পায়ে পায়ে হিমাচল

জান্নাতুল উর্মি

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
113

ভারতবর্ষের উত্তরে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশ। মূলত উত্তরের দিকে গেলে হিমালয় রেঞ্জটা সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায়। ওয়েস্ট বেঙ্গলের পাহাড়গুলো সমতল ঘেঁষা। আর উত্তরের পাহাড়গুলো একেকটা দৈত্যের মতো যেন খাড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। পুরোপুরি এডভেঞ্চারের লক্ষ্যে আমরা সাথে করে টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ,ওয়াকিং স্টিক এবং আরো আনুষাঙ্গিক সব ট্রেকিং সামগ্রী কলকাতার মহাত্মা গান্ধী রোডে অবস্থিত ubac থেকে ভাড়া নিয়েছিলাম। ২৩ জুন বিকেলে শিয়ালদা থেকে দুরন্ত এক্সপ্রেসে করে আমরা প্রথমে রওনা দিলাম দিল্লীর উদ্দেশ্যে। দুর্ভাগ্যবশত ট্রেনটা দিল্লী পৌঁছায় বেশ দেরীতে। তাই ওই দিন দিল্লী ঘোরাটা আর হয়ে উঠল না। আগে থেকেই বুক করা ভলবো বাসে করে বিকেল বেলায় দিল্লী থেকে মানালির উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। একে একে পেরিয়ে গেলাম পানিপথ, কুরুক্ষেত্র, আমবালা, চন্ডিগড়। সন্ধ্যা হতেই ক্লান্তিতে চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো। রাতের দিকে পাঞ্জাবী এক ধাবায় গাড়িটা থামালে তড়কা, তান্দুরী, আচারসহ বিভিন্ন পাঞ্জাবী রেসিপি দিয়ে ডিনার সারা হলো। তারপর আবার পথ চলা। রাস্তা যেন ফুরোচ্ছেই না। মধ্যরাতে হঠাৎ করে ঘুমটা ভাঙ্গতেই চোখ খুলে দেখা গেল যে সমতল থেকে আমরা অলরেডি পাহাড়ে উঠে গেছি। আকাশের গায়ে মিটিমিটি আলো জ্বলে। প্রথমে তারা ভেবেছিলাম। পরে ভালো করে খেয়াল করে দেখতেই বুঝলাম যে ওগুলো আসলে পাহাড়ের গায়ে জনবসতি।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গতেই দেখলাম আমাদের যাত্রায় যুক্ত হয়েছে আরো এক সহযাত্রী। সে-এক অদ্ভুত সুন্দর খরস্রোতা নদী যার নাম পার্বতী। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে পার্বতী-নালা। সকালবেলা বাসটা আমাদের নামিয়ে দিলো ‘ভুন্টার’ নামক এক ছোট্ট পার্বত্য শহরে। এখান থেকে আমাদের গন্তব্য কাসোল এবং সেখানেই রাত্রীবাস। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর একটা গাড়ি বুক করা গেল। মাঝে একটা ছোট ধাবায় একটু ফ্রেশ হওয়া ও হালকা নাস্তা সেরে নেওয়া। কাসোল এক অদ্ভুত শহর। সেখানে ইন্ডিয়ানদের থকে ইসরাইলের মানুষের বসতি বেশি। গোটা শহরে পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানারকম ক্যাফে রয়েছে।
কাসোল শহরটাকে মাঝখান দিয়ে চিরে চলে গেছে ভয়ংকর খরস্রোতা পার্বতী নদী। পাহাড়ের গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে সেই নদী যেন কোনো এক মোটা বুনো মোষের মতো ফুঁসছে। আর স্রোতের সেই শো শো শব্দে পাশের লোকের কথাও সবসময় বোধগম্য হয় না। আমাদের দলের নেতা অভীক ভাইয়ের আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো কাসোলে না থেকে নদীর ওপারে পাইনের বন ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম ‘চালাল’-এ থাকার। প্ল্যান মোতাবেক গাড়ি থেকে নেমে রুকসেকটা কাঁধে নিয়ে আমাদের প্রথম ট্রেকিং শুরু।
