পাহাড় ধস ও দেয়াল চাপায় নিহত ৪

ফিরোজ শাহ কলোনি ও হিলভিউ আবাসিক এলাকা

সোহেল মারমা

সোমবার , ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
157

নগরীতে ভারী বর্ষণে পাহাড় ধস ও দেয়াল চাপার পৃথক ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে আকবর শাহ থানাধীন ফিরোজ শাহ কলোনি এবং পাঁচলাইশ থানাধীন হিলভিউ আবাসিক এলাকায় মর্মান্তিক এসব ঘটনা ঘটে। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দীন বলেন, শনিবার দিবাগত রাত ২টায় ফিরোজ শাহ কলোনির এক নম্বর ঝিলের বরিশাল ঘোনায় পাহাড় ধসে আড়াই বছরের এক শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন, ওই এলাকার জনৈক নূর মোহাম্মদের স্ত্রী নূরজাহান (৪৫), তাদের আড়াই বছরের মেয়ে ফজরুন্নেছা ওরফে নূর বানু এবং নূরজাহানের মা বিবি জোহরা (৬৫)। এসময় তারা নিজেদের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। নিহত নূরজাহানের স্বামী নূর মোহাম্মদ ওই এলাকায় ময়লার গাড়ি চালান। তাঁর বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার শান্তির হাট এলাকায়। তাদের আরও দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। তবে বিবি জোহরার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার ভবানীগঞ্জে। তিনদিন আগে তিনি চট্টগ্রামে মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা জসিম উদ্দীন আরো বলেন, ওই পাহাড়ে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে ঝুঁকি নিয়ে অন্তত আরো পাঁচ হাজারের অধিক পরিবার বসবাস করছে। রেলওয়ে মালিকানাধীন এ পাহাড়ে দখলস্বত্বে এসব পরিবার কাঁচা-পাকা ও টিনের বসতঘর গড়ে তুলেছে। সাধারণত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের লোকজনই ঘরগুলোতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন। পার্শ্ববর্তী ঘরের বাসিন্দারা জানান, মাসিক ৮শ’ টাকার বিনিময়ে কলোনীতে দুটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা বসবাস করে আসছেন। গতকাল স্থানীয় আলমগীর, সোহাগ ও আলীসহ অনেকে জানান, রাতে প্রচুর বৃষ্টি হলে একই বসতঘরে তিন দফা পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। রাত ২টার দিকে প্রথমে পাহাড়ের মাটির সামান্য টুকরো নিচে পড়তে শোনা যায়। এরপর আরও দু’বার পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ঘরটি সম্পূর্ণ মাটির নিচে চাপা পড়ে। ওই ঘরে নিহতরা ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস রাতে এসে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে সকাল ৭টা নাগাদ লাশ তিনটি উদ্ধার করে। এ সময় বাড়ির কর্তা নূর মোহাম্মদ ঘরের বাইরে ছিলেন।
নূর মোহাম্মদ বলেন, টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিপদের আশঙ্কায় রাতে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই পাহাড়টি ভেঙে পড়ে। এই ঘরটির মালিক ‘ধনী’ নামের এক ইট ভাঙা শ্রমিক।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঘরের পাশে লাগোয়া সুউচ্চ পাহাড়টির উচ্চতা ছিল অন্তত ৫০ ফুটের বেশি। তবে পার্শ্ববর্তী বাকি কক্ষটি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এছাড়া একইদিন ওই পাহাড়ের আরেকটি অংশে ধসের ঘটনা ঘটে। তবে সেখানে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে গত ক’দিন টানা বৃষ্টিপাত চলাকালে ওই এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করা হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা। কিন্তু নিকটবর্তী কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় বেশিরভাগ লোকজনই ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘরগুলো ছেড়ে যাননি।
ফায়ার সর্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানায়, পাহাড়টির উভয়পাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিবারগুলো বসবাস করলেও ওয়াসার পানি এবং পিডিবির বিদ্যুৎ সংযোগসহ সব সুযোগ-সুবিধাই তারা পায়।

