পাহাড়ের পাদদেশে মৎস্যচাষের অপার সম্ভাবনা

মোঃ জামাল উদ্দিন : লোহাগাড়া

সোমবার , ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
128

লোহাগাড়ার পাহাড়ি অঞ্চলের পাদদেশে বিপুল পরিমাণ সমতল ভূমি রয়েছে। অনেকে ধান চাষাবাদের পরিবর্তে মৎস্যচাষে ব্রতী হচ্ছেন। তারা আমিষের ঘাটতি পূরণ ও লাভের আশায় নতুনভাবে মৎস্যচাষ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। উদ্যোক্তারা এ ব্যাপারে বিভিন্ন স্থানে দেন-দরবার করেও তেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অনতিবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে খামারিদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। লোহাগাড়া উপজেলার পূর্বে, দক্ষিণে ও পশ্চিম সীমান্তবর্তী স্থান গভীর অরণ্য বেষ্টিত। এসব অরণ্যের মধ্যবর্তীস্থানে পানির অভাবে কৃষক শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ করতে পারেন না। বর্ষাকালে এক ফসল ফললেও বন্যপ্রাণীর উপদ্রব কিংবা দুর্বিপাক দুর্যোগের কারণে আশানুরূপ ফলন ঘরে উঠাতে পারেন না। বন্যপ্রাণী তাড়াতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ ও বন্যপ্রাণী মুখোমুখি অবস্থান নিতে হয়। ফলে প্রতি মৌসুমে অনেক কৃষক মারা যান। সমপ্রতি চুনতির গভীর অরণ্যে ফসল পাহারা দিতে গিয়ে টংঘরের মধ্যে পানত্রিশা মন্দুল্যার চরে জুনু মিয়া নামে একজন কৃষক বন্যপ্রাণীর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। চুনতি অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে কয়েকটি ইটভাটা রয়েছে। ভাটা হতে নির্গত ধোঁয়ায় বন্যপ্রাণী আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। বন উজাড় হয়। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বন্যপ্রাণী আবাস হারিয়ে সন্নিহিত লোকালয়ে হানা দেয়। ঘরবাড়ি তছনছ করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হবে বলে পরিবেশবাদীরা মনে করেন। তারা নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করছেন কিভাবে কৃষকের ভাগ্য উন্নয়ন ঘটানো যায়। তারা বলছেন, লোহাগাড়ার বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে ইতোমধ্যে দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে আঁড়ি বাঁধ দিয়ে বর্ষাকালে পানি ধরে রাখা হয়। সেখানে পোনা অবমুক্ত করে মিশ্র প্রজাতির মাছের চাষ হয়। এ সম্ভাবনা স্থানীয় কৃষকদের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা ভাবছেন, ধান চাষের পরিবর্তে মাছ চাষই উত্তম। মাছ চাষ করার ফলে এলাকার কৃষকরা আমিষের ঘাটতি পূরণ করতে পারেন। এলাকার বাইরেও মাছের চালান দেয়া যায়। প্রতিদিন লোহাগাড়ার কেয়াজুপাড়া সংলগ্ন স্থানে হাছিনা ভিটা, আজিজনগর, চুনতি, জঙ্গল পদুয়া, বড়হাতিয়া, জঙ্গল বড়হাতিয়া, হরিদারঘোনা, রশিদারঘোনা প্রভৃতিস্থানে গৃহিত মৎস্য প্রকল্প হতে বিপুল পরিমাণ পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও কার্প জাতীয় মাছ বাজারজাত করা হয়। হাতে নগদ কাঁচা টাকা আছে। উপজেলার পদুয়া, ঠাকুরদীঘি হতে পূর্বদিকে জঙ্গল পদুয়া এখন মাছ চাষের উর্বরক্ষেত্র। মৎস্যচাষী জাহেদুল ইসলাম সামান্য পুঁজিতে এ প্রকল্প গ্রহণ করে আজ স্বাবলম্বী। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, তারা উদ্যোক্তাদের যে কোন সময় কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। চরম্বার বিবিরবিলা স্থানে মৎস্য চাষীরা সমবায় ভিত্তিক মৎস্যচাষ করেন বলে মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য চাষে ব্রতী হয়েছেন এমন কৃষকের সংখ্যা কম নয়। চুনতি বনাঞ্চলে বর্ষাকালে বন্য হাতির উপদ্রবে অনেকে ধান চাষাবাদ করেন না। চুনতি বন বিভাগের বিট অফিস সংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প স্থান ও আধুনগর কুলপাগলি আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে বর্তমানে মাছের চাষাবাদ করার ফলে আশ্রিত লোকজনের আমিষের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে বলে এলাকার মেম্বার- চেয়ারম্যানরা অভিমত রেখেছেন। তারা বলছেন, এসব প্রকল্প হতে প্রাপ্ত মৎস্য সম্পদ আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীরা কম মূল্যে কিনতে পারেন। তবে লোহাগাড়ার বিভিন্ন হাটবাজারে উৎপাদিত মৎস্য সম্পদ নিয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়ে যান। মধ্যস্বত্বভোগীরা পেশী শক্তির জোরে অনেক ক্ষেত্রে এসব মৎস্য হরিলুট করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লোহাগাড়া উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় এসব সমস্যা সমাধানের জন্য বহুবার বহুভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। লোহাগাড়া সন্নিহিত চকরিয়া উপজেলা হতে মাছ ব্যবসায়ীরা এক প্রকার মাছ নিয়ে আসেন না। তারা অভিযোগ করেছেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা কোন মূলধন ছাড়াই তাদের কাঁধে বন্দুক রেখে লাভের মজা লুটে নেয়। লোহাগাড়ার বনাঞ্চলে কয়েকটি পরিত্যক্ত ইটভাটা রয়েছে। পূর্ব কলাউজানের গাবতলি হতে দক্ষিণ দিকে পহরচান্দাগামী রাস্তার তুরগুলা পাড়া সন্নিহিত স্থানে একটি পরিত্যক্ত ইটভাটা রয়েছে। সেখানে স্থানীয় সাবেক মেম্বার ফজলু বাহার মাটি কেটে মৎস্য প্রকল্প তৈরি করতে দেখা যায়। এ প্রতিবেদক তার সাথে আলাপ করে জানতে পারেন ইটভাটাটি স্থানীয় কয়েকজন লোকের খতিয়ানভুক্ত জমি। তিনি এসব জমির মালিকের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী লাগিয়ত নিয়ে মাছ চাষে ব্রতি হয়েছেন। তিনি আশা পোষণ করছেন সামনে বর্ষামৌসুমে এ প্রকল্পে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে। প্রকল্পের পাড়ে মিশ্র প্রজাতির শাকসব্জি লাগানো হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার এ প্রচেষ্টা উদাহরণ হবে এমন বক্তব্য এলাকাবাসীর।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু আসলাম বলেছেন, তার কাছে অভিযোগ রয়েছে ফজলু বাহার স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে প্রকল্প তৈরি করছেন। তিনি গত ৭ ফেব্রুয়ারি স্কেভেটরটি জব্দ করেছেন। মালিককে পাওয়া যাচ্ছে না বলে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তবে তদন্ত সাপেক্ষে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকে মৎস্য চাষ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। উন্নয়নের মহাসড়কে লোহাগাড়ায় স্থাপিত মৎস্য প্রকল্প মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এ বক্তব্য উদ্যোক্তা, খামারী ও এলাকাবাসীর।

- Advertistment -