কাসোল থেকে চালাল যাওয়ার পথে পেরুতে হয় পার্বতী নদী। নদীর উপর দিয়ে একটা ব্রীজ রয়েছে যেখানে মাত্র একজন মানুষ উঠলেই সামনে থেকে পিছনে ভয়ংকর ভাবে দুলতে শুরু করে। যেন ফেলেই দিবে নদীতে! কোনোরকমে ধীরে ধীরে ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সেই ব্রীজ ক্রস করলাম। শুরু হলো নদীর একদম ধার ঘেঁষে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এক উঁচু নিচু পাহাড়ী রাস্তা। আধঘন্টা হাঁটার পর আমরা গিয়ে পৌঁছলাম একটা খোলা প্রান্তরে। চারপাশটা জঙ্গলে ঘেরা মাঝে একটা ছোট্ট মাঠ আর পাশেই পার্বতী নদী। সেখানেই বিভিন্ন দেশ থেকে আগত নানান ধর্মের নানান বর্ণেও মানুষ। তাঁবু খাটিয়ে প্রকৃতি উপভোগ করছে।
পার্বতী নদীর অবিশ্রান্ত বহমানতা আমাদের দুদিনের পথক্লান্তি ধুয়েমুছে এতক্ষণে বোধহয় মোহনায় নিয়ে গিয়ে মিশিয়ে দিয়েছে। ব্যাগটা নামিয়ে একটু বসতেই হাতে ৪/৫ রকমের তেলের শিশি নিয়ে হাজির হলো এক মালিশওয়ালা। জার্নিতে ক্লান্ত সকলের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত মালিশ করা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আগে থেকে অনেক তাবু খাটানো ছিলো বলে আমরা সেদিন তাঁবু খাটানোর জায়গা পেলাম না। গিয়ে উঠলাম ওখানকারই একটা ছোট হোম স্টে-তে। নাওয়া-খাওয়া সেরে নিয়ে সবাই মিলে বসলাম পার্বতী নদীর ধারের পাথরের উপর। কিছুক্ষণ বসার পর সবার আবদারে উঠে শুরু হলো পাথুরে জঙ্গলের মধ্যে এলোমেলো হাঁটা। পার্বতী নদী কিন্তু এখানেও পিছু ছাড়ে নি। নিরন্তর আমাদের পাশে থেকে তার সশব্দ উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে। সেদিন আর বিশেষ কিছু কাজ না থাকায় আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম কাসোল শহরে। যথারীতি আমাদের দলের শ্রেয়া আগে থেকে জেনে গিয়েছিলো ‘জিম মরিসন ক্যাফে’-র কথা। একে ওকে জিজ্ঞেস করে সন্ধ্যায় গিয়ে পৌঁছলাম পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত সেই ক্যাফেতে। ক্যাফেটা মুলত একটা লম্বা হলের মতো যেখানে কোনো চেয়ার-টেবিল নেই। মাটিতে গদি পেতে তাকিয়া দিয়ে বসার ব্যবস্থা আর সামনে কিছু নিচু নিচু টেবিল। ক্যাফেতে ঢুকেই Albert Hughes এর ডিরেকশনে Jhonny Deep অভিনীত সিনেমা From hell এ দেখা সেই ক্যাফের কথা মনে পড়লো। অল্প কিছু খাবার খেয়ে কাসোল শহরটা ঘুরে টুকটাক কেনাকাটা করে রাতের বেলা আবার ফিরে এলাম চালালে। যদিও ঘরে ঢুকলাম না। গিয়ে বসলাম জঙ্গলের পাশে একটা পাথরের উপর। গানে গল্পে আড্ডা জমে উঠল। রাত আরো গভীর হতেই দলনেতার আদেশে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফিরে যেতে হলো ঘরে। কারণ পরদিন কাসোলকে পেছনে ফেলে অনেকটা ট্রেক করে আমাদের যেতে হবে তোষ বলে একটা পাহাড়ী গ্রামে। যেখানে তাবু খেটে ক্যাম্প ফায়ার করব বলে ঠিক করে রেখেছি।

কাসোল থেকে তোষ যেতে হলে গাড়ি নিয়ে বারসেনি বলে একটা জায়গায় যেতে হয়। বারসেনি থেকে শুরু হয় তোষ পর্যন্ত একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ট্রেক; আমাদের আজকের গন্তব্য। তোষ যাওয়ার লক্ষ্যে আমরা চালাল থেকে বেরুলাম সকাল ১১ টা নাগাদ, যা কিনা একটু দেরি বলা চলে। চালাল থেকে পার্বতী নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে আবার কাসোল পর্যন্ত পৌঁছে গাড়ি বুক করতে গিয়ে দেখা গেল একটাও গাড়ি নেই সেদিন। বুঝলাম আমাদের অতটা দেরি করে বেরুনো উচিৎ হয়নি। স্থানীয় লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানলাম যে একটা বাস যায় কাসোল অবধি। কিন্তু পিঠে টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ সহ ভারী রুকসেক নিয়ে ভিড় বাসে ওঠার থেকে ৪ কিলোমিটার হেঁটে ‘মনিকরণ’ চলে যাওয়াই শ্রেয় বলে মনে করলাম আমরা। হাঁটা শুরু হলো মনিকরণের উদ্দেশ্যে- ওখান থেকে গাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সাধারণ পিচ রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হিমাচলের চড়া আর গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত সূর্যের উত্তাপ বেশ ভালোই মালুম হচ্ছিলো।
