পাহাড়ে পানির হাহাকার

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
23

পাহাড়,ঝিরি-ঝরনা,উপত্যকা,পাহাড়ি নদী এবং বিস্তৃত অরণ্য নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখানের অধিকাংশ ভূমির গঠন দেশের অন্যান্য সমতল ভূমির তুলনায় ভিন্নরূপ রয়েছে। এখানকার অধিকাংশ এলাকায় পাহাড় ও টিলা ভূমির সমন্বয়ে গঠিত। এছাড়া পাহাড়ের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে জীবন এখানে আরো কঠিন। পাহাড়ের বসবাসরত বাসিন্দাদের আরেক কষ্টের নাম সুপেয় পানি সংকট। সারা বছর এই সংকট থাকলে গ্রীষ্মকালে এই সংকট আরো তীব্র হয়। পানির জন্য ঝিরি ুঝরনার উপর নির্ভরশীল মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে পানি ঝিরি-ঝরনা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে সুপেয় পানি থেকে এখানকার বাসিন্দাদের বঞ্চিত থাকতে হয়। ভোর হলেও পানি সংগ্রহের সংগ্রাম শুরু হয়। বাড়ির নিকটবর্তী ঝিরি শুকিয়ে যাওয়ার প্রায় ৩ কিমি দূরের ঝিরি থেকে জল সংগ্রহ করছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার বান্দরছাড় এলাকার বাসিন্দা নলিনী ত্রিপুরা। ঝিরিতে জল না গড়ানো পর্যন্ত দূরে ঝিরির কূপের পানির সংগ্রহ করতে হবে। একই অবস্থা খাগড়াছড়ি জেলা সদর.দীঘিনালা .মাটিরাঙার প্রায় শতাধিক পাহাড়ি গ্রামে। স্থানীয়রা জানান,‘ দুর্গম এলাকায় গভীর বা অগভীর নলকূপ না থাকায় নির্ভর করতে ভূপৃষ্ঠের পানির উপর। শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি বা ঝরনাতে ও পানি কমে যায় । খাগড়াছড়ির মাটিরাঙার -গোমতি সড়কে অর্জুনটিলা এলাকায় প্রায় ৪০ পরিবারের বসবাস। স্থানীয় বাসিন্দাদের সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা নেই। প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে একটি নলকূপ। তাও আবার মাঝে মাঝে পানি উঠে না চাপাকল বা নলকূপে। পাহাড়ি এই গ্রামের বাসিন্দাদের সুপেয় পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে পাহাড়ের পথ ডিঙিয়ে খাবার জল সংগ্রহ করা দুরূহ কাজ। আবার একমাত্র নলকূপটি নষ্ট হয়ে গেলে কুয়োর পানিই একমাত্র ভরসা। তবে বর্ষাকালে ব্যাপক বৃষ্টি হওয়ায় কুয়োর পানি পান করা সম্ভব হয় না । পাহাড়ি ঢলে কুয়োয় দূষিত পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। সারা বছরই এই গ্রামের বাসিন্দাদের পানির কষ্টে ভুগতে হয়।
একই পরিস্থিতি দীঘিনালার প্রায় অর্ধশতাধিক পাহাড়ি পল্লীতে। এক সময় গভীর বন ছিল এই গ্রামের চারপাশে ।বন নষ্ট এবং নির্বিচারে গাছ কাটায় পাহাড়ি ঝিরিতে খুব একটা পানি থাকে না । ফলে ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে। ছড়ার পানি অপেক্ষাকৃত দূষিত। ছড়া সাধারণত দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ায় নানা কারণে এই দূষিত থাকে। পার্বত্য এলাকায় মানুষ র্দীঘদিন ধরে পানি সংকটে ভুগলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মূলত :পাহাড়ে প্রাকৃতিক সংরক্ষিত বন ও পাড়াবাসীর উদ্যোগে গড়ে উঠা মৌজা বন ধ্বংস হওয়ার কারণে পানির প্রবাহ বা উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ের বিশেষত পাড়াবাসী সারা বছরই পানির সংকটে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে সেই সংকট আরো প্রকট হয়। এছাড়া পাহাড়ি ঝিরি থেকে পাথর উত্তোলনের কারণে পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পার্বত্য জেলার প্রধান নদীসমূহ -চেঙ্গী,মাইনীসহ অন্যান্য নদী সমূহে নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় শুকিয়ে যায়। ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ চেঙ্গী নদীতে প্রায় অর্ধশতাধিক ঝিরি ও ছড়া মিলিত হয়েছে । বর্তমানে নদীগুলো প্রায় মৃত। নদী বা ছড়ার পানিতে কেবল গৃহস্থালি কাজ চলে। তবে অনেকে বাধ্য হয়ে এসব ছড়ার পানি পান করে।’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ‘১০ বছর আগেও পানির এত কষ্ট ছিল না । বর্তমানে ডিসেম্বর থেকে কুয়ো, ঝিরি কিংবা ছড়ায় পানি শুকাতে শুরু করে। দীর্ঘ পথ বেয়ে খাবার জল সংগ্রহ করতে হয়। তাছাড়া ছড়ায় বন্যপ্রাণীদের অবাধ চলাফেরার কারণে এটি অনেক সময় দূষিত হয়ে যায়। ধনপাতা গ্রামে কয়েকজন বাসিন্দা আরো বলেন,মার্চ থেকে মে মাসে পানির জন্য প্রায় ৪ কিলোমিটারও হাটতে হয়। এভাবে সারা বছর বিশুদ্ধ জলের সংকটে ভুগতে হয়। এসময় দূষিত পানি পান করার কারণে অনেক গ্রামবাসী ডায়রিয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মথুরা ত্রিপুরা বলেন, ‘মৌজাবন যেখানে থাকে, তার নিম্নাঞ্চলের ছড়াসহ অন্যানা পানির প্রবাহ সচল থাকে। তাই এই বন ব্যবস্থাকে পানির উৎস বা জলবিভাজিকা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। পাহাড়ের ঝিরিতে পানির উৎস হিসেবে কাজ করত মৌজা বন। অনেক বন ধ্বংস হওয়ার দরুণ ফলাফল হিসেবে পানির উৎস নষ্ট হয়েছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমের শুরু হলেই বিশেষ করে সুপেয় পানির সংকট শুরু হয়। অতীতে মৌজাবন সুপেয় পানির উৎস হিসেবে কাজ করত। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে সেটিও আজ বিপর্যয়ের মুখে। ’
১৯০০ পার্বত্য এ্যাক্ট অনুযায়ী প্রতি মৌজায় একটি করে মৌজা বন থাকার কথা। অধিকাংশ মৌজা বন নির্বিচারে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক বন নষ্ট করে সেগুন বা অন্যান্য বিদেশী প্রজাতির বৃক্ষ সৃজনের কারণে পানির সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে মৌজাবন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.মুন্সী রাশীদ আহ্‌মদ জানান, ‘পাহাড়ে নির্বিচারে গাছ ধ্বংস ও পাথর উত্তোলনের কারণে পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে যাচ্ছে। পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে দিন দিন পানিশুন্য হয়ে যাচ্ছে ঝিরি-ঝরনা। ’
দুর্গম এলাকায় সরবরাহের কোন উদ্যোগ নেয়নি খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে সংস্থাটি নির্বাহী প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান,‘ পার্বত্য এলাকায় পানির জন্য বিভিন্ন গ্রামে নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় উঁচু পাহাড়ের কারণে পানির স্তর পাওয়া যায় না।’

x