পাহাড়ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলযাত্রা

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
63

দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, গণপরিবহনের সংকট ও গ্রামের নিকটবর্তী এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে স্কুলগামী শিশুরা। কখনো ভাড়া চালিত মোটর সাইকেলের পিছনে কখনো বা চান্দের গাড়িতে বাদুড় ঝোলা হয়ে স্কুলে যাচ্ছে শিশুরা। প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। বছরের পর বছর ঝুঁিকপূর্ণভাবে বিদ্যালয়ে যাতায়াতে করলেও কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা নেই। যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। খাগড়াছড়ি -দীঘিনালা সড়কে আট মাইল এলাকায় শিক্ষার্থীরা খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় খাগড়াছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া জেলা শহরে অবস্থিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত করে। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত করে। পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হল দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা।
খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের আট মাইল এলাকার শিক্ষার্থী অমর কিশোর ত্রিপুরা বলেন, এখান থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে আমার বাড়ি। স্কুল যাওয়ার জন্য সকাল সাড়ে ৭ টায় বাড়ি থেকে রওনা দিই। গাড়ি না পেলে অনেক সময় বেশী টাকা দিয়ে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলে যেতে হয়। অনেকদিন ঠিকমত গাড়ি না পেয়ে স্কুল যাওয়া হয় না পুনরায় বাড়ি ফিরে আসতে হয়। আসার সময়ও একই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে হলেও স্কুলে যাই।
একই এলাকায় খাগড়াছড়িতে পড়ুয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নগেদ্র ত্রিপুরা জানান, আমাদের এলাকা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব প্রায় ১০-১১ কিমি। প্রতিদিন বাদুড় ঝোলা হয়েই স্কুলে যায় আশা যাওয়া করতে হয়। বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজে স্কুলে যায়। ঠিক সময়ে গাড়িও অনেক সময় নিতে চাই না।
খাগড়াছড়ির সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, অন্তত ত্রিশ মিনিট অপক্ষোর পর গাড়ি পাওয়া যায়। বেশীর ভাগ সময়ই গাড়িতে বসার সিট পায় না। তাই গাড়ির পিছনের অংশ ঝুলে ঝুলে যেতে হয়। স্কুল থেকে আসার পথেও একই ভোগান্তি।
এসময় শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এলাকার নিকটবর্তী জায়গায় বিদ্যালয় থাকলে এই ভোগান্তি পোহাতে হয় না। গাড়ির চালক-শ্রমিকরা স্কুল ছাত্রদের গাড়িতে তুলতে চায় না। বিদ্যালয়ে যেতে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন ঝামেলা পোহাতে হয়। এভাবে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫শ শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁিক নিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৪জন শিশু শিক্ষার্থীকে বহন করে নিয়ে এক ভাড়া চালিত মোটর সাইকেল চালক। ঐ চালক জানান, এরা খাগড়াছড়ির উপজেলা সদরের একটি কিন্ডার গার্টেনের ছাত্র। এরকম বাধ্য হয়ে সবাইকে এক গাড়িতে নিতে হয়েছে। তিনি আরো জানান, অনেক সময় পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে। তবে উপায় না থাকায় একসাথে চারজনও নিতে হয়। এভাবে শিশু শিক্ষার্থীরা মোটর সাইকেলে আসা-যাওয়া করাটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান তিনি।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সড়কের ৬ মাইল,৭ মাইল,আট এলাকাসহ প্রায় একাধিক এলাকার শিক্ষার্থীরা প্রায় ৭ -১০ কিমি দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়। এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলে এভাবে ঝুঁিকপূর্ণভাবে চলাচল করতে হত না।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, অনেক সময় নিজেরায় এসে গাড়িতে তুলে দিতে হয়। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সময় ক্লাস, পরীক্ষায় অংশ নিতে ঝামেলা হয়ে যায়। গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছেও বলে জানান তাঁরা। তবে যাতায়াতে শিশু শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে।
খাগড়াছড়ি সদর এলাকার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী গণপরিবহন বা ভাড়া চালিত মোটর সাইকেলে আসতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ে। কেবল যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে অনেক শিক্ষার্থী ড্রপ আউট হয়ে যায়। ব্যক্তি উদ্যোগ বা সরকারি উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতের ব্যবস্থা করা গেলে সংকট অনেকটায় কমে আসবে। এছাড়া বিদ্যালয়গুলো আবাসিক সুবিধা থাকলে ছেলে মেয়ে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করতে পারত। এতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা যেত।
খাগড়াছড়ির মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাধন কুমার চাকমা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে শিক্ষার্থী দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। এছাড়া গণপরিবহনের সংকটের কারণে দূরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে। এছাড়া ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল কিংবা বাসের ছাদে ও পিকআপের পাদানিতে বাদুড় ঝোলা হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। যা অত্যন্ত বিপদজনক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক ছাত্রাবাস থাকলে দুর্গম বা দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ভোগান্তি পোহাত হত না।

x