মনিকরণ একটা ছোট্ট জনপদ, কাসোল থেকে বারসেনি যাওয়ার পথে পড়ে। ‘শিখদের’ কাছে মনিকরণের স্থান মাহাত্ম প্রচুর। এখানে রয়েছে একটি গুরুদ্বুয়ারা এবং একটি লঙ্গরখানা; যেখানে বিনা পয়সায় প্রত্যেকদিন সকল দর্শনার্থীদদের খাওয়ানো হয়। পার্বতী নদীর স্রোত এখানে এতই ভয়ংকর যে ১০০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও জলকণা এসে ভিজিয়ে দিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। সমগ্র গুরুদ্বুয়ারা আর লঙ্গরখানাটি অদ্ভুতভাবে পার্বতীনদীর উপর যেন ঝুলে আছে, এমনই তার সা্থপত্যের মাহাত্ন। মনিকরণ পৌঁছে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা অবশেষে শেয়ারে একটা গাড়ি পেলাম; যা কিনা আমাদের বারসেনি নয় একেবারে তোষ পর্যন্তই পৌঁছে দেবে। ৪ কিমি ট্রেক করে ক্লান্ত সকলে সেই প্রস্তাবে সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম।
পাহাড়ি পিচ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ করে শুরু হলো ভাঙ্গাচোরা ধুলা ওঠা একটা রাস্তা -যা তোষের দিকে খাড়া উঠে গেছে। তোষে পৌঁছে চারপাশে বেশকিছু বাড়ি আর হোটেল দেখে মনটা দমে গেল আমাদের। শহর থেকে পাহাড়ে শান্তির খোঁজে এসে এখানেও দেখছি একই অবস্থা! স্থানীয় লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানলাম যে তোষ থেকে একটা সরু রাস্তা ধরে আরো চার কিমি উপরে উঠে গেলে পাওয়া যাবে ‘কুটলা’ বলে একটি জায়াগা- কুটলায় তাঁবু খাটানোর জায়গা এবং জলের উৎস দুইই আছে। তথ্য হিসেবে জানিয়ে রাখি – তাবু সেখানেই খাটানো উচিৎ যার পাশে জলের উৎস আছে। সামান্য চা বিরতির পর শুরু হলো কুটলার দিকে আমাদের হাঁটা। চায়ের প্রসঙ্গে বলে রাখি সাধারণত চায়ের দোকানে যে পরিমাণ চা খেতে আমরা অভ্যস্ত এখানে কিন্তু সেই হিসেবটা চলে না। এখানে চা দেয় একটা বিশাল বড় গ্লাসে করে ; যা একা একজনের খেতে যথেষ্ট বেগ পোহাতে হয়।
আরো অনেক হিসেবই এখানে মেলে না – যেমন সময়। কুটলা পর্যন্ত হাঁটতে গিয়ে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। অসম্ভব খাড়া একটা সরু পাহাড়ি রাস্তা, সেই সাথে বাঁকে বাঁকে পাহাড় আর মেঘের অপরূপ রহস্যের খেলা। সেই রাস্তা ধরে কুটলার উদ্দেশ্যে হাঁটা যেন আমাদের আর ফুরায় না! দূরে বরফ ঢাকা পাহাড় পথের ক্লান্তি কিছুটা ভুলিয়ে দিতে সক্ষম হলেও তা নিতান্তই ‘কিছুটা’। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা স্থানীয় লোকজনদের যতবারই জিজ্ঞেস করা হয় কুটলার দুরত্বের কথা, তারা একগাল সরল হাসি হেসে ততবারই উত্তর দেয় ‘অউর পনের মিনিট’। কিন্তু সেই পনের মিনিট, প্রতি পনের মিনিট অন্তর অন্তর আরো পনের মিনিট করে বেড়ে যায়।
অবশেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ( অনেক উচ্চতায় আছি বলে সাড়ে সাতটাতেও এখানে বিকেল চারটার মতো আলো) দেখতে পেলাম একটা ক্ষীণ জলধারা। বুঝতে পারলাম প্রায় এসে পড়েছি। আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই সেই ক্ষীণ তটিনী ক্রমশ পরিপুষ্ট হয়ে উঠলো। নদীর ধারে কিছুটা বিস্তৃত ঘাসে ঢাকা জমির উপর একটা ছোট দোকান – আমাদের আজকের ক্যাম্প-সাইট। সকলে হাত লাগিয়ে এখানেই অনেক মজা করে তাঁবু খাটালাম আমরা। চারপাশের খাড়া পাহাড় আমাদের ঘিরে আছে। সন্ধ্যার হাত ধরে কুয়াশা নেমে আসছে ঢাল বেয়ে। এরকম পরিবেশে একটা তাঁবু অনেক স্টার হোটেলকেও হার মানায়।
ভোর হতে চলল। পাহাড়ের ওপারে উঁকিঝুঁকি মারছে লাল রং। তাঁবুর বাইরে এসে সবুজের মাঝে প্রাণভরে নি:শ্বাস নিলাম। হঠাৎ হ্রেষা ধ্বনিতে চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি – পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পালে পালে নেমে আসছে কিছু তৃষ্ণার্ত ঘোড়া। আশেপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করতেই সূর্য তার অস্তিত্ব জানান দিলো। বেলা একটু বাড়তেই সবাই আস্তে আস্তে উঠে পড়ল। হাতে ব্রাশটা নিয়ে আর গলায় গামছা ঝুলিয়ে নিচে নামলাম জলের সন্ধানে। ফাল্গু ধারার মতো পাথরের গায়ে ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে বয়ে চলেছে নাম না জানা কোন এক পাহাড়ী নদী। সেই নদীর বরফ শীতল জল মুখে চোখে ঝাপটে হাঁটতে লাগলাম চায়ের খোঁজে। কাছের ছোট্ট একটা দোকানে হালকা নাস্তা সেরে নিয়ে গুছাতে শুরু করলাম। এবার বেড়িয়ে পড়তে হবে। বেশি দেরি হলে কোনো যানবাহন পাওয়া যাবে না আর। হাতের স্টিকটাকে শক্ত করে ধরে আস্তে আস্তে প্রথমে পার হলাম একটা কাঠের সাঁকো। তারপর আবার উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা। ধীরে ধীরে কুটলা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো। প্রায় আধঘন্টা ট্রেকিং করে তোষে এসে একটা গাড়ি বুক করা হলো- উদ্দেশ্য মালানা।
তোষ থেকে মালানা গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৪৪ কিলোমিটার। বারসেনি, মনিকরন, কাসোল হয়ে ভুন্টারে যাওয়ার আগেই একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে মালানার দিকে।আগেই বলেছিলাম মনিকরনে প্রতিদিনই প্রচুর দর্শনার্থীদের ভিড় হয়। অনেক দূর দুরান্ত থেকে লোকজন গাড়ি নিয়ে আসে পূণ্যস্থান দর্শনে। প্রায় পাঁচ কিমি রাস্তা জুড়ে জ্যাম ছিলো সেদিন। পথে গাড়ি থামিয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে আবার পাহাড়ের খাঁজে পিচ ঢালা রাস্তায় আমাদের ছুটে চলা। দুই ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের পথকষ্ট ভুলিয়ে দিয়ে এক নৈসর্গিক ভালো লাগায় ভাসিয়ে দিলো। বিরাট উঁচু আর খাড়া খাড়া পাহাড়গুলো যেন প্রাগৈতিহাসিক কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। একের পর এক রুক্ষ রুক্ষ দৈত্যাকৃতির পাহাড়গুলো যেন নিপুণ যত্নে কেউ প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে নিস্তব্ধতার জয়গান গাইতে! গাড়িতে তখন Pink Floyd-র Coming back to life চলছে। গাড়ি যতই উপরের দিকে উঠছে রাস্তা একেকবার করে বাঁক নিচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছিল আর একটু এগিয়ে গেলেই দূরের ওই সাদা সাদা আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলো ছুঁতে পারবো! হাতে ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও সেই স্বর্গীয় বিকেলের ছবি তুলতে যেন ভুলেই গিয়েছিলাম! মনে হচ্ছিলো চোখের চাইতে বড় ক্যামেরা আর কি হতে পারে!

