পিস ফাইন্ডার ও রামীমের প্রতিবন্ধী প্রেম

ছোটন কান্তি নাথ : চকরিয়া

সোমবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৮ at ৩:৪৩ অপরাহ্ণ
9

মানবতার সেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় কাজ করছেন কঙবাজারের চকরিয়ার ব্যতিক্রমী সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিস ফাইন্ডার। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আদনান রামীমের বেশকিছু মানবিক কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো, পথশিশুদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়া, রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ আরো অনেক কাজের মাধ্যমে রামীম এগিয়ে নিচ্ছে প্রাণের সংগঠন পিস ফাইন্ডারকে। রামীমের সমাজ পরিবর্তনের এসব কাজ দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন অনেকেই।
কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মাতামুহুরী নদীতীরের সুশীলপাড়ার শিশু অনিক সুশীল। জন্মের পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিল সে। কিন্তু বয়স যখন সাতবছরে তখন থেকেই শিশুটি পা দাবিয়ে হাটতে শুরু করে। প্রথমদিকে এনিয়ে বাবা রনধীর সুশীল ও মা বাপ্পী রাণী সুশীল হতচকিত না হলেও যখন সন্তানের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায় তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।
শিশুটির মা বাপ্পী রাণী সুশীল জানান, এখানে-ওখানে বেশ কয়েকজন ডাক্তারকে দেখানোর পরও অনিকের কোন উন্নতিই হচ্ছিল না।এই অবস্থায় চট্টগ্রামের একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে গেলে রক্তসহ কয়েকটি পরীক্ষার পর নিশ্চিত হন তাদের সন্তান দূরারোগ্য মাসকুলার এট্রপি ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। এই কথা শোনার পর তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতোই অবস্থা। এর পর থেকে শিশুটি বাড়িতেই থেকে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করছে। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে।
মা বাপ্পী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমার সন্তান একটি হুইল চেয়ারের অভাবে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছিল না। এতে তার পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তবে আজ থেকে শিশুটি হুইল চেয়ারে চেপে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে। কেননা আমার সন্তানকে আজ হুইল চেয়ার দিয়েছে পিস ফাইন্ডার। এজন্য আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, যারা আমার সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের যাতে মঙ্গল হয়।’
সম্প্রতি শিশু অনিকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হুইল চেয়ারটি হস্তান্তর করা হয়। ‘শান্তিতে আমরা সবার পাশে’ স্লোগানে আর্ত-মানবতার সেবায় নিয়োজিত ‘পিস ফাইন্ডার’ নামক সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই মহৎ কাজটি করেছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চকরিয়া প্রেসক্লাবের কার্যকরী সভাপতি ছোটন কান্তি নাথ, পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজকর্মী আদনান রামীম, টিআইবির সদস্য জিয়াউদ্দিন জিয়া, মাহফুজুল আলম, তাওহীদ শিমুল, নাজমুল হাসান লিটন, সুমন দাশ, নকিবুল মাওলা, জুয়েল সুশীল, মোহাম্মদ সেলিম ও আবসার মাহমুদ প্রমুখ।
পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা আদনান রামীম দৈনিক আজাদীকে জানান, শিশু অনিক নয় শুধু, এ পর্যন্ত ২১ জন প্রতিবন্ধীকে এই হুইল চেয়ার প্রদান করা হয়েছে। যারা হুইল চেয়ার পেয়েছেন তারা সকলেই খুঁজে পেয়েছেন জীবনের দিশা।
সমাজকর্মী রামীম আরো জানান, তাঁর বাবা আলীকদম উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফর চৌধুরী পক্ষাগাতগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন। পরবর্তীতে তিনি মারা গেলে চেয়ারটি বাড়িতেই পড়েছিল। তাই সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য দূর, তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতায় ২০১৪ সাল থেকে পিস ফাইন্ডার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াই। উপলব্ধি করি একজন প্রতিবন্ধীর জন্য হুইল চেয়ার কেন প্রয়োজন। সেই তাগিদেই এই পর্যন্ত ২১টি হুইল চেয়ার প্রদান করেছি। তন্মধ্যে কাকারার জলদাস পাড়ার প্রতিবন্ধী বঙ্কিম জলদাসকে হুইল চেয়ার প্রদান এবং তার স্ত্রীকে সেলাই মেশিন প্রদান করি। মূলতঃ ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে কর্মজীবনে ফিরতে প্রতিবন্ধী পুরুষের পাশাপাশি তাদের স্ত্রীকেও সেলাই মেশিন প্রদান করি।
এসব সামগ্রী প্রদানের জন্য অর্থায়ন কোথা থেকে হচ্ছে জানতে চাইলে, রামীম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পিস ফাইন্ডার’র নামে একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। ওই পেজে তরুণ এবং বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পিস ফাইন্ডারের সদস্য, তাদের আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষিসহ সমাজের বিত্তবান এবং প্রবাসীরাও এই সহায়তা প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করে। এভাবেই প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে পিস ফাইন্ডার।
চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী পিস ফাইন্ডারের এমন উদ্যোগ দেখে বেশ খুশি। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আসলে আমাদের তরুণরাই এই সমাজকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে। যার দৃষ্টান্ত উদাহরণ আদনান রামীম। আজ রামীম ও পিস ফাইন্ডার পরিবারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চকরিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার অসংখ্য প্রতিবন্ধী শিশু, নারী-পুরুষ দিশা পেয়েছে। এই সংগঠন যাতে ভবিষ্যতে আরো ভালো ভালো কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে সেজন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির শুভাকাঙ্ক্ষি ব্যাংকার দেলোয়ার হোসাইন ও আবুল মাসরুর আহমদ বলেন, ‘পিস ফাইন্ডারের সমাজ পরিবর্তন ও মানবতাবাদী প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে নিজেরা জড়িয়ে থাকি।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) চকরিয়ার সদস্য জিয়াউদ্দিন জিয়া দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘প্রতিটি এলাকায় বা সমাজে যদি ব্যক্তি রামীম এবং পিস ফাইন্ডারের মতো সংগঠন থাকে তাহলে মানবতা, দেশপ্রেম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা কাকে বলে তার প্রকৃষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আমি আশা করবো, বিত্তবান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতায় যারা নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রেখে মানবতার পাশে দাঁড়াতে চান তারা এ ধরণের মানবিক কাজ নিয়ে এগিয়ে যাবেন। এতে সমাজ তথা অবহেলিত জনগোষ্ঠী এগিয়ে যাবে।’

x