পাহাড়ে জুমের পাকা ধানের শোভা

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান

রবিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
16

পার্বত্য জনপদে পাহাড়ে শোভা পাচ্ছেু এখন জুমের পাকা ধান। বাতাসে দুলছে সোনালী রঙের পাকা ধানের শীষ। জুম ক্ষেতে উৎপাদিত পাঁকা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছে বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদগুলোতে। শিশু কিশোর এবং বাবা-মা কেউই বসে নেই ঘরে। জুমে উৎপাদিত ধান কাটতে সকলে নেমেছে পাহাড়ের জুম ক্ষেতে। ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এখন জুমিয়া পরিবারগুলো। এদিকে ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিও চলছে জোরে শোরে। এবছর জুমের আশানুরুপ ভালো ফলন হয়েছে দাবি জুমিয়াদের।
কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছর বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় নয় হাজার হেক্টর পাহাড়ের জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় জুম চাষ বেড়েছে এবার। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিকটন। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ভবতোষ চক্রবর্তী বলেন, কয়েকবছর ধরে জেলায় প্রতিবছরই জুমের চাষ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এবছর জুমের ফসলও ভালো হয়েছে। জুমের ধান’সহ অন্যান্য ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে জুমিয়া পরিবারগুলো। পাহাড়ের জুম চাষ থেকে জুমিয়ারা সারাবছরের খাদ্য সংরক্ষণ করে।
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িরা প্রতিবছর জেলার বিভিন্নস্থানে শতশত পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে ঝাড়-জঙ্গল পুড়িয়ে আদিপদ্ধদিতে জুম চাষ করে। জুমিয়ারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভূট্টা, মরিচ, যব সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, টকপাতা, ফুল’সহ বিভিন্ন রকমের সবজি উৎপাদন করে।
তবে একটি পাহাড়ে একাধিকবার জুম চাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে জুমের চাষ করে। জেলায় বসবাসরত ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, চাকমা, পাংখো, বম, চাক’সহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। জেলা শহরের বসবাসরত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দূর্গমাঞ্চলে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বসবাসরত পাহাড়িরা আজও জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সমপ্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুম চাষের মাধ্যমে সারাবছরের জীবিকা সংগ্রহ করে। জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন লাগান। আর মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ আরম্ভ করেন। প্রায় ৩/৪ মাস পরিচর্যার পর বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পাহাড়ে জুমের ধান কাটা শুরু করে জুমিয়ারা। জুমের পাঁকা ধান’সহ উৎপাদিত অন্যান্য ফসল ঘরে তোলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এখন পাহাড়িরা। বান্দরবানের রুমা, থানছি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং সদর উপজেলার ট্যুরিস্ট স্পট মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি-চিম্বুক সড়কের রাস্তার দুপাশের পাহাড় গুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে জুম ক্ষেতে উৎপাদিত ধানের সোনালী হাসি। জুমে কাঁচা-পাকা ধানের ছড়িগুলো দুলছে বাতাসে। জুমের পাকা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছে এখন পাহাড়ি জনপদগুলোতে।
চিম্বুক সড়কের ম্রোলং পাড়ার জুমচাষী মেনুলু ম্রো, রিংরাং ম্রো বলেন, এবছর জুমের আশানুরুপ ভালো ফসল হয়েছে। পাহাড়ে দুজনে প্রায় সাত একর জমিতে জুম চাষ করেছে। জুম ক্ষেতে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি লাগিয়েছে তারা। জুমে উৎপাদিত পাঁকা ধান কেটে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। ফসল গড়ে তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের লেখক ও গবেষক সিইয়ং ম্রো বলেন, জুমচাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি আদি চাষাবাদ পদ্ধতি। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতিকারক হলেও এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যের অংশ।
জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভূট্টা, মরিচ, যব সরিষা, মিষ্টি কোমড়া, মারফা, টকপাতা’সহ বিভিন্ন রকমের সবজির উৎপাদন করে।
জুমে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা নির্বাহ করে জুমিয়া পরিবারগুলো। জুমের ফসল ঘরে তোলার সময়টায় পাহাড়ি পল্লীগুলোতে ঢাক ঢোল পিটিয়ে নবান্ন উৎসবেরও আয়োজন করা হয়। তবে জুম চাষ অলাভজনক না হওয়ায় অনেকে জুমচাষ পরিত্যাগ করে মিশ্র ফল চাষের দিকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বান্দরবানের উপ-পরিচালক একেএম নাজমুল হক বলেন, জুমে উৎপাদিত ফসল এই অঞ্চলের খাদ্য চাহিদার অনেকাংশই পূরণ করে। কিন্তু আদিপদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে পাহাড়ের ক্ষয়সৃষ্টি এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে চাষীদের উদ্ভুদ্ধ করা হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কয়েকগুন বাড়বে।

x