প্রায় পাঁচ ঘন্টা জার্নি করে আমরা মালানা গ্রামের অদূরে পৌঁছালাম। সন্ধ্যা হবো হবো করছে। অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলার প্রবল সম্ভাবনা। এখন আর সম্ভব নয় ট্রেক করে মালানা গ্রামে পৌঁছানো। একটি মাত্র হোম স্টে রয়েছে রাস্তার পাশেই-ম্যাজিক ভ্যালি হোম স্টে। আজকের রাতটা এখানেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। রুকসেক কাঁধে ক্লান্ত শরীরটাকে আলগোছে গাড়ি থেকে বের করে রাত্রিবাসের আয়োজন শুরু করলাম। সন্ধ্যার আলো মেখে মালানার মায়াবী পথ রহস্যময় বাঁক নিয়ে নিয়ে উঠে গেছে সামনের পাহাড় বেয়ে।অপেক্ষা শুধু আজকের রাতটা।
মালানা গাঁও মে কিসি কো মাত ছুনা। নেহি তো ফাইন লাগেগি’ – কথাটা বলে মুচকি হেসে আমাদের বিদায় জানালো ম্যাজিক ভ্যালি হোমস্টের মালিক। সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার… ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে ক্রমাগত। তার মধ্যে আবার পিছল সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পরে গেল আমাদের ব্যস্তবাগীশ দিপু ভাইয়া। এই কয়েকদিনের রোদ ঝলমলে পরিবেশ আর আজ তার অকস্মাৎ পরিবর্তন। টংলু ট্রেকে যেমন মুহুর্মুহু সাদা মেঘ এসে আমাদের ঘিরে ধরছিল, ঠিক সেইরকম মেঘ আজ পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাসা বেঁধে রহস্যময় মালানা গ্রামের রহস্যময়তা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কিছুটা নেমে ছোট্ট একটা পাহাড়ি নদী পেরিয়ে আজ আমাদের শুধুই ওপরের দিকে ওঠা আর ওঠা। মালানা, ভারতের মধ্যে থেকেও কোথাও না কোথাও ভারতের বাইরেই মনে হয়। ভারত সরকারের কোন আইন-কানুন, নিয়ম এখানে চলে না। মালানাবাসীদের আইন-কানুন, নিয়ম, সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছেদ এমনকি ভাষা পর্যন্ত এই অঞ্চলের অন্য সমস্ত গ্রামের থেকে স্বতন্ত্র। কথিত আছে, অ্যালেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করে ফিরে যান, তখন তাঁর কিছু সৈন্যদল এখানে থেকে গেছিলো। তাঁদেরই বংশধর আজকের এই মালানাবাসীরা। বিশুদ্ধ গ্রীক-আর্য রক্ত বইছে তাদের ধমনীতে। সেই কারণেই এরা বাইরের কোনো মানুষকে নিজেদের এমনকি নিজেদের বাড়িঘর, মন্দির … কোনোকিছুই ছুঁতে দেয়না। কারণ, বাইরের অপবিত্রতা এঁদেরকে স্পর্শ করলেই গ্রামে নেমে আসবে এঁদের আরাধ্য দেবতা ‘জমলু’ ঋষির অভিশাপ। ভাষা গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এঁদের ভাষা হোল ‘কানাসি’ যা কিনা সংস্কৃত আর গ্রীক ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি। আমরা আমাদের তীব্র কৌতূহলের কারণে একটাই শব্দ শিখতে পেরেছিলাম, ‘তি’, মানে পানি।
