পাহাড় ধসের আশঙ্কা সতর্কতা অবলম্বন জরুরি

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
32

বর্ষা মৌসুমে শুরু হয়েছে ভারী বৃষ্টিপাত। তার কারণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল দৈনিক আজাদীতে এই বিষয়ে একটা প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। ‘টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের শঙ্কা’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে। ফলে ভারী বর্ষণে ভূমিধসের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। তাই সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন অফিস। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী ৩৪ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। অন্যদিকে সিভিল সার্জনও নগরে কন্ট্রোল রুম খুলেছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
পাহাড়ে কেন ভূমিধস হয়- এই প্রশ্ন অনেকের? বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেখানেই পাহাড় বা পাশাপাশি দুটি ভূমির উচ্চতার পার্থক্য রয়েছে, সেখানেই ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। সেটা আগ্নেয় শিলার পাহাড়, রূপান্তরিত শিলার পাহাড় বা পাললিক শিলার পাহাড় হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই কমবেশি পাহাড়ধস হবে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থান এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাললিক শিলার পাহাড়ে ভূমিধসের প্রবণতা বেশি। পাহাড়ধস প্রকৃতির একটি চলমান ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাহাড়-পর্বতের সৃষ্টি হয়। আবার প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে মানবসৃষ্ট কিছু বহিঃস্থ উপাদান যুক্ত হয়ে পাহাড়ধস সংঘটিত হয়ে থাকে। সারা বিশ্বে পাহাড় বা ভূমিধসের কারণে সাত হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবছর ২৫ থেকে ৫০ জন। অনুন্নত দেশে ভূমিধসে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি, এর সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী পাহাড়ধসে জীবনহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিসংখ্যান নেই। পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক জরিপ ছাড়াই রাস্তাঘাট ও স্থাপনা নির্মাণেরও দায় থাকতে পারে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য সমতলের চেয়ে আলাদা। কাজেই পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও ভবনাদি নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু কয়েক দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত অসংখ্য রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও ভবনাদি নির্মিাণ করা হলেও কোনো ক্ষেত্রেই ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা হয়নি। ফলে ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হয়তো অনেক রাস্তা, বাড়ি নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো ধসের কবলে পড়েছে। কোনো একটি কারণে এ রকম ভয়াবহ পাহাড়ধস হয়েছে বলে কেউই মনে করেন না। সবাই বিশ্বাস করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রাকৃতিক কারণ যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের সৃষ্ট কারণও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার তাঁর এক লেখায় বলেছেন, পাহাড়ধস একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড পাহাড়ধসকে ত্বরান্বিত করেছে। আমাদের পাহাড়গুলোর ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পাহাড় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে ভূমিধসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বর্তমানে পাহাড়ের যেসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোকে ভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা অবলম্বনে ভূমিধস নিরসন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রতিরক্ষা প্রাচীর (রিটেনশন ওয়াল), তারের জালের বেষ্টনী (ওয়্যার মেশ), পাহাড়ের ঢালে ও রাস্তার পাশে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা, পাহাড়ের মাটি ক্ষয়রোধ (ইরোশন) বা ধরে রাখার উপযোগী বনায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ধস বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান করতে হলে গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকে অব্যাহত রেখে সেখানে যে কোনো অবকাঠামো তৈরির জন্য ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় রাখা অপরিহার্য।
উল্লেখ্য যে, নগরীর ১৭টি পাহাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। গত রমজানের উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম ধাপে মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, পোড়া কলোনি পাহাড়, একে খান পাহাড় এলাকায় ৩৫০ অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করা হয়। গত রোববার দ্বিতীয় ধাপের অভিযানে মধুশাহ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ৩৪টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আপাতত এই ভারী বর্ষণের মৌসুমে পাহাড় ধস রোধ করার পদক্ষেপ নেওয়া না গেলেও ধসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানরতদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া জরুরি।

x