নিহত নূরজাহানের ঘরের পাশেই ২৫ বছর ধরে বসবাস করছেন হাসি বেগম। অল্প টাকা দিয়ে জায়গাটি নিয়েছিলেন তিনি। হাসি বেগম জানান, আমরা গরীব মানুষ। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। গামেন্টসে চাকরি করে বেতন আর কত পাই? ঘরভাড়ার জন্য ৫/৬ হাজার টাকা দিলে নিজে খামু কী, আর ছেলে মেয়েরে খাওয়ামু কী? এ কারণে শত কষ্ট হলেও এ জায়গা ছাড়ি না। এরপরও বৃষ্টি হলে ভয়ে ভয়ে থাকি। এজন্য বাড়িটাও পাহাড় থেকে একটু দূরে বানিয়েছি।
পাশেই একটি উঁচু পাহাড়ের সাথে লাগোয়া একটি দালানঘরের ভেতরে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে এক গৃহিণীকে। তিনি জানান, তার শাশুড়ি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে জায়গাটি কিনে এখানে ঘর তুলেছেন। তিনি বলেন, যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় এখানেই তারা থাকছেন। তবে বৃষ্টিতে রাতের বেলায় তারা বাসায় থাকেন না বলে জানিয়েছেন। এ সময় ঘরটিতে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও দেখা যায়। তবে দু’দিন আগে এসব লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ওই গৃহিণী।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় এসব পাহাড় দখল করে রেখেছেন। পাহাড় কেটে সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ করে কম মূল্যে ভাড়া দিচ্ছেন। আবার পাহাড় কাটার পর প্লট তৈরি করে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় দখলস্বত্বে মালিকানা বদল করছেন।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের সরে যেতে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযানও পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বাসিন্দারা ঝুঁকি স্বত্বেও সেখান থেকে সরেননি। এর মধ্যে নূর মোহাম্মদের পরিবারের অপর চার সদস্য রাতে সরলেও বাকিরা মালামাল নেওয়ার জন্য আবার ফিরে এসে পাহাড় ধসে প্রাণ হারান। তিনি আরও বলেন, পাহাড়টির মালিক হচ্ছে রেলওয়ে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান সেটি লিজ নিয়েছে। গত ক’দিন ধরে আমরা মাইকিং করে আসছি, উচ্ছেদও চালিয়েছি।
ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন আজাদীকে বলেন, ‘দুর্ঘটনাস্থলটি সমতল ভূমি থেকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। উঁচু রাস্তা বেয়ে সেখানে যেতে হয়। আমাদের পৌঁছতে বেগ পেতে হয়েছে।’
এদিকে পাঁচলাইশ থানাধীন হিলভিউ আবাসিক এলাকায় পৃথক ঘটনায় দেয়াল চাপায় নুরুন্নবী নান্টু (৪৫) নামে এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নুরুন্নবীর বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। তিনি হিলভিউ আবাসিক এলাকার পাশে রহমান নগরে একটি টিনের ভাড়া ঘরে পরিবার নিয়ে থাকতেন। গত এক মাস আগে তিনি ওই বাসায় উঠেছিলেন। কয়েকদিন টানা বৃষ্টিপাতের ফলে মাটি নরম হয়ে ওই দেয়ালটি তাদেরসহ আরো কয়েকটি বসতঘরের উপর আছড়ে পড়ে। এ সময় গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢালে থাকা একটি গাছের শিকড় উপড়ে গিয়ে সীমানা দেয়ালের ওপর পড়ে। এতে ওই দেয়ালটি নিচে থাকা কয়েকটি টিনের বসতঘরকে চাপা দেয়। পাশাপাশি গাছটিও বসতঘরের ওপর গিয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, হিলভিউ আবাসিক এলাকায় একটি উঁচু জায়গাকে ঘিরে রাখা ওই সীমানা দেয়ালটির উচ্চতা অন্তত ২০-২৫ ফুট। নিচে সীমানা দেয়ালটির পাশ ঘেষে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি টিনের বসত ঘর। এসব বসতঘরের একটি অংশের ওপরে দেয়াল ধসের ঘটনা ঘটে।
আরমান নামে স্থানীয় একজন আজাদীকে বলেন, দেয়ালটি অনেক পুরনো। ভিত্তিও মজবুত ছিল না। ওখানে বাস করা অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা জানান, মাসিক ২৪শ’ টাকায় তারা ঘরটিতে ভাড়া থাকছেন। ইকবাল হোসেন ভূঁঞা নামে এক ব্যক্তির মালিকানার জায়গার ওপরে এসব বসতঘর তোলা হয়েছে।

x