পাহাড় কাটার দায়ে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
57

দৈনিক আজাদীতে গতকাল প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় যে, মামলা দায়েরের একবছর পর বায়েজিদ থানার আরেফিন নগর এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগে দায়ের করা মামলার ৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। চলতি মাসেই আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বিশেষ আদালতের বিচারক ও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরীর আদালতে শুনানির পর এ অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্যদিয়ে ৯ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার শুরু হল।
আসলে যে যেভাবে পারছে, পাহাড় কাটছে। ধ্বংস করে চলেছে পরিবেশ। পাহাড় কেটে সমতল করে দিচ্ছে। মাটি নিয়ে নিচু জমি ও জলাশয় ভরাট করছে। নির্বিচারে বনজঙ্গল ধ্বংস করা হচ্ছে। ‘বোমা মেশিন’, ‘সিলিন্ডার মেশিন’ ইত্যাদি দিয়ে মাটির ৬০-৭০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। বনাঞ্চলের পাশেই গড়ে উঠছে ইটভাটা, বসছে করাত কল। এ সবই আইনে নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই আইন কেবল কেতাবেই আছে। বাস্তবে এসব আইনের কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। পরিবেশবিদদের মতে, কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরও নীরব ভূমিকা পালন করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিশেষ কারণে এসব দেখেও না দেখার ভান করে।
অধ্যাপক সজল চৌধুরী তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য আমাদের খুব বেশি নেই। তাই বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে সেটা আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এর ওপর দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো অনেক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। কালের প্রবাহে সেখানে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় জীবনপ্রবাহ আর প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। জীবন ধারণ করতে গেলে একে অপরের পরিপূরক হতে হয়। সেদিক থেকে এ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর ভূমিকা দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও দিনের পর দিন নিয়ম ব্যতিরেকে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। একদিকে সংবাদ মাধ্যমগুলোয় প্রতিনিয়তই প্রচারিত হচ্ছে পাহাড় কাটার খবর, অন্যদিকে ভ্রুক্ষেপহীন প্রশাসনের নাকের ডগায় রাতের অন্ধকারে দ্রুতগতিতে চলছে পাহাড় কাটা। এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক যখন এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, তখন প্রশাসনের এ ব্যাপারে টনক নড়ছে। এর মানে কি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এ ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানে না অথবা খোঁজ রাখে না? এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে। দেশে পাহাড় কাটাসংক্রান্ত যেসব নিয়ম-নীতি আছে, সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে পাহাড় কাটতে পারবে না, অন্যথায় আইন অনুযায়ী কমপক্ষে ১০ বছরের জেল কিংবা ১০ লাখ টাকার জরিমানা প্রদান করা হবে। যদিও এমন আইনের কার্যকারিতা পরিবেশ ধ্বংস রোধে সহায়ক কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, তারপরও আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।
আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, গত বছরের ২৬ জুন বায়েজিদ থানার এএসআই নুর মোহাম্মদ শাহাদাত বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে মামলা দায়ের করেন। এর আগে জুন মাসের শুরুর দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরেফিন নগর এলাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণের চেষ্টা করছিলেন। সিডিএর স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী জানান, ৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার মধ্যদিয়ে বিচার শুরু হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর্বও রাখা হয়েছে চলতি মাসেই। তিনি আরো বলেন, পাহাড় কেটে পরিবেশ বিনষ্টকারীদেরকে সিডিএর পক্ষ থেকে আমরা শক্ত মেসেজ দিতে চাই। এরই অংশ হিসেবে বিচারের আওতায় এনে অভিযুক্তদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
চট্টগ্রামে যে হারে পাহাড় কাটা চলছে, তা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে তার পরিণাম ফল ভোগ করতে হবে। খেসারত দিতে হবে চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের। ফয়’স লেক এলাকায় দিনে দিনে উধাও হয়ে যাচ্ছে আস্ত পাহাড়। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় কাটা হচ্ছে রাতের আঁধারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের না দেখলে কিংবা প্রতিরোধ না করলে ওরা আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। তাই আইনের প্রয়োগ জরুরি। আমরা চাই, পাহাড় কাটার দায়ে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক অচিরেই।

x