অসম্ভব সরু একটা রাস্তা বেয়ে শুরু হলো আমাদের এই পর্বের শেষ ট্রেকিং। একটু করে হাঁটি, আর একটু করে কোনো পাথরের গায়ে রুকস্যাকটা হেলিয়ে খানিক বিশ্রাম…এইভাবে উঠতে লাগলাম আমরা মালানা গ্রামের দিকে। মাঝে মাঝে ওপর থেকে নেমে আসছে একপাল ঘোড়া, সাথে তাদের মালিক। হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরতেই দেখি সামনে একদল মালানি রমণী। চোখা নাক-মুখ, অল্প লালচে কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল। মালানা মহিলারা নাকে দুটো করে নাকফুল পরে আর কানে থাকে প্রায় দশবারোখানা দুল। নারীপুরুষ ভেদে পায়ে আলাদা আলাদা জুতো। আমাদের দেখেই অনাবিল হেসে একপাশে সরে গিয়ে জায়গা করে দিল – ছোঁয়া বারণ। অনেক দূরে, পাহাড়ের অন্যপাশে দেখা যাচ্ছে আমাদের গত রাতের আস্তানা…খেলনা বাড়ির মতো লাগছে এখান থেকে দেখতে। মনে বল পাচ্ছি এসব দেখে… নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝাচ্ছি যে সকাল থেকে তাহলে অনেকটাই হেঁটে এসেছি আমরা। একপাশে অতল খাদ, অন্যপাশে খাড়া পাহাড়, মাঝে রাস্তা উঠে গেছে তার ভয়াবহ চড়াই নিয়ে। আক্ষরিক অর্থেই দশ-পা হাঁটি, তারপর দশ মিনিট বিশ্রাম নেই। পাহাড়ে ট্রেক করতে গেলে সবসময়েই নিজের ক্ষমতা বুঝে হাঁটা উচিৎ। সহযাত্রীর সাথে হাঁটার প্রতিযোগিতা করলে অচিরেই নিজের বিপদ ঘনিয়ে আসবে। মাঝে মাঝে মুখে কফি লজেন্স দিচ্ছি, এতে এনার্জি পাওয়া যায় অনেক। আস্তে আস্তে গ্রামের ঘরবাড়িগুলো অনেকটাই কাছে চলে এল। গ্রামে ঢোকার মুখেই আমাদের স্বাগত জানালো ছটফটে একটা পাহাড়ি ঝোড়া। এখানে আর কোন ঘাস নেই আসে পাশে…শুধুই গাঁজা গাছের জঙ্গল। জানতে পারলাম, এখানে শুধু গাঁজা গাছ ছাড়া আর বিশেষ কোনো গাছ জন্মায় না। এই গাঁজা পাতা থেকেই এরা তৈরি করে এঁদের নিত্য- প্রয়োজনীয় সমস্ত ওষুধ, আর, মনে মনে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় ভেসে বেড়ানোর জন্য, চরস, পৃথিবী বিখ্যাত ‘মালানা ক্রিম’, যার টানে দেশ বিদেশ থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসে গাঁজা বিলাসিরা।
গ্রামের প্রথম বাড়িটি আসলে একটি চা-জলখাবারের দোকান। এখানে এরকম সব দোকানকেই বলা হয় ক্যাফে। কিছু কিছু ক্যাফেতে আবার থাকার ব্যবস্থাও আছে। যেমন আমাদের আজকের রাত্রিবাস হবে গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে অনেক টা ওপরে ‘ ড্রাগন ক্যাফে’ তে। সামান্য আদা চা খেয়ে এবার শুরু হলো গ্রামের ভেতর দিয়ে ক্রমশ ওপরে ওঠা… শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই… যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ড্রাগন ক্যাফে পৌঁছানো দরকার।
