পাহাড়ের চূড়োয় কংলাক পাড়া

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

সোমবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
103

পাহাড়ের চূড়ো তখন হালকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন,শীতের শেষ বিকেল পেরিয়ে পশ্চিমের আকাশে বিদায়ী সোনার সিংহ-সূর্যদেবতা তখন পাহাড়ের কোলে হেলে পড়ছে মাত্র। সূর্যের সোনালী রঙে মোড়ানো সবুজ পাহাড়,দিন শেষ আর শুরুতে এ রঙ যেন পুরো পাহাড়কে সোনায় মুড়িয়ে রাখে। অদূর সীমান্তে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের ব্লু ম্যাউনটেনগুলো।
উপত্যকা পেরিয়ে ক্রমশ পাহাড়ের ভাঁজ যেন আকাশচুম্বী হয়েছে ওখানে,আর এই দীর্ঘ ভ্যালিজুড়ে আরণ্যের সীমানা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই নৈসর্গিক নিরবতা পাহাড়ের চারপাশে,কেবল মৌসুমী হাওয়ার মত তীব্র বাতাস ছুটে আসছে নীচের পাহাড়গুলো ছুঁয়ে। কংলাক পাড়া আশেপাশের পাড়াগুলো থেকে সবচেয়ে উপরে বিধায় বাতাসের ঝাপটা যেন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। পাহাড়ি বাতাস মেখে মাচাংয়ে বসে যেন তারা গণনার প্রতিযোগিতা চলছে। নক্ষত্র আর মিল্কওয়েতে ভরা কংলাক,সাজেকের আকাশ। থোকায় থোকায় আকাশে জ্বলছে তারার দল। অত্যন্ত নির্জনতা পাহাড় চূড়োর পাড়া কংলাক। মৌসুমী হাওয়া থেমে থেমে বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের চূড়োয়। আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের চূড়োয় দাঁড়িয়ে চেনা রাতকেও অচেনা মনে হয়।
হিম শীতল বাতাসের বুকে মাচাংয়ে পেতেছি তাবু, রাতটা তাবুতে কাটাব। পাহাড়ের রহস্যের ডানা মেলতে হিম হওয়া রাতে,হাজার ফুটের পাহাড় পেরিয়ে রাতের দিগন্তে পূর্ণিমায় শীতল আলো। জ্যোৎস্নার আলোয় ঢেকে আছে পুরো প্রকৃতি অরণ্য। রুইলুই থেকে কংলাকের হাইল্যান্ডের নীচের মূল উপত্যকা। উপত্যকায় রেখার মত ছড়িয়ে আছে সাজেক,পাইলিং পাড়াসহ বেশ কিছু পাহাড়ি গ্রাম। পূর্ণিমা রাতে পাড়াগুলোতে সৌরবিদ্যুতের আলো জ্বলছে,গভীর অরণ্যে যেন ঢেকে রেখেছে পুরো উপত্যকা। রাতের আকাশে মেঘ উড়ে যাচ্ছে থেমে থেমে,যেন মেঘ গ্রাস করে নিচ্ছে চন্দ্রের মায়াবী আলো। নিঃশব্দের মত জেগে আছে পুরো অরণ্য প্রকৃতি। পাহাড়ের নির্জনতায় কেবলই জেগে থাকা পাখিরা, রাতে অদূর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক,রাত জাগা পূর্ণিমা রাতে পাখির ছন্দ যেন অরণ্যের চেনা রূপ। কংলাকের চূড়োয় বসে এমন রাত পাওয়ায় সত্যিই বিমুগ্ধ করে। পাড়ায় বসবাসরত লুসাই আর ত্রিপুরা বসতিগু্ে‌লা তখন ঘুমের রাজ্যে,গভীর রাতে যেন পূর্ণিমার আলো গাঢ় পাহাড়ের গ্রাম-অরণ্য-প্রকৃতি। কংলাক চূড়ো থেকে পাখির মত চোখে পড়ে ধবধবে পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত পুরো উপত্যকা। রাতের আহার পর্ব শেষ করে তাবুতে বসে দেখছি ধীরে ধীরে মেঘ জমছে উপত্যকার ভাজে ভাজে,মেঘের সাদা রঙে ঢেকে যাচ্ছে সবুজ বনানী। পূর্ণিমা রাতে মেঘ যেন বৃত্তের মত চারপাশ থেকে ঘিরে রাখছে পাহাড়ের গ্রাম কংলাককে। ১৮০০ ফুটের এ পাড়া যেন সাজেক ভ্যালি’র মুকুট। পুরো সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চূড়োর কংলাক পাড়া রাঙামাটির ছাদ, কংলাক থেকে মেঘ মুক্ত আকাশে সুদুরের কাপ্তাই লেকের জলধারা। তাঁবুতে শুয়ে পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীল মেঘের সমুদ্র পেরিয়ে পাহাড় দর্শনের জন্য সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চূড়ো কংলাক যেন অনন্য। চূড়ো থেকে দাঁড়িয়ে পাখির চোখে ভোরের মেঘ দেখে বিস্মিত হবে যেকোন পথিক। সকালের মেঘমুখর পাহাড়ি জনপথ আর শেষ বিকেলে পশ্চিমের মেঘের সোনার সিংহ, সূর্যাস্তের বিরল রূপ এখানে ধরা দেয় অনায়াসে। পূর্ণিমায় রাতের মায়াবী সৌন্দর্যের ষোলয়ানাই কংলাকের চূড়োয় ধরা দেয়।

x