুতুলের দ্বীপ’। মেক্সিকোর জোচিমিলকোয় অবস্থিত আজব এই দ্বীপে দেখা মেলে শুধু পুতুল আর পুতুল। গাছে গাছে শত শত পুতুল দেখা গেলেও কোনটিই পুতুলের মতো সুন্দর নয়। এগুলোর চেহেরা অনেকটা বিকৃত, বীভৎস এবং ভয়ঙ্কর। দ্বীপটিতে একা কিছুক্ষণ থাকলে ঘুরে উঠবে মাথা, আবার কেউ কেউ পেয়ে থাকে ভয়। এ দ্বীপ নিয়ে প্রচলিত আছে নানা গল্প-কাহিনী। কেবল ভয় আর রহস্য ঘিরে রেখেছে দ্বীপটাকে।
১৯৩৬ সালের ঘটনা। ছায়াশীতল ওই দ্বীপে বসে পুতুল খেলছিল মেক্সিকান তিন শিশু। খেলতে খেলতে হঠাৎ এক শিশু নিখোঁজ হয়ে যায়। তখন এ দ্বীপের কেয়ারটেকার ডন জুলিয়ান সান্তানা ব্যারেরা শিশুটিকে দ্বীপের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে ভেসে যেতে দেখেন। শিশুটির সাথে ছিল একটা পুতুল। জুলিয়ান অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। শিশুটি মারা যাবার পর তার সাথে থাকা পুতুলটি একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখেন জুলিয়ান। ধারণা করা হয়, শিশুটির বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বা তাকে মনে রাখার জন্য এমন করতেন জুলিয়ান। এর পর থেকেই তিনি আমৃত্যু দ্বীপের বিভিন্ন গাছের ডালে ডালে শিশুটির স্মরণার্থে পুতুল ঝুলিয়ে রাখতেন জুলিয়ান। গাছে গাছে তাঁর পুতুল ঝুলিয়ে রাখার ব্যাপারে অনেকে মনে করে শিশুটিকে বাঁচাতে পারেননি বলে সেই অনুশোচনা থেকেই হয়ত জুলিয়ান এমন করতেন। আবার অনেকের মতে, ছোট্ট শিশুটির অতৃপ্ত আত্মা হয়তো ভর করেছিল জুলিয়ানের ওপর। তবে কেউ কখনো জানতে পারেনি ভেসে যাওয়া শিশুটির পরিচয়।
জুলিয়ান বলেছেন, দ্বীপে আবাস গড়ে তোলার পর থেকে মৃত শিশুটির প্রেতাত্মার সঙ্গে তাঁর দেখা হতে থাকে। শিশুটি প্রায়ই এসে পুতুলের জন্য বায়না ধরত। তবে তা সাধারণ কোনো পুতুল নয়, বিকৃত পুতুল। দেখলে যেন মনে হয় মানুষের নির্মমতায় সেটা বিকৃত হয়েছে। ওই প্রেতাত্মার অনুরোধেই যাজক সবজির চাষ বন্ধ করে দেন। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নোংরা ও বিকৃত পুতুল জোগাড় করতে থাকেন। সেগুলো গাছে গাছে পেরেক মেরে আটকে দিতেন। কোনো কোনোটি রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়েও দিতেন। এভাবে গোটা দ্বীপ পুতুলে ভরে ওঠে। ওই দ্বীপটা হয়ে যায় ‘পুতুলের দ্বীপ’। জুলিয়ানের ভাষ্য, এভাবে পুতুল দিয়ে দ্বীপটি ভরিয়ে তোলায় ওই শিশুর প্রেতাত্মা খুশি হয়েছে।
২০০১ সালের ২১ এপ্রিল ওই দ্বীপে ঘটে এক ভয়ানক ঘটনা। সেদিন জুলিয়ান তাঁর ভাগ্নেকে নিয়ে দ্বীপটির সেই অপয়া খালে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ জুলিয়ান তাঁর ভাগ্নেকে বলে ওঠেন, পানির নিচ থেকে কারা যেন তাঁকে ডাকছে। জুলিয়ানকে পানির নিচে যেতে বলছে তারা। এর কিছু দিন পর ওই খালের পানির নিচ থেকে জুলিয়ানের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার লাশ পাওয়া যায় ঠিক সেই যায়গায় যেখানে ছোট্ট শিশুটিকে পেয়েছিলেন জুলিয়ান। তার মৃত্যুর পর এ দ্বীপের রহস্য আরও বেড়ে যায়। এরপর থেকে দ্বীপটিতে গাছে গাছে পুতুল ঝুলিয়ে আসছে এ দ্বীপের মানুষ। অসংখ্য পুতুল ছড়িয়ে রয়েছে এ দ্বীপজুড়ে। তবে এর আগে ৯৯০ সালে মেক্সিকান সরকার দ্বীপটিকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ বলে ঘোষণা করে। সরকারের লক্ষ্য ছিল দ্বীপটিতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা। কিন্তু অদ্ভুত পুতুলগুলো পর্যটকদের টানতে পারেনি।

x