গ্রামের মাঝখানে একটা খোলা চত্ত্বর… এরই একপাশে জমলু ঋষির মন্দির। জানা গেল, এখানেই প্রধান পুরোহিত সব কিছুর বিচার করেন। গ্রামে কোন পুলিশ ঢোকা বারন। নিজেদের মধ্যে কোন সমস্যা হলে গ্রামবাসীরা এখানেই প্রধান পুরোহিতের (যিনি একই সঙ্গে গ্রামেরও প্রধান) মধ্যস্ততায় সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলে। স্বতন্ত্র একটা স্থাপত্যশৈলীও আছে এঁদের। মূলত কাঠের তৈরি তিনতলা বাড়িগুলো…প্রথম তলাকে বলে ‘খুদাং’, এখানে সাধারণত কাঠ জমিয়ে রাখা হয়। দ্বিতীয় তলা কে বলে ‘গায়িং’, এখানে খাদ্যদ্রব্য থাকে। তার তৃতীয় তলা তে মানুষজন থাকে। সবকটা বাড়ির তৃতীয় তলাতে ঘরের লাগোয়া একটা ঝুলন্ত, চওড়া বারান্দা আছে, যেখানে বসে থাকলেই অনেক সময় কেটে যায়। আমাদের ক্যাফেটিও সেই একইভাবে তৈরি দেখে মনটা নেচে উঠল। আলাপ হলো কলকাতা থেকে আসা অন্য একটি ছেলের সাথে। ঘরে ঢুকতেই আর একটা চমক…ঘরের ভেতরের কাঠের দেওয়াল জুড়ে অপূর্ব সব গ্রাফিতি করা…যারা যারা এসেছে এর আগে, তারা করে গেছে। ভাগ্যিস আমাদের সাথেও একটা মার্কার কলম ছিল…ফিরে আসার আগে আমরাও ঐ ঘরের দেওয়ালে বাংলা ভাষায় অনেক কথা লিখে এলাম। আমরাই প্রথম যারা ঐ ঘরের দেওয়ালে বাংলা ভাষার প্রবেশ ঘটাল। যদি কখন কেউ যান, নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন আমাদের হাতে লেখা মুহূর্ত গুলো। সন্ধ্যা নামছে তখন মালানা গ্রামে…একটা দুটো বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে। আমরা সবাই বারান্দায় এসে বসলাম। মেঘ কেটে সামনে দেখা যাচ্ছে বরফে ঢাকা পাহাড় চুড়ো। সামনের পাহাড়ের গায়ে আস্তে আস্তে ছায়া তার থাবা বসাচ্ছে…তার সাথে সমানে চলছে পাখিদের বাসায় ফেরার ব্যস্ততা। একসময় দেখা গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত দৃশ্য, যার জন্য এতদিন ধরে আমরা হাপিত্যেশ করে বসেছিলাম… আকাশগঙ্গা…আমাদের গ্যালাক্সি… অভীক ভাইয়া ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করে, সেইই আমাদের একে একে চেনালো সবকিছু… একসাথে এত তারা এ-জীবনে আমরা কেউই দেখিনি… আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা সময় ঘোর লেগে গেল…কিছুতেই যেন চোখ সরাতে পারছিনা। আমাদের শেষ রাত এই পর্বের, প্রকৃতি উজার করে দিল তার সবটুকু আমাদের কাছে। মালানার নিঃস্পৃহ পাহাড়ে আমাদের মুহূর্তেও শিশির ঝরে পড়ল টুপটাপ।
জরুরী তথ্য: ১) কাসোলে রেইনবো ক্যাফের ব্রিটিশ ব্রেকফাস্ট খেয়ে দেখতে পারেন। ২) এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় গাড়ি নিয়ে যেতে হলে সকাল সকাল বেরনোই ভালো। না হলে গাড়ি পেতে সমস্যায় পড়বেন। ৩) এই অঞ্চলে বেশীরভাগ খাবার জায়গাতেই নিরামিষ খাবার পাবেন। মাংস না খেলে যাদের দাঁত সুরসুর করে তাদের জন্য রইল অনেক সমবেদনা। ৪) খাবার অর্ডার করার সময় কম করে অর্ডার করাই ভালো। এখানে এক একটা থালায় দুইজন মানুষের সমান খাবার দেয়। ৫) বেশি গাঁজা-চরসের দিকে না ঝোঁকাই ভালো। কারণ প্রথমত অনেক অনেক দাম। আর দ্বিতীয়ত এই গ্রামগুলো থেকে ফিরে আসার সময় জায়গায় জায়গায় পুলিশ চেকিং হয়। ধরা পড়লে গ্রেপ